প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয়। রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এ বিশ্ববিদ্যালয় জন্মলগ্ন থেকে শিক্ষা, গবেষণা ও জাতীয়ভাবে অবদানের ক্ষেত্রে নিজের অবস্থান প্রথম স্থানেই ধরে রেখেছে। দেশের বহু জ্ঞানীগুণী, পণ্ডিত, শিল্পী-সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদের জন্ম হয়েছে এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এ ছাড়া এ দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস, ভাষা আন্দোলন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ দেশের সব ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে বিশ্ববিদ্যালয়টি।
অবস্থান
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাজধানী ঢাকা শহরের প্রায় কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। এর উত্তর দিকে নিউ এলিফ্যান্ট রোড। পশ্চিমে ইডেন কলেজ, দক্ষিণে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও পূর্বে কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ।
ইতিহাস
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকালে স্বাধীন জাতিসত্তা বিকাশের লক্ষ্যে বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ব্রিটিশ ভারতে তৎকালীন শাসকদের অন্যায্য সিদ্ধান্তে পূর্ববঙ্গের মানুষের প্রতিবাদের ফসল হচ্ছে এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পূর্ববঙ্গ শিক্ষাদীক্ষা ও অর্থনীতি সব ক্ষেত্রেই পিছিয়ে ছিল। বঙ্গভঙ্গ হওয়ার পর এ অবস্থার খানিকটা পরিবর্তন হয়েছিল, বিশেষ করে শিক্ষার ক্ষেত্রে। বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পর ঢাকার স্থানীয় মুসলিম নেতারা বিশেষ করে ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, ধনবাড়ীর নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী ও শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৯১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ।
১৯১৩ সালে প্রকাশিত হয় নাথান কমিটির ইতিবাচক রিপোর্ট এবং সে বছরের ডিসেম্বর মাসেই সেটি অনুমোদিত হয়। ১৯১৭ সালে গঠিত স্যাডলার কমিশনও ইতিবাচক প্রস্তাব দিলে ১৯২০ সালের ১৩ মার্চ ভারতীয় আইন সভা পাস করে দ্য ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট (অ্যাক্ট নং-১৩) ১৯২০। সৃষ্টির শুরুতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়ে। কলকাতার তৎকালীন একটি শিক্ষিত মহল ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে। এ ছাড়া ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। এর ফলে পূর্ব বাংলার মানুষ হতাশা প্রকাশ করে।
১৯১৭ সালের মার্চ মাসে ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী সরকারের কাছে অবিলম্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিল পেশের আহ্বান জানান। ১৯২০ সালের ২৩ মার্চ গভর্নর জেনারেল এ বিলে সম্মতি দেন। এ আইনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার ভিত্তি। এ আইনের বাস্তবায়নের ফলাফল হিসেবে ১৯২১ সালের ১ জুলাই যাত্রা শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ছাত্রছাত্রীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বার উন্মুক্ত হয় ১৯২১ সালের ১ জুলাই। সে সময়ে ঢাকার সবচেয়ে অভিজাত ও সৌন্দর্যমণ্ডিত রমনা এলাকায় প্রায় ৬০০ একর জমির ওপর পূর্ববঙ্গ, আসাম প্রদেশের পরিত্যক্ত ভবনাদি এবং ঢাকা কলেজের (বর্তমান কার্জন হল) ভবনগুলোর সমন্বয়ে মনোরম পরিবেশে গড়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার এই দিনটি প্রতিবছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস হিসেবে পালন করা হয়।
শুরুর কথা
তিনটি অনুষদ ও ১২টি বিভাগ নিয়ে একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এর যাত্রা শুরু হয়। কলা, বিজ্ঞান ও আইন অনুষদের অন্তর্ভুক্ত ছিল বাংলা, ইংরেজি, শিক্ষা, ইতিহাস, আরবি, ইসলামিক স্টাডিজ, ফারসি ও উর্দু, দর্শন, অর্থনীতি ও রাজনীতি, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, গণিত ও আইন।
প্রথম শিক্ষাবর্ষে বিভিন্ন বিভাগে মোট ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ছিল ৮৭৭ এবং শিক্ষকসংখ্যা ছিল মাত্র ৬০। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী লীলা নাগ (ইংরেজি বিভাগ; এমএ-১৯২৩)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে অস্থিরতা ও ভারত বিভক্তি আন্দোলনের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রা কিছুটা ব্যাহত হয়। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। তৎকালীন পূর্ববঙ্গ তথা পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত প্রদেশের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে এ দেশের মানুষের আশা উজ্জীবিত হয়। তৎকালীন পূর্ববাংলার ৫৫টি কলেজ এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়। ১৯৪৭-৭১ সময়ের মধ্যে পাঁচটি নতুন অনুষদ, ১৬টি নতুন বিভাগ ও চারটি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে গৌরবময় ভূমিকা। স্বাধীনতাযুদ্ধে এ বিশ্ববিদ্যালয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আক্রমণের শিকার হয়। এতে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ছাত্রছাত্রীসহ শহীদ হয়েছেন বহুজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্যে ১৯৬১ সালে স্বৈরাচার আইয়ুব খানের সরকার প্রবর্তিত অর্ডিন্যান্স বাতিলের জন্য ষাটের দশক থেকে শিক্ষকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে স্বাধীনতার পর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ওই অর্ডিন্যান্স বাতিল করে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ, ১৯৭৩’ জারি করে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় এই অধ্যাদেশে পরিচালিত হয়ে আসছে।
অনুষদ
দেশের সর্বপ্রাচীন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ১৩টি অনুষদ, ৮৩টি বিভাগ, ১৩টি ইনস্টিটিউট ও ৫৬টি গবেষণাকেন্দ্র রয়েছে।
শিক্ষক, কর্মকতা ও কর্মচারীর সংখ্যা
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকের সংখ্যা ১ হাজার ৯৯২, অফিসারের সংখ্যা ১ হাজার ৩০, তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর সংখ্যা ১ হাজার ১৩৭ এবং চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর সংখ্যা ২ হাজার ২৫০।
শিক্ষার্থী
এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের থাকার জন্য রয়েছে ২০টি আবাসিক হল ও তিনটি হোস্টেল। ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা (২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত) ৩৭ হাজার ১৮। এ ছাড়া পিএইচডি ডিগ্রিতে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা রয়েছে ১ হাজার ২০১। এমফিল ডিগ্রিরত রয়েছেন ১ হাজার ৯৫৬। এ ছাড়া এযাবৎ কাল পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েছেন ১ হাজার ৪২৯ জন এবং এমফিল শেষ করেছেন ১ হাজার ৩৭৭ জন। এ ছাড়া রয়েছে ৩২৭টি ট্রাস্ট ফান্ড ও ১০৫টি অধিভুক্ত কলেজ। এসব প্রতিষ্ঠানে রয়েছেন ৪৫ হাজার ৩৭৪ ছাত্রছাত্রী এবং ৭ হাজার ৯৮১ শিক্ষক।
বিশেষ অর্জন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বাংলাদেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ২০০৬ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
ঐতিহাসিক স্থান
মধুর ক্যান্টিন, ডাকসু, টিএসসি, অপরাজেয় বাংলা, তিন নেতার মাজার, মীর জুমলার গেট, ডিমিট্রিয়াস, বুদ্ধিজীবী চত্বর, ঐতিহাসিক বটতলা, স্বোপার্জিত স্বাধীনতা, রাজু ভাস্কর্য, স্বাধীনতার সংগ্রাম, শান্তির পায়রা ও স্মৃতিময় জগন্নাথ হল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচার্য
প্রতিষ্ঠার পর প্রথম উপচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন স্যার পি জে হার্টগ। ১৯২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯২৫ সাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট থেকে ৩০তম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান।

চেনাজানা বিভিন্ন চত্বর
ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্রে প্রায় ২৫৬ একর জায়গা নিয়ে গঠিত দেশের অন্যতম প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। যদিও ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠাকালে এর আয়তন ছিল প্রায় ৬০০ একর, কালের আবর্তনে যা কমে এসেছে। বিস্তর এ এলাকার আনাচে-কানাচে রয়েছে বিভিন্ন স্থাপনা, ভাস্কর্য, রাস্তা এবং চত্বর। ঢাবি ক্যাম্পাসের বাঁকে বাঁকে থাকা কিছু চত্বরের সঙ্গে একদিকে যেমন মিশে রয়েছে, অনেক স্মৃতিকথা তেমনি ক্যাম্পাসের ভৌগোলিক পরিচিতি পেতেও এগুলো সহায়ক।
বাংলা একাডেমির অভিধান অনুযায়ী চত্বর শব্দের অর্থ চাতাল, চবুতর, প্রাঙ্গণ, উঠান, আঙিনা, রঙ্গভূমি ও যজ্ঞভূমি। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা চত্বরগুলোর মধ্যে রয়েছেÑসবুজ চত্বর, মিলন চত্বর, পায়রা চত্বর, ভিসি চত্বর, স্বাধীনতা সংগ্রাম ভাস্কর্য চত্বর, ডাস, সামাজিক বিজ্ঞান চত্বর, দোয়েল চত্বর, মল চত্বর এবং হাকিম চত্বর।

লোগো তৈরি হয়েছিল যেভাবে
প্রতিষ্ঠার পর বেশ কয়েকবার বদলেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো। সর্বশেষ যে লোগোটা রয়েছে, সেটি তৈরি করেছেন শিল্পী সমরজিৎ রায়চৌধুরী। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় ব্রিটিশ শাসন ছিল। সে সময়ই বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি লোগোও ছিল।
পরে পাকিস্তান আমলে সেই লোগো বদলে যায়। এরপর ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হলে বর্তমান লোগোটির প্রচলন হয়। বেগুনি রঙের লোগোটির তিনটি অংশ। ওপরে প্রদীপের আলো। তারও ওপরে ‘শিক্ষাই আলো’ লেখা। নিচে দুই ভাগের ডান পাশে একটি চোখ। আর বাঁ পাশে শাপলা ফুল।
সমরজিৎ রায়চৌধুরী জানান, চোখ এনেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নেওয়া ছাত্রছাত্রীদের প্রতীক হিসেবে। আর চোখের মাঝখানে স্বরবর্ণের প্রথম অক্ষর। ফুল এসেছে সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে। শাপলা জাতীয় ফুল হওয়ায় অন্য ফুলের কথাও আর ভাবেননি তিনি।
লোগোটি তৈরির ইতিহাস জানাতে গিয়ে সমরজিৎ রায়চৌধুরী বলেন, নতুন লোগো তৈরির জন্য খোঁজ পড়েছিল শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের। তিনি তখন উপাচার্যকে বললেন, ‘আমি লোগো করি না, তবে করিয়ে দিতে পারি।’ তারপর স্যার আমাকে ডেকে বললেন, ‘একটা লোগো লাগবে, তুমি করে দাও। খসড়াটা কামরুলকে (পটুয়া কামরুল হাসান) দেখিয়ে নিয়ো।’ বাংলাদেশের বেশিরভাগ লোগো কামরুল হাসানই করেছেন। আমি খসড়া করে আবেদিন স্যারের কাছে নিয়ে গেলাম।
তিনি তখন দেখে বললেন, ‘এটা আমার পছন্দ হলো না।’ তারপর পেনসিল দিয়ে ড্রইং করে বললেন, ‘এটা করে নিয়ে আসো।’ ওইদিনই করে দিলাম। সেটা স্যারের পছন্দ হলো। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে লোগোটো পৌঁছে দিলেন। সেটাই বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হয়। তা দিয়েই খাম, প্যাড সব ছাপা হয়।
সমরজিৎ রায়চৌধুরী বলেন, এরপরই লোগো নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলো। বলা হয়, ভালো হয়নি, এটা হয়নি, সেটা হয়নি ইত্যাদি। পত্রপত্রিকায়ও বিষয়টি নিয়ে লেখালেখি হয়। পরে বাতিলও করা হলো। আবার একটা খসড়া করেছিলাম। পরে সেটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পছন্দ করে। আর সেটিই এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।
সমরজিৎ রায়চৌধুরীর জন্ম ১৯৩৭ সালে বাঞ্ছারামপুরে। ১৯৬০ সালে তখনকার চারু ও কারুকলা কলেজ থেকে কমার্শিয়াল আর্ট বা গ্রাফিক ডিজাইনে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। কলেজটি বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ। ওই বছরই কলেজে যোগ দেন শিক্ষক হিসেবে।
৪৩ বছর শিক্ষকতার পর তিনি অবসরে যান ২০০৩ সালে। বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানের অঙ্গসজ্জাকারীদের একজনও সমরজিৎ রায়চৌধুরী। ২০১৪ সালে একুশে পদক পেয়েছেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ ভাস্কর্য
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ’৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬-র ছয় দফা, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, ’৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ সব জাতীয় আন্দোলনের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

এসব আন্দোলন-সংগ্রামে যারা শহীদ হয়েছেন, কিংবা নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টার মাধ্যমে দেশ ও জনগণের কল্যাণে অবদান রেখেছেন, তাদের স্মরণে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে অসংখ্য ভাস্কর্য।

এগুলোর মধ্যে রয়েছে—অপরাজেয় বাংলা, স্বোপার্জিত স্বাধীনতা, রাজু ভাস্কর্য, স্বাধীনতা সংগ্রাম, স্মৃতি চিরন্তন, মধুদার ভাস্কর্য, সড়ক দুর্ঘটনা স্মৃতিস্থাপনা, রাউফুন বসুনিয়া ভাস্কর্য ও দোয়েল চত্বর।

এছাড়া স্বামী বিবেকানন্দ ভাস্কর্য, শান্তির পায়রা, বেগম রোকেয়া ভাস্কর্য, মা ও শিশু ভাস্কর্য, সপ্তশহীদ স্মৃতিস্তম্ভ, নিঝুম স্থাপত্য, চারুকলার জয়নুল স্মৃতি ভাস্কর্য, শামসুন নাহার হলের পাশে অবস্থিত শহীদ মিজান ভাস্কর্য, বৌদ্ধ ভাস্কর্যসহ আরো কিছু ভাস্কর্য রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় বিরোধিতা করেছিলেন যারা
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে ঘোরবিরোধী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। লর্ড হার্ডিঞ্জ স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, কীসের বিনিময়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিরোধিতা থেকে বিরত থাকবেন?
শেষ পর্যন্ত স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য চারটি নতুন অধ্যাপক পদ সৃষ্টির বিনিময়ে তার বিরোধিতার অবসান করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য শিক্ষক নিয়োগে সহযোগিতা করেছিলেন।
সৈয়দ আবুল মকসুদ তার ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা’ বইতে রাজনীতিক সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জীর নাম উল্লেখ করেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের আরো কয়েকজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেন।
১৯১২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ড. রাসবিহারী ঘোষের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের (তার ঢাকা সফর শেষে) সঙ্গে কলকাতায় সাক্ষাৎ করে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিরোধিতা-সংবলিত একটি স্মারকলিপি পেশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভূমিকা কী ছিল সেটা নিয়ে মতভেদ আছে।
সৈয়দ আবুল মকসুদ তার ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা’ বইয়ে লিখেছেন, ‘শ্রেণিস্বার্থে রবীন্দ্রনাথও ছিলেন কার্জনের (লর্ড কার্জন) ওপর অতি ক্ষুব্ধ।’
কার্জনের উচ্চশিক্ষা-সংক্রান্ত মন্তব্যের তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় কলকাতার হিন্দু সমাজে। তাতে রবীন্দ্রনাথও অংশগ্রহণ করেন। তিনি যে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেন, তাতে কিছু ছিল যুক্তি, বেশিরভাগই ছিল আবেগ এবং কিছু ছিল ক্ষোভ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় বিরোধিতা নানা পক্ষ থেকে এসেছিল সেটি যেমন সত্য, ঠিক তেমনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের যে আবশ্যকতা রয়েছে, সেটা বোঝাতে এবং প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন অনেকে।
তাদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ। কিন্তু হঠাৎ করে ১৯১৫ সালে নবাব সলিমুল্লাহর মৃত্যু হলে নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী শক্ত হাতে এই উদ্যোগের হাল ধরেন। অন্যদের মধ্যে আবুল কাশেম ফজলুল হক উল্লেখযোগ্য।

লীলা নাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী
১৯২১ সালের ১ জুলাই যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়, সে সময় মোট শিক্ষার্থী ছিলেন ৮৪৭ জন, যাদের মধ্যে ছাত্রী ছিলেন একজন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর প্রথম শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হওয়া একমাত্র ছাত্রী ছিলেন লীলা নাগ। বাঙালি নারীদের মধ্যে শিক্ষাবিস্তারে তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন।
তিনি ইংরেজি সাহিত্যে এমএ করতে ভর্তি হয়েছিলেন, ফাইনাল পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিলেন। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯০০ সালের ২ অক্টোবর এবং মৃত্যুবরণ করেন ১৯৭০ সালের ১১ জুন। বিয়ের পর তার নাম হয় লীলা রায়। রাজনৈতিক আন্দোলন ছাড়াও জনহিতৈষী ও বাঙালি সাংবাদিক হিসেবে তিনি সক্রিয় ছিলেন। তিনি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর সহকারী ছিলেন। লীলা নাগ আসামের গোয়ালপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা গিরীশচন্দ্র নাগ অবসরপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন।
তার পিতৃপরিবার ছিল তৎকালীন সিলেটের অন্যতম সংস্কৃতিমনা ও শিক্ষিত পরিবার। লীলা নাগ ১৯৩৯ সালে বিপ্লবী অমিত রায়কে বিয়ে করেন। তার শিক্ষাজীবন শুরু হয় ঢাকার ইডেন স্কুলে। ১৯২১ সালে তিনি কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। পরীক্ষায় তিনি মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেন এবং পদ্মাবতী স্বর্ণপদক লাভ করেন। ১৯২১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিষয়ে স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯২৩ সালে তিনি দ্বিতীয় বিভাগে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। তিনিই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম এমএ ডিগ্রিধারী। তখনকার পরিবেশে সহশিক্ষার কোনো ব্যবস্থা ছিল না বলে লীলা রায়ের মেধা ও আকাঙ্ক্ষা বিচার করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভাইস চ্যান্সেলর ড. হার্টগ তাকে পড়ার বিশেষ অনুমতি দেন।
লীলা নাগ ঢাকা কলেজে পড়তেন। তার এক ক্লাস ওপরের ছাত্র ছিলেন সাহিত্যিক কাজী মোতাহার হোসেন। লীলা সম্পর্কে তিনি তার স্মৃতিকথা নামক প্রবন্ধ সংকলনে লেখেন, ‘এঁর মতো সমাজসেবিকা ও মর্যাদাময়ী নারী আর দেখিনি। এঁর থিওরি হলো, নারীদেরও উপার্জনশীলা হতে হবে, নইলে কখনও তারা পুরুষের কাছে মর্যাদা পাবে না। তাই তিনি মেয়েদের রুমাল, টেবিল ক্লথ প্রভৃতির ওপর সুন্দর নকশা এঁকে বিক্রয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। এসব বিক্রি করে তিনি মেয়েদের একটা উপার্জনের পন্থা উন্মুক্ত করে দেন।’ বাঙালি নারীদের মধ্যে শিক্ষাবিস্তারে তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি ঢাকার আরমানিটোলা বালিকা বিদ্যালয়, কামরুন্নেসা গার্লস হাইস্কুল ও শেরেবাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয় (তৎকালীন নারীশিক্ষা মন্দির) প্রতিষ্ঠা করেন। বিয়ের পর তার নাম হয় শ্রীমতী লীলাবতী রায়।
ভারত বিভাগের পর লীলা নাগ কলকাতায় চলে যান এবং সেখানেও কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। লীলা রায় ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন নেত্রী ছিলেন। এজন্য কয়েকবার তাকে কারাবরণ করতে হয়। তিনি মহিলা সমাজের মুখপত্র হিসেবে ‘জয়শ্রী’ নামে একটি পত্রিকা বের করেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

