বিদেশে উচ্চশিক্ষা অর্জনের স্বপ্ন অনেক শিক্ষার্থীরই। বিশ্বমানের শিক্ষা, আধুনিক গবেষণার সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশে নিজেকে গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষায় প্রতিবছর হাজারো শিক্ষার্থী দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশে পাড়ি জমান। তবে বিদেশে ভর্তি বা স্কলারশিপের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো ইংরেজি ভাষা দক্ষতার পরীক্ষা আইইএলটিএস (IELTS)। পরীক্ষার উচ্চ ফি এবং দীর্ঘ প্রস্তুতি প্রক্রিয়ার কারণে অনেক শিক্ষার্থী এ পরীক্ষায় অংশ নিতে দ্বিধায় থাকেন।
তবে এখন অনেক বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কলারশিপ কর্তৃপক্ষ আইইএলটিএসের বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করছে এমওআই (Medium of Instruction–MOI) সার্টিফিকেট। ফলে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের জন্য বিদেশে উচ্চশিক্ষার পথ আরো সহজ হয়ে উঠছে।
কী এই এমওআই সার্টিফিকেট
মিডিয়াম অব ইনস্ট্রাকশন বা এমওআই হলো একটি দাপ্তরিক সনদ, যা প্রমাণ করে শিক্ষার্থী তার পূর্ববর্তী শিক্ষাজীবনের নির্দিষ্ট কোর্স বা ডিগ্রি ইংরেজি মাধ্যমে সম্পন্ন করেছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এটি ইংরেজি দক্ষতার প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করে থাকে। ফলে আইইএলটিএস, টোয়েফল (TOEFL) বা পিটিই (PTE) ছাড়াও বিদেশে ভর্তির সুযোগ তৈরি হয়।
কীভাবে সংগ্রহ করবেন এমওআই
এমওআই সংগ্রহের জন্য শিক্ষার্থীকে সর্বশেষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের রেজিস্ট্রার অফিস বা পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দপ্তরে আবেদন করতে হয়।
আবেদনে উল্লেখ করতে হবে—শিক্ষার্থীর নাম, রোল ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর, বিভাগ এবং পাসের সাল। এছাড়া আবেদনপত্রের সঙ্গে মার্কশিট বা সনদের ফটোকপি সংযুক্ত করতে হয়। অনেক প্রতিষ্ঠানে নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে এ সনদ সংগ্রহ করা যায়।
একটি বৈধ এমওআই সার্টিফিকেটে যা থাকবে
বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রহণযোগ্যতার জন্য এমওআই সার্টিফিকেটে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকতে হবে। যেমন—
- প্রতিষ্ঠানের অফিশিয়াল প্যাড
- পুরো প্রোগ্রাম ইংরেজি মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে—এমন স্পষ্ট ঘোষণা
- পরীক্ষা, মূল্যায়ন ও থিসিস/প্রজেক্ট ইংরেজিতে সম্পন্ন হওয়ার উল্লেখ
- রেজিস্ট্রার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষর
- প্রতিষ্ঠানের অফিশিয়াল সিল
আবেদনের আগে যা জানা জরুরি
অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি সম্পন্ন হওয়ার পাঁচ বছরের বেশি সময় পার হলে এমওআই গ্রহণ করে না। সেক্ষেত্রে শিক্ষার্থীকে আইইএলটিএস, ডুয়োলিঙ্গো বা অন্য কোনো ভাষা দক্ষতা পরীক্ষার ফল জমা দিতে হতে পারে।
তাই আবেদনের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে ‘English Proficiency Waiver’ বা ভাষাগত ছাড়সংক্রান্ত নীতিমালা ভালোভাবে দেখে নেওয়া প্রয়োজন।
যেসব দেশে এমওআই গ্রহণ করা হয়
জার্মানি : উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের অন্যতম পছন্দের গন্তব্য জার্মানি। দেশটির অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কম খরচে বা প্রায় বিনা মূল্যে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে। স্নাতক ডিগ্রি ইংরেজি মাধ্যমে সম্পন্ন হলে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এমওআই গ্রহণ করে।
হাঙ্গেরি : হাঙ্গেরির জনপ্রিয় সরকারি বৃত্তি ‘স্টাইপেন্ডিয়াম হাঙ্গেরিকাম’-এর আওতায় বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমওআই গ্রহণ করা হয়। এতে টিউশন ফি ছাড়াও আবাসন ও জীবনযাপনের খরচের সুবিধা পাওয়া যায়।
যুক্তরাজ্য : যুক্তরাজ্যের বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে আইইএলটিএস ছাড়াই এমওআই-এর ভিত্তিতে ভর্তির সুযোগ দেয়। বিশেষ করে ইংরেজি বিষয়ে ভালো ফল থাকলে সুযোগ আরো বাড়ে।
মালয়েশিয়া : এশিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় শিক্ষাগন্তব্য মালয়েশিয়ার বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এমওআই গ্রহণ করে থাকে। তুলনামূলকভাবে কম খরচ এবং আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষার কারণে দেশটি বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে আকর্ষণীয়।
পোল্যান্ড, ফ্রান্স, সুইডেন ও ডেনমার্ক : ইউরোপের এসব দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ও বিজনেস স্কুল নির্দিষ্ট প্রোগ্রামে এমওআই গ্রহণ করে। বিশেষ করে মাস্টার্স পর্যায়ের ইংরেজি মাধ্যমের কোর্সগুলোয় এ সুবিধা পাওয়া যায়।
চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া : ইংরেজি মাধ্যমে পরিচালিত বিভিন্ন প্রোগ্রামে এমওআই দিয়ে আবেদন করা যায়। পাশাপাশি সরকারি ও বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ স্কলারশিপের সুযোগও রয়েছে।
এমওআই গ্রহণকারী উল্লেখযোগ্য কতিপয় বিশ্ববিদ্যালয় হলো—টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অব মিউনিখ, ইউনিভার্সিটি অব বন, হামবোল্ট ইউনিভার্সিটি অব বার্লিন, ইউনিভার্সিটি অব ডেব্রেচেন, ইউনিভার্সিটি অব পেকস, ইওটভোস লোরান্ড ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব পোর্টসমাউথ, নর্থামব্রিয়া ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব হার্টফোর্ডশায়ার, কভেন্ট্রি ইউনিভার্সিটি, টেলরস ইউনিভার্সিটি, সানওয়ে ইউনিভার্সিটি, এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটি (APU) এবং ইউনিভার্সিটি অব ওয়ারশ।
আইইএলটিএস ছাড়াই আবেদনের সুযোগ থাকা জনপ্রিয় স্কলারশিপ
সুইডিশ ইনস্টিটিউট স্কলারশিপ : টিউশন ফি, মাসিক ভাতা, স্বাস্থ্যবিমা ও ভ্রমণ অনুদান প্রদান করা হয়।
এসবিডব্লিউ বার্লিন স্কলারশিপ : টিউশন ফি ছাড়াও থাকা-খাওয়া এবং মাসিক ভাতার সুবিধা রয়েছে।
দোহা ইনস্টিটিউট স্কলারশিপ : টিউশন ফি, আবাসন ও স্বাস্থ্যবীমা প্রদান করা হয়।
স্টাইপেন্ডিয়াম হাঙ্গেরিকাম : ব্যাচেলর্স, মাস্টার্স ও পিএইচডি পর্যায়ে পূর্ণ অর্থায়নের সুযোগ দেওয়া হয়।
ইরাসমাস মুন্ডাস স্কলারশিপ : একাধিক ইউরোপীয় দেশে অধ্যয়নের সুযোগের পাশাপাশি টিউশন ফি ও ভ্রমণ ব্যয় বহন করা হয়।
ইএনএস ইন্টারন্যাশনাল সিলেকশন স্কলারশিপ : মাসিক ভাতা ও আবাসন সুবিধাসহ ফ্রান্সে উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেওয়া হয়।
ইউনিভার্সিটি অব পেকস স্কলারশিপ : হাঙ্গেরিতে বিনা মূল্যে পড়াশোনার অন্যতম জনপ্রিয় বৃত্তি।
বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণে আইইএলটিএস একমাত্র পথ নয়। সঠিক তথ্য, যোগ্যতা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকলে এমওআই সার্টিফিকেট ব্যবহার করেও বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও স্কলারশিপের সুযোগ পাওয়া সম্ভব। তবে আবেদনের আগে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ ভর্তি নীতিমালা যাচাই করে নেওয়া উচিত।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

