দীর্ঘ ৩৩ বছর পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আগামী ১১ সেপ্টেম্বর জাকসু নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী ইতোমধ্যে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা ও চূড়ান্ত আচরণবিধি প্রণয়ন করেছে নির্বাচন কমিশন। মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমাদান শেষ হয়েছে গত ২১ আগস্ট। প্রকাশ করা হয়েছে খসড়া প্রার্থী তালিকা। তবে নির্বাচনের সব কাজ ঠিকঠাক চললেও আবাসিক হল থেকে ছাত্রত্ব না থাকা শিক্ষার্থীদের বের করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
সূত্র জানায়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) আবাসিক হলগুলোতে এখনো প্রায় এক হাজার মেয়াদোত্তীর্ণ শিক্ষার্থী রয়েছেন। তাদের মাধ্যমে নির্বাচনে যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটানোর চেষ্টা হতে পারে বলেও আশঙ্কা করছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরসহ অন্যরা। তারা মনে করেন, সুষ্ঠু জাকসু নির্বাচনের অন্যতম বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন হলে হলে থাকা অবৈধ এসব শিক্ষার্থী।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, গত ১০ আগস্ট তফসিল ঘোষণার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো থেকে ১৬ আগস্ট বিকালের মধ্যে হল থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের বের হয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয় প্রশাসন। তবে বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বের না হলে ১৬ আগস্ট রাতে আ ফ ম কামাল উদ্দিন হলে অভিযান চালায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ সময় হল প্রশাসন বেশকিছু রুম সিলগালা করে। এক পর্যায়ে প্রশাসনের কাজে বাধা দেয় অবৈধভাবে হলে থাকা শিক্ষার্থীরা। তারা হল থেকে বের হতে অস্বীকৃতি জানান। একইসঙ্গে প্রশাসনকে নানা শর্ত জুড়ে দেন তারা।
এরপরও অভিযান অব্যাহত রেখেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ছেলেদের ১১টি হলে অভিযান শেষ করেছে হল প্রশাসন। তবে হলগুলো থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের বের করা যায়নি। উল্টো প্রশাসনের সিলগালা করা রুমে তালা ভেঙে প্রবেশ করেছেন শিক্ষার্থীরা। হল প্রাধ্যক্ষদের সূত্রে জানা গেছে, বেশিরভাগ হল থেকে ২০১৫-১৬, ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা নোটিসের পর চলে গেছেন। তবে ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা বের হতে চাইছেন না। তারা দুবছর পর হলে সিট পেয়েছেন এবং ছাত্রলীগের আমলে গণরুমে ছিলেন—এমন অজুহাতে আরো কিছুদিন হলে থাকতে চাইছেন।
এদিকে পুরোনো হলগুলোতে মেয়াদোত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের তালিকা থাকলেও নতুন তিনটি হলে তা নেই। প্রভোস্টদের কাছে যে তালিকা আছে, এর বাইরেও অনেক মেয়াদোত্তীর্ণ শিক্ষার্থী রয়েছেন হলগুলোতে। মূলত ৫ আগস্টের পর ছাত্রলীগের ব্লকে অবস্থান করা অনেকে ফিরতে পারেননি নিজ হলে। তবে সরাসরি হামলায় জড়িত নন—এমন অনেকে এসে নতুন হলের ফাঁকা রুমগুলোতে উঠেছেন। এ অবস্থায় জাকসু নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে গত ২৫ আগস্ট হলে অবস্থান করা ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন উপাচার্য অধ্যাপক কামরুল আহসানসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। এ সময় মেয়াদোত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা অক্টোবর পর্যন্ত হলে অবস্থান করার দাবি জানান। একইসঙ্গে নির্বাচনের প্রচারকালীন সময়ে হলে অবস্থান করবেন না বলেও জানান তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একজন শিক্ষক জানান, মেয়াদোত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারে না। তাই তারা যে কোনো অবৈধ কাজে জড়িয়ে যেতে পারে। তাই নির্বাচনকে বিতর্কিত করতে যে কোনো দল এই অছাত্রদের ‘আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার আশ্বাসে’ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। তাই সুষ্ঠু নির্বাচন করতে গেলে অবশ্যই কেবল ভোটারদের হলে অবস্থান করতে হবে। জানতে চাইলে শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহিরউদ্দিন মোহাম্মদ বাবর বলেন, জাকসু নির্বাচনের আগে হল থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের বের করতে হবে। তাদের হলে রেখে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবির সভাপতি মহিবুর রহমান মুহিব বলেন, ‘নির্বাচনের আগে হলগুলো থেকে অবশ্যই মেয়াদোত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের বের করতে হবে। অবশ্য এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখতে পাচ্ছি না। আমাদের সাবেক শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করা হলে তার পরিণাম ভালো হবে না।’
এ বিষয়ে প্রভোস্ট কমিটির সভাপতি অধ্যাপক আবেদা সুলতানা জানান, ‘আমরা ছেলেদের প্রত্যেকটি হলে অভিযান পরিচালনা করেছি। অনেকে স্বেচ্ছায় হল ছেড়ে দিয়েছে। অনেকে হলে অবস্থান করছে। উপাচার্যের সঙ্গে তারা মিটিং করেছে। তারা কিছু দাবিও জানিয়েছে। উপাচার্য নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে কথা বলে তাদের জানাবেন।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

