রাকসুর ৯ মাসে প্রত্যাশা আর বাস্তবতার ফারাক

রাকসুর ৯ মাসে প্রত্যাশা আর বাস্তবতার ফারাক

দীর্ঘ ৩৬ বছর পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার মধ্য দিয়ে ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক চর্চার নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল। বছরের পর বছর নির্বাচিত ছাত্রনেতৃত্বের অনুপস্থিতির পর শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ছিল, নতুন রাকসু হবে তাদের অধিকার আদায়ের শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম, প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে কার্যকর সেতুবন্ধন এবং ক্যাম্পাসের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর বাস্তবসম্মত সমাধানকারী প্রতিষ্ঠান।

নির্বাচনি প্রচারে আবাসন সংকট নিরসন, পরিবহন ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, প্রশাসনিক ডিজিটালাইজেশন, গবেষণা সহায়তা, হল ডাইনিংয়ের মানোন্নয়ন, নিরাপদ ক্যাম্পাস ও শিক্ষার্থীদের কল্যাণে নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় নয় মাস পর সেই প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে শুরু হয়েছে মূল্যায়ন। কিছু ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি এলেও শিক্ষার্থীদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ অনেক অঙ্গীকার এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

বিজ্ঞাপন

গত বছরের ১৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত রাকসু নির্বাচনে ২৩টি পদের মধ্যে ২০টিতে জয় পায় ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’। তাদের নির্বাচনি প্রচারের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘৭টি হ্যাঁ, ৭টি না’ এবং ‘১২ মাসে ২৪ সংস্কার’। অন্যদিকে, স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাউদ্দিন আম্মারের ইশতেহারে পূর্ণাঙ্গ আবাসিকতা, হল ডাইনিংয়ের মানোন্নয়ন, আধুনিক মেডিকেল সেন্টার, প্রশাসনিক ডিজিটালাইজেশন এবং পূর্ণাঙ্গ টিএসসিসি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার ছিল। এসব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাকসু একটি কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক ছাত্র সংসদে পরিণত হবে—এমন প্রত্যাশাই ছিল শিক্ষার্থীদের।

যেসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি

দায়িত্ব গ্রহণের ৯ মাসে রাকসু কয়েকটি দৃশ্যমান উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ও বিভিন্ন হলের রিডিং রুমে এসি স্থাপন, বিশুদ্ধ পানির ফিল্টার বসানো, ক্যাম্পাসে ফার্মেসি চালু, নারী উদ্যোক্তা মেলা, থিসিস প্রণোদনা এবং বিদেশি শিক্ষকদের অংশগ্রহণে বিভিন্ন সেমিনারের আয়োজন।

এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটাল নিরাপত্তা, ফ্যাক্ট-চেকিং, অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট, ওয়ার্ডপ্রেস ও গবেষণা পদ্ধতি বিষয়ে প্রশিক্ষণ, বিনামূল্যে আইইএলটিএস প্রস্তুতি, বিভিন্ন ক্রীড়া আয়োজন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি ভেন্যুর ভাড়া কমানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

অপূর্ণ রয়ে গেছে যেসব প্রতিশ্রুতি

তবে রাকসুর আলোচিত অনেক প্রতিশ্রুতিই এখনো বাস্তবায়নের অপেক্ষায়। শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি আবাসন সংকট নিরসন কিংবা অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য ভাতা চালুর বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। একইভাবে বাসের ট্রিপ ও রুট ব্যবস্থাপনা, মেডিকেল সেন্টারের সংস্কার, অন-ক্যাম্পাস জব এবং পূর্ণাঙ্গ টিএসসিসি বাস্তবায়নেও দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি।

এ ছাড়া নিরাপদ ক্যাম্পাস নিশ্চিত করা, নারী শিক্ষার্থীদের অধিকার সুরক্ষা, অপরাধ দমন, মেস নীতিমালা প্রণয়ন, গ্রন্থাগারের আধুনিকায়ন, গবেষণা অনুদান ও বৃত্তি বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া প্রশিক্ষক নিয়োগ, হলগুলোর ইন্টারনেট সমস্যার সমাধান এবং প্রশাসনিক ডিজিটালাইজেশনের মতো প্রতিশ্রুতির বেশিরভাগই এখনো আংশিক বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে।

শিক্ষার্থীদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া

রাকসুর কার্যক্রম নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম বলেন, ৩৬ বছর পর রাকসু হওয়ায় শিক্ষার্থীদের অনেক প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু ৯ মাসেও পরিবহন, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা হলের খাবারের মানে দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়নি। ইশতেহারের অনেক প্রতিশ্রুতিই বাস্তবায়িত হয়নি বলে মনে হয়। অন্তত হলের খাবারের মান ভালো হবে, এমন আশা ছিল। কিন্তু সে জায়গায়ও আমরা হতাশ।

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী তুষার ইমরান বলেন, ‘রাকসুর কার্যক্রম দেখে মনে হয়েছে, তারা শিক্ষার্থীদের ইশতেহারের চেয়ে দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নেই বেশি মনোযোগী। নয় মাসেও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির উল্লেখযোগ্য অংশ বাস্তবায়িত হয়নি।

প্রশাসনিক ও আর্থিক সীমাবদ্ধতাও বড় চ্যালেঞ্জ

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে রাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাউদ্দিন আম্মার বলেন, লালফিতার দৌরাত্ম্যের কারণে অনেক কাজ নির্ধারিত সময়ে করা সম্ভব হচ্ছে না। আগের উপাচার্যের সময়ে অনেক বিষয় এগিয়ে নিয়েছিলাম। নতুন উপাচার্য দায়িত্ব নেওয়ার পর সেগুলো আবার নতুন করে শুরু করতে হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমার ইশতেহারের অধিকাংশ প্রতিশ্রুতিই দীর্ঘমেয়াদি। আবাসন, মেডিকেল সেবার উন্নয়ন ও শিক্ষক মূল্যায়নের মতো বিষয়গুলো নিয়ে আলাদাভাবে কাজ করা হয়েছে। প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য তিন হাজার ৩৭৫ কোটি টাকার একটি বাজেট অনুমোদন হয়েছে, যেখানে সাতটি নতুন হল নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক সমস্যার সমাধান হবে।’

ইশতেহার বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি কোনো অবাস্তব প্রতিশ্রুতি দিইনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব অঙ্গ ও দপ্তর সমন্বিতভাবে কাজ করলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন সম্ভব হতো।

শিবির-সমর্থিত সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট থেকে নির্বাচিত রাকসুর সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) এস এম সালমান সাব্বির বলেন, দীর্ঘ ৩৬ বছর পর নির্বাচন হওয়ায় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া বুঝে উঠতেই কয়েক মাস সময় লেগেছে। এখনো বিভিন্ন দপ্তরে একই বিষয়ে বারবার যেতে হচ্ছে। পাশাপাশি আর্থিক দিক থেকেও আমরা পূর্ণাঙ্গ সহযোগিতা পাচ্ছি না।

তিনি আরো বলেন, বাজেট ও স্পন্সরশিপসংক্রান্ত জটিলতার কারণে অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের ভাতা, পূর্ণাঙ্গ টিএসসিসি, মেডিকেল সেবার সংস্কার এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে পূর্ণাঙ্গ আবাসিক করার মতো বড় উদ্যোগগুলো এখনো শুরু করা যায়নি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন