দেনমোহর স্ত্রীর অধিকার, না দিলে ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দিতে পারবে আদালত: হাইকোর্ট

দেনমোহর স্ত্রীর অধিকার, না দিলে ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দিতে পারবে আদালত: হাইকোর্ট

স্বামীর আর্থিক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও দেনমোহর পরিশোধ না করে স্ত্রীকে তা আদায়ের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হতে বাধ্য করা হলে, পারিবারিক আদালত স্ত্রীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারবে বলে রায় দিয়েছে হাইকোর্ট।

একই সঙ্গে হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন, মুসলিম পারিবারিক আইনে স্ত্রীর সম্মতি ছাড়া নিকাহনামায় ‘বিলম্বিত দেনমোহর’ নির্ধারণ করার কোনো সুযোগ নেই। স্ত্রী দেনমোহর দাবি করলেই তা ‘তৎক্ষণাৎ প্রদেয় দেনমোহর’ হিসেবে গণ্য হবে এবং তা দ্রুত পরিশোধযোগ্য।

বিজ্ঞাপন

দেনমোহর ও খোরপোষসংক্রান্ত পারিবারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে স্বামীর করা দেওয়ানি রিভিশন আবেদন খারিজ করে বিচারপতি মো. আব্দুর রহমানের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় দেন।

‘ইয়াকুব আলী বনাম সানজিদা নাসরিন’ দেওয়ানি রিভিশন মামলায় গত ৩ সেপ্টেম্বর রায়টি দেওয়া হয়েছিল। হাইকোর্টের ৩২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি গতকাল মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।

রায়ে বলা হয়, দেনমোহর স্ত্রীর একটি স্বতন্ত্র ও আইনগত অধিকার। তাই আর্থিক অক্ষমতার অজুহাত দেখিয়ে স্বামী কোনোভাবেই দেনমোহর পরিশোধের দায় থেকে অব্যাহতি পেতে পারেন না। একই সঙ্গে আদালত স্পষ্টভাবে জানান, স্ত্রী স্বেচ্ছায় ও স্বাধীনভাবে দেনমোহরের পুরো বা কোনো অংশ মওকুফ না করলে আদালতেরও দেনমোহরের অর্থ কমিয়ে দেওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই।

তবে স্বামী যদি তার প্রকৃত আর্থিক সংকট আদালতের কাছে প্রমাণ করতে পারেন, সে ক্ষেত্রে পাওনা অর্থ কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। তবে এমন কিস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে ডিক্রিধারী স্ত্রী ও তার সন্তানের অধিকার নিশ্চিত ও সুরক্ষিত থাকে।

২২ লাখ টাকা দেনমোহরে বিয়ে

মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, ২০১৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর শরিয়াহ মোতাবেক ২২ লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য করে ইয়াকুব আলীর সঙ্গে সানজিদা নাসরিনের বিয়ে হয়। তাদের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। পরবর্তী সময়ে যৌতুকের দাবি ও পারিবারিক বিরোধের জেরে ২০১৭ সালে সানজিদাকে স্বামীর বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং পরে স্বামী তাকে তালাক দেন।

তালাক কার্যকর হওয়ার পর ২০১৯ সালে বকেয়া দেনমোহর, ইদ্দতকালীন খোরপোষ ও কন্যাসন্তানের খোরপোষ দাবি করে চট্টগ্রাম পারিবারিক আদালতে মামলা করেন সানজিদা নাসরিন।

মামলার শুনানি শেষে ২০২২ সালের ২৫ মে চট্টগ্রামের সিনিয়র সহকারী জজ (পারিবারিক আদালত) স্ত্রীর পক্ষে রায় দেন। এতে দেনমোহর বাবদ ১৮ লাখ টাকা, ইদ্দতকালীন খোরপোষ ৩০ হাজার টাকা এবং কন্যাসন্তানের বকেয়া খোরপোষ বাবদ ২ লাখ ১০ হাজার টাকাসহ মোট ২০ লাখ ৪০ হাজার টাকা ৬০ দিনের মধ্যে পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়।

আপিল ও হাইকোর্টে রিভিশন

পারিবারিক আদালতের ডিক্রি কার্যকরের জন্য স্ত্রী মামলা করলে স্বামী একতরফা ডিক্রি বাতিলের আবেদন জানান এবং ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা জমা দিয়ে জামিন নেন। পরবর্তী সময়ে আবেদন নিষ্পত্তির আগেই তিনি আপিল করলে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা জজের পঞ্চম আদালত ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট ওই আপিল খারিজ করে নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখেন। এরপর স্বামী হাইকোর্টে রিভিশন আবেদন করেন।

হাইকোর্টে স্বামীর পক্ষে বলা হয়, তিনি মামলার সমন পাননি এবং ব্যবসা হারিয়ে আর্থিক সংকটে পড়ায় অবশিষ্ট অর্থ একসঙ্গে দেওয়া সম্ভব নয়। তাই কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের সুযোগ চাওয়া হয়।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত

মামলার সার্বিক বিষয়, পবিত্র কোরআনের সংশ্লিষ্ট আয়াতসমূহ (সুরা আন-নিসা: ৪, ২০, ২১, ২৪, ২৫; সুরা আল-বাকারা: ২৩৬, ২৩৭) এবং প্রথাগত মুসলিম আইন বিশ্লেষণ করে আদালত জানান, কোনো স্ত্রীর দেনমোহর মওকুফ বা মাফ করার এখতিয়ার আদালতের নেই। স্ত্রী নিজ ইচ্ছায় স্বেচ্ছায় মওকুফ করলে তা পর্যাপ্ত প্রমাণের মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে। বলপ্রয়োগ, অনুচিত প্রভাব বা প্রবঞ্চনার মাধ্যমে প্রাপ্ত তথাকথিত মওকুফ বৈধ হিসেবে গণ্য হবে না।

আদালত আরও পর্যবেক্ষণ দেন, অর্থনৈতিক মূল্যস্ফীতি, আবাসন ও উৎসব পালনের বিষয়টি বিবেচনা করে নাবালিকা সন্তানের খোরপোষের যৌক্তিকতা রয়েছে।

সবশেষে হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের রায়ে কোনো আইনি ত্রুটি বা এখতিয়ারগত ভুল না পাওয়ায় স্বামীর রিভিশন আবেদন খারিজ করেন। ফলে ২০ লাখ ৪০ হাজার টাকার ডিক্রি এবং বকেয়া দেনমোহর ও ভরণপোষণ পরিশোধের আইনগত দায় বহাল থাকে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন