র্যাবে থাকাকালে লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বে বেশ কয়েকটি অভিযানে অংশ নিয়েছেন মেজর সাব্বির। ২০১০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১২ সালের মার্চ পর্যন্ত কয়েকটি অভিযানে জিয়াউলের নেতৃত্বে ২২ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এসব হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে ‘রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে’ জানতেন বলে জিয়াউল তখন উল্লেখ করেছিলেন।
বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এসব নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক বর্ণনা দেন প্রত্যক্ষদর্শী মেজর (অব.) সাব্বির রহমান ওসমানী।
ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের দেড় দশকের দুঃশাসনের সময় শতাধিক মানুষকে গুম, নির্যাতন ও খুনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বরখাস্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল জিয়াউলের বিরুদ্ধে ১৩তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন তিনি।
জবানবন্দিতে মেজর (অব) সাব্বির বলেন, আমি ১৯৯৩ সালের ১৮ জুন ২৮তম বিএমএ লং কোর্সে সাঁজোয়া কোরে কমিশন লাভ করি। ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে র্যাবে বদলি হই। তখন মেজর ছিলাম। প্রথমে র্যাব-২-এ ধানমন্ডি কোম্পানি কমান্ডার হিসাবে যোগ দেই। পরে অক্টোবরে র্যাব-৮-এর উপ-অধিনায়ক হিসাবে যোগ দেই। তখন র্যাবের ডাইরেক্টর (ইন্টেলিজেন্স) ছিলেন লে. কর্ণেল জিয়াউল আহসান । ২০১০ সালের জানুয়ারিতে একদিন রাতে জিয়া স্যার মাইক্রোবাস নিয়ে র্যাব-৮ ব্যাটালিয়ন সদরে উপস্থিত হন। পরে তিনি আমাকে সঙ্গে নিয়ে অভিযানে বের হন। তার গাড়ি চলতে শুরু করলে ঢাকা র্যাবের (ইন্ট উইং) থেকে আসা মাইক্রোবাসটিও ফলো করতে থাকে। একসময় আমরা পাথরঘাটার চরদুয়ানী ঘাটে গিয়ে পৌঁছাই। সেখানে আগে থেকেই র্যাবের ইন্ট উইংয়ের র্যাব-৮-এ সংযুক্ত সদস্যরা একটি ট্রলার প্রস্তুত করে রেখেছিল। প্রথমে মাইক্রোবাসে ঢাকা থেকে আসা ইন্ট উইংয়ের সদস্যরা নেমে ট্রলারে উঠতে থাকে। তখন হাত বাঁধা এবং মাথায় কালো টুপি পরা একব্যক্তিকেও ট্রলারে ওঠাতে দেখি। তাকে ট্রলারের মাছ সংরক্ষণের খোলের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখা হয়। আনুমানিক তিন ঘণ্টা ট্রলার চালানোর পর জিয়া স্যার লোকটিকে বের করে আনতে বলেন। তাকে বোটের বাইরে আনার পর ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের চারজন সদস্য তাকে ঘিরে ফেলে। প্রথম সদস্য হাত বাঁধা ব্যক্তির গলা এবং পায়ে দুটি সিমেন্টের বস্তা বেঁধে ফেলে। দ্বিতীয় র্যাব সদস্য মাথা ও কানে ছোট বালিশ ঠেকিয়ে পিস্তল দিয়ে ফায়ার করে। তৃতীয় র্যাব সদস্য ওই ব্যক্তির পেট কেটে ফেলে। চতুর্থ র্যাব সদস্য গুলিবিদ্ধ ব্যক্তির কাটা পেটের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে পেট কাটার বিষয়টি নিশ্চিত হন। এরপর জিয়া স্যারের নির্দেশে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। পরে জিয়া স্যার আমাকে বলেন, দুশ্চিন্তা করার কিছু নাই, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় এই বিষয়ে জানেন।
বিডিআর হত্যার প্রত্যক্ষদর্শীসহ চারজনকে হত্যা
জবানবন্দিতে মেজর (অব) সাব্বির বলেন, ২০১০ সালের মে মাসের একদিন সন্ধ্যায় আমাকে জানানো হয়, জিয়া স্যার ঢাকা থেকে বরিশালে আসছেন। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই জিয়া স্যার তার সরকারি গাড়ি ও দুটি মাইক্রোবাস নিয়ে ব্যাটালিয়ন সদরে উপস্থিত হন। আনুমানিক ৩০ মিনিট পর আমি এবং আমার অধিনায়ক জিয়া স্যারের সঙ্গে অভিযানে বের হই। ঢাকা থেকে আসা ইন্ট উইংয়ের মাইক্রোবাস দুটিও ছিল। আনুমানিক দুই ঘণ্টা চলার পর চরদুয়ানী ঘাটে পৌঁছাই। এখানেও আগের মতো মাইক্রোবাস থেকে চারজন ব্যক্তিকে মাথায় কালো টুপি পরা এবং হাত পিছনে বাঁধা অবস্থায় ট্রলারে ওঠাতে দেখি। দেড় ঘণ্টা চলার পর এক ব্যক্তিকে মাথায় বালিশ ঠেকিয়ে পিস্তল দিয়ে গুলি করে পেট কেটে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে ফেলে দেয়। এভাবে একে একে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ ব্যক্তিকে হত্যা করে ফেলা হয়। ঘটনার দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে হঠাৎ গোয়েন্দাসূত্রে জানতে পারি, শরণখোলা রেঞ্জের বলেশ্বর নদীতে মুখ ঢাকা, পেট কাটা এবং শরীরে সিমেন্টের বস্তা বাঁধা লাশ ভেসে উঠেছে। পরে বিডিআর গোয়েন্দা সদস্যদের মাধ্যমে লাশটির ডিএনএ পরীক্ষার পর জানা যায়, লাশটি বিডিআরের প্রাক্তন সদস্য নজরুল ইসলামের।
আলকাছ মাঝির খোঁজ মেলেনি
জবানবন্দিতে মেজর (অব) সাব্বির বলেন, ২০১১ সালের জুনে একদিন জিয়া স্যারের ফোন পাই। তিনি গলফ (হত্যা) কাজে নিয়োগপ্রাপ্ত মাঝিদের মধ্যে অন্যতম আলকাছ মাঝির ব্যপারে আমার কাছে জানতে চান। আমি তার ব্যাপারে কিছু জানি না বলে জানাই। এরপর জিয়া স্যার বলেন, আলকাছ মাঝি গলফ অপারেশনের বিভিন্ন তথ্য চরদুয়ানী বাজারে বলে বেড়াচ্ছে, যা র্যাবের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তখন জিয়া স্যার আলকাছ মাঝিকে এলিমিনেট (হত্যার) করার নির্দেশ দেন আমাকে। বিষয়টি শোনার পর শারীরিক অসুস্থতার কথা বলে দায়িত্ব পালনে অব্যহতি চেয়ে কাকুতি-মিনতি করতে থাকি। তখন জিয়া স্যার বলেন, থাক লাগবে না। এর কয়েকদিন পর আলকাছ মাঝির পরিবারের পক্ষে থেকে বলা হয়, জিয়া স্যারের কথা বলে ফোনে আলকাছ মাঝিকে দেখা করার কথা বলা হয়। পরে দেখা করতে গেলে আর কখনো আলকাছ মাঝির খোঁজ পাওয়া যায়নি।
সুন্দরবনের নিশানখালীতে ৬ হত্যা
জবানবন্দিতে সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, জিয়া স্যারের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় সুন্দরবন কেন্দ্রিক তিনটি তথাকথিত এনকাউন্টার অভিযান করতে দেখেছি। আনুমানিক ২০১১ সালের নভেম্বরে নিশানখালী খাল সংলগ্ন বনে তৎকালীন সুন্দরবনের সবচেয়ে বড় বনদস্যু বাহিনী রাজুর গোপন আস্তানায় তথাকথিত এনকাউন্টার অভিযান চালানো হয়েছিল। এই অভিযানের আগের দিন রাতে ইন্টলিজেন্সে উইংয়ের একদল সদস্য সেখানে চলে যায়। মূল অভিযান চালানোর দিন ভোরে আভিযানিক দল পৌঁছালে এলাকাটি ঘিরে ফেলার প্রস্তুতিকালে হঠাৎ বনের ভিতর থেকে হুইসেলের শব্দ পাওয়া যায়। হুইসেলটি ছিল অগ্রগামী ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের সদস্যদের সিগন্যাল। সিগন্যাল শোনামাত্রই জিয়া স্যার মূল আভিযানিক দলকে ঘিরে থাকা বন লক্ষ্য করে ফায়ার করার নির্দেশ দেন। বেশ কিছুটা সময় ধরে বন লক্ষ্য করে ফায়ার করার পর ফায়ার থামানো হয়। পরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অস্ত্র ও গোলাবারুদ এবং দুটি লাশ উদ্ধার দেখানো হয়। পরবর্তীতে মামলার প্রক্রিয়াকালে ব্যাটালিয়ন সদরকে জানানো হয়, ঘটনাস্থলে ছয়টি লাশ পাওয়া গেছে।
সুন্দরবনের দ্বিতীয় অভিযানে ৫ হত্যা
জবানবন্দিতে মেজর (অব) সাব্বির বলেন, ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে কটকা ফরেস্ট স্টেশন থেকে দুই কিলোমিটার দক্ষিণে জিয়া স্যারের পরিকল্পনা এবং নির্দেশনায় র্যাব-৮ এবং র্যাব-৬ যৌথভাবে অভিযান চালায়। মূল অভিযান চালানোর আগের দিন রাতে জিয়া স্যার ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের সদস্যদের নিয়ে পাথরঘাটার উদ্দেশ্যে রওনার আগে আমাকে তার সঙ্গে যাওয়ার নির্দেশ দেন। এখানেও মাথায় টুপি পড়ানো ও হাত বাঁধা অবস্থায় পাঁচ ব্যক্তিকে ট্রলারের খোলের ভিতরে ঢুকানো হয়। যথারীতি সিমেন্টের বস্তা বেঁধে মাথায় গুলি করে, পেট কেটে সিমেন্টের বস্তাসহ চারজনকে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। এরপরে আমরা ট্রলার ঘুরিয়ে মূল অভিযান এলাকার দিকে রওনা দেই। ভোরে আমরা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই র্যাব-৬ এবং র্যাব-৮ এর আভিযানিক দলটি পৌঁছে গিয়েছিলো। জিয়া স্যারের ট্রলারটি পৌঁছানো মাত্রই তার নির্দেশে ফায়ার শুরু হয়। কিছু সময় ফায়ারের পর এলাকাটি ঘিরে রেখে স্থানীয় পুলিশ আসার অপেক্ষায় ছিলাম। স্যার ট্রলারের খোলের ভিতর থেকে হাত বাঁধা অবস্থায় পঞ্চম ব্যক্তিকে বের করে আনান। পরে বনের ভিতরে নিয়ে তাকে হত্যা করা হয়।
সুন্দরবনে আরো পাঁচজনকে হত্যা
জবানবন্দিতে সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, ২০১২ সালের মার্চে জিয়া স্যারের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় সুন্দরবনের ভোলা নদী সংলগ্ন মরা ভোলা এলাকায় ত্রিমাত্রিক অভিযান চালানো হয়েছিল। এখানেও মূল অভিযানের আগে ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের একদল সদস্য আগেই চলে যায়। মূল দল ঘটনাস্থলে গেলে বন লক্ষ্য করে ফায়ার শুরু করে। আনুমানিক ৩০ মিনিট ফায়ারের পর স্থানীয় পুলিশের মাধ্যমে বন তল্লাশী করে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অস্ত্র, গোলাবারুদ ও পাঁচটি লাশ উদ্ধার দেখানো হয়।
মেজর (অব.) সাব্বির আরো বলেন, এই তিনটি এনকাউন্টার অভিযান আলাদাভাবে উল্লেখ করার কারণÑআমার কাছে মনে হয়েছে, অভিযানগুলো ছিল সাজানো। এর পিছনে আমার যুক্তি ছিল প্রতিটি অভিযানের আগে ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের একদল চলে যেতো, যেটা যাওয়ার কথা নয়। বনের ভিতর থেকে বনদস্যুদের ফায়ার আসলে সেটি আসার কথা একনলা বা দোনলা বন্দুক থেকে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আমরা কখনও হুঁইসেলের শব্দ পেয়েছি। আর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অটোমেটিক অস্ত্র ফায়ারের শব্দ পেয়েছি। এই ধরনের অটোমেটিক অস্ত্র কোনো অবস্থাতেই কোনো দস্যু বাহিনীর কাছে ছিল না। ঘটনার সময় ধারণকৃত বিভিন্ন সাংবাদিকের আলোকচিত্র এবং ভিডিও ফুটেজ দেখার পর আমার মনে হয়েছে, মূল আভিযানিক দল যখন অভিযানস্থলে গোলাগুলিতে ব্যস্ত, তখন র্যাব সদর দপ্তর থেকে আসা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সদস্য কোনো ধরণের অস্ত্র, বুলেট প্রুফ জ্যাকেট এবং হেলমেট ছাড়াই সাধারণ পোশাকে ঘটনাস্থলে চলাফেরা করছেন। যা স্টেইজড অপারেশন ছাড়া কোনোভাবেই নিরাপত্তার ঝুঁকিকে কম্প্রোমাইজ করে অভিযান চালানো সম্ভব না। র্যাবের দায়িত্ব পালনকালে আমার জানামতে জিয়া স্যার ১৫-২০ বার বরিশাল অঞ্চল ব্যবহার করে গলফ অপারেশন চালিয়েছেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


