দেশের শিক্ষা খাতের ব্যবস্থাপনায় সমস্যা ও সংকটের যেন শেষ নেই। শিক্ষার সার্বিক মানও যথেষ্ট প্রশ্নের মুখে। প্রাথমিক থেকে উচ্চপর্যায়ে বহু ধারার শিক্ষা চালু থাকলেও আধুনিক ও সমন্বিত শিক্ষা আইন এবং স্থায়ী কারিকুলাম প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ঘন ঘন শিক্ষানীতি ও কারিকুলাম পরিবর্তনে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সরকারগুলোর উদ্যোগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও আন্তর্জাতিক নানা র্যাঙ্কিংয়ে শিক্ষার মান অনেক পিছিয়ে আছে। পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ না দেওয়া, দক্ষ শিক্ষক ও ল্যাবসহ প্রয়োজনীয় শিক্ষাসামগ্রীর অভাব, দলীয়করণ এবং কর্মসংস্থানের সঙ্গে সমন্বয়হীন বাস্তবতাবিমুখ কারিকুলামসহ নানা কারণে শিক্ষার এই চিত্র বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। এতে শিক্ষিত সার্টিফিকেটধারী বেকারের সংখ্যাও বাড়ছে। বিশেষ করে পতিত আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সাড়ে ১৫ বছরে শিক্ষা খাতে ব্যাপক বিপর্যয় হয়েছে বলেও তারা জানিয়েছেন।
শিক্ষার এমন পরিস্থিতিতে আজ পালিত হবে মহান শিক্ষা দিবস। ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর চাপিয়ে দেওয়া বৈষম্যমূলক শিক্ষা সংকোচন নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিয়েছিলেন মোস্তফা, বাবুল, ওয়াজিউল্লাহসহ অসংখ্য ছাত্র। শহীদের রক্তস্নাত ১৭ সেপ্টেম্বর মহান ‘শিক্ষা দিবস’ হিসেবে পালন করছে ছাত্রসমাজ। ওই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়েও শিক্ষার জন্য এ দেশে বহু আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে। তবে শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত মান আজও বাস্তবায়িত হয়নি।
সবশেষ কোটা ও বৈষম্যমুক্ত শিক্ষার দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে চব্বিশের জুলাই বিপ্লবে ফ্যাসিবাদের পতনের পর শিক্ষার উন্নয়ন নিয়ে নতুন প্রত্যাশা সৃষ্টি হয় সবার মাঝে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা শিক্ষা আইন চূড়ান্তের উদ্যোগসহ নানা পরিকল্পনা নিলেও বাস্তবে তা সফলতার মুখ দেখেনি। ইতোমধ্যে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে শিক্ষার উন্নয়নে ঘোষিত ৪৩ কর্মসূচি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের আশ্বাস দিচ্ছে।
এরই অংশ হিসেবে গত সাত মাসে কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে সরকার নানা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করেছে। তবে শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠনসহ অন্যান্য প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখতে চান শিক্ষা-সংশ্লিষ্টরা। এক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর, নৈতিকতা ও কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি নীতি তৈরিসহ শিক্ষায় বড় ধরনের সংস্কারকাজ হাতে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা। তাছাড়া শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানো, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও তাদের প্রশিক্ষণ, প্রাইভেট-কোচিংয়ের পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের ক্লাসমুখী করা, ল্যাব ও আধুনিক সুবিধা, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করতে হবে
দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংকের (ইউটিএল) সাংগঠনিক সম্পাদক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. বিলাল হোসাইন বলেন, বাংলাদেশে শিক্ষার বিস্তার, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত হলেও শিক্ষার গুণগত মান এবং ফলপ্রসূ নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষাÑ প্রতিটি স্তরেই নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। শুধু সনদ অর্জন নয়, একজন শিক্ষার্থী কতটা জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা ও দায়িত্ববোধ অর্জন করছেÑসেটি দেখার বিষয়।
তিনি বলেন, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম বড় সংকট হলো মুখস্থনির্ভর ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা। ফলে অনেক শিক্ষার্থী ডিগ্রি অর্জন করলেও কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। পাশাপাশি শহর-গ্রাম, সরকারি-বেসরকারি এবং বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক শ্রেণির মধ্যে শিক্ষার সুযোগ ও মানের বৈষম্য রয়েছে। শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন, গবেষণার সুযোগ, প্রশিক্ষণ, কর্মপরিবেশ ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদার বিষয়ে আরো গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যেও কাঙ্ক্ষিত সমন্বয় নেই।
এই শিক্ষাবিদ বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করতে হবে। শিক্ষায় বিনিয়োগ ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিতের পাশাপাশি শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও পদোন্নতিতে মেধা এবং যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিতে হবে।
বিএনপির ইশতেহার ও সরকারের উদ্যোগ
বিএনপি সরকার গঠনের পর শিক্ষার উন্নয়নে নানা উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বিশেষ করে কারিকুলাম ও পাঠ্যবই সংশোধন এবং কারিগরি শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে নানা কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে সরকার।
সরকারের সাত মাসের কর্মকাণ্ড নিয়ে গতকাল বুধবার সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা ও মুখপাত্র মাহ্দী আমিন শিক্ষা খাতের নানা উন্নয়নের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিশ্বমঞ্চে তরুণদের কর্মসংস্থান উপযোগী করতে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে সবার জন্য কারিগরি শিক্ষা এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের পাঠ্যক্রমে নতুন দুটি করে মোট চারটি নতুন বই অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন, কারিগরি শিক্ষার আধুনিকায়নে চীনের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর, আন্তর্জাতিক সার্ভিস সেন্টার উদ্বোধন ও তিনটি প্ল্যাটফর্ম চালু, কক্সবাজারে বিশেষায়িত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ, উচ্চশিক্ষার সুযোগে প্রতিবছর ৫০৯ মেধাবী শিক্ষার্থীকে শতভাগ সৌদি সরকারি শিক্ষাবৃত্তির দ্বার উন্মোচন, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপহার হিসেবে এসএসসিতে শীর্ষ মেধাবীদের স্বীকৃতি ও উপহার প্রদানের সিদ্ধান্ত, কওমি ও আলিয়া মাদরাসা শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিতে ২০২৬-৩১ মেয়াদে বিনামূল্যে সুষম দুপুরের খাবারের রূপরেখা প্রণয়ন, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতে ঘোষিত ‘১৫ অনুশাসন’ বাস্তবায়ন এবং বছরব্যাপী খেলাধুলা ও সহশিক্ষা পরিচালনায় নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।
সূত্রমতে, বর্তমান সরকার শিক্ষা খাতকে গুরুত্ব দিয়ে বাজেটে বরাদ্দ বাড়িয়ে জিডিপি দুই শতাংশে উন্নীত করেছে। পর্যায়ক্রমে এটি পাঁচ শতাংশে নেওয়ার টার্গেট রয়েছে তাদের। এছাড়া ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন, লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস, বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, সবার জন্য কারিগরি শিক্ষা, ক্রীড়া ও দেশি সংস্কৃতি শিক্ষা অন্তর্ভুক্তি, বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস প্রদান, মিড ডে মিল চালুসহ প্রাথমিক থেকে স্কুল-কলেজ-মাদরাসা ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নানা উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু করেছে বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে।
ইশতেহারে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ‘শিক্ষা সংস্কার কমিশন’ গঠন করার কথা বলা হলেও এখনো তার কোনো উদ্যোগের খবর পাওয়া যায়নি।
হয়নি কোনো শিক্ষা আইন
স্বাধীনতা-পরবর্তী দেশে পাঁচটি শিক্ষা কমিশন ও তিনটি শিক্ষানীতি হলেও আজ পর্যন্ত কোনো শিক্ষা আইন হয়নি। সবশেষ ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিও পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হয়নি। এতে একটি শিক্ষা আইনের কথা বলা হলেও পতিত আওয়ামী সরকারের শেষ সময় পর্যন্ত খসড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। সবশেষ চব্বিশের বিপ্লব-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এ আইনটির খসড়ার ওপর মতামত গ্রহণ এবং বিভিন্ন মহলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা পাস হয়নি। বর্তমান সরকারের সময় ওই আইন নিয়ে আর কোনো তৎপরতার খবর পাওয়া যায়নি।
এদিকে আওয়ামী সরকারের সময়ে ২০২২ সালে নতুন কারিকুলাম চালু হলেও চব্বিশের জুলাই-পরবর্তী তা স্থগিত করে ২০১২ সালের পুরোনো কারিকুলামে ফিরে যায় সরকার। বর্তমানে সেটিই চালু আছে। অন্তর্বর্তী সরকারের পর বর্তমান বিএনপি সরকারও পাঠ্যবই এবং কারিকুলামে প্রয়োজনীয় সংশোধনীর উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষাব্যবস্থা দাবি
শিক্ষার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের সাবেক কারিকুলাম বিশেষজ্ঞ ও সরকারি কবি নজরুল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ড. হেদায়েত উল্লাহ বলেন, দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার অবস্থা হতাশাজনক। প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত কোথাও বিশ্বমানের শিক্ষা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রযুক্তি এবং কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা দরকার, যেখানে ইথিক্স ও মোরালিটিও গুরুত্ব পাবে।
তিনি বলেন, দলীয় চেতনায় ভিসি ও শিক্ষক নিয়োগ এবং ছাত্ররাজনীতি সামগ্রিক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাপনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও ছাত্ররাজনীতি সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ হওয়া উচিত। গবেষণায় বেশি প্রণোদনা এবং আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে ক্রেডিট ট্রান্সফারসহ এলাইনমেন্ট দরকার।
ড. হেদায়েত উল্লাহ বলেন, আলিয়া মাদরাসা শিক্ষাধারা বিশেষায়িত শিক্ষাব্যবস্থা হিসেবে এখানে থিওলজির বিষয়গুলো গত আমলে সংকুচিত করা হয়েছে। ফলে এই মাদরাসাগুলোর শিক্ষার উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। সাধারণ ধারার সঙ্গে মাদরাসা শিক্ষাধারার চরম বৈষম্য বিরাজ করছে। ফলে আলিয়া মাদরাসা শিক্ষাধারা চরম ব্র্যান্ডিং ক্রাইসিসে ভুগছে।
অন্যদিকে বেসরকারি কওমি শিক্ষাধারায় ৪০ লক্ষাধিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। আল-হাইয়াতুল উলয়ার সঠিক মনিটরিংয়ের অভাবে মাদরাসাগুলোতে চরম নৈরাজ্য চলছে। এতে যে কেউ, যেকোনো সময় যেখানে-সেখানে প্রতিষ্ঠান দিতে পারে। শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষক ছাঁটাই, বেতন কাঠামো নিজের ইচ্ছামত নির্ধারণ করতে পারে। সরকার এ ব্যাপারে শক্তিশালী আইন প্রণয়ন করতে পারে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


