‘কওমি’ শব্দটি উচ্চারিত হলেই এক জটিল ও বহুমাত্রিক বাস্তবতা সামনে চলে আসে। একদিকে বিস্তৃত মাদরাসা নেটওয়ার্ক, লাখো শিক্ষার্থী ও আলেম সমাজের দৃঢ় সামাজিক প্রভাব; অন্যদিকে একই পরিসরের ভেতরে মতপার্থক্য, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক অবস্থানগত টানাপোড়েনও সমানভাবে দৃশ্যমান। সারা দেশে কওমি নেতৃত্বের বিস্তার থাকলেও কাঙ্ক্ষিত ঐক্য গড়ে ওঠেনি; বরং বিভাজনই বেশি প্রকট। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে এই বিভাজন আরো স্পষ্ট হয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে কওমি অঙ্গন ধর্মীয় শিক্ষা, বিস্তৃত মাদরাসা নেটওয়ার্ক ও ধর্মীয় নেতাদের সামাজিক প্রভাবের জন্য পরিচিত। তাদের ঘোষিত লক্ষ্য ইসলামী শিক্ষা ও মূল্যবোধ রক্ষা করা হলেও গত কয়েক দশকে অভ্যন্তরীণ বিভাজন, রাজনৈতিক কৌশলের পার্থক্য, নেতৃত্বগত মতানৈক্য ও প্রজন্মগত ফারাকের কারণে সেই লক্ষ্য প্রায়ই হোঁচট খেয়েছে।
কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এই বিভাজনকে তীব্রভাবে সামনে এনেছে। এগুলো হচ্ছেÑ ২০১৭ সালে দাওরায়ে হাদিস সনদের সরকারি স্বীকৃতি, ২০২০ সালে শীর্ষ নেতৃত্বের পরিবর্তন, ২০২১ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন। এসব ঘটনার ধারাবাহিকতায় কওমি অঙ্গনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নতুন করে আলোচনায় আসে।
কওমি শিক্ষাধারার শিকড় ভারতের দেওবন্দি শিক্ষাপদ্ধতিতে, যা উনিশ শতকে প্রতিষ্ঠিত হয়ে পাকিস্তান আমল পেরিয়ে বাংলাদেশে বিস্তৃত হয়। দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী কওমি প্রতিষ্ঠান হাটহাজারী মাদরাসা দীর্ঘদিন কওমিদের নেতৃত্ব ও প্রভাবের কেন্দ্র ছিল। সেখান থেকে শিক্ষাসমাপ্তকারী আলেমরা সারা দেশে মাদরাসা প্রতিষ্ঠা ও ধর্মীয় নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
২০১৩ সালে শাপলা গণহত্যার পর কওমি ঐক্যে ফাটল তৈরি হয়। ২০২০ সালে আল্লামা শাহ আহমদ শফীর মৃত্যু কওমি অঙ্গনে বড় শূন্যতা তৈরি করে। হাটহাজারী মাদরাসায় ছাত্রদের আন্দোলন, নেতৃত্ববিরোধী অবস্থান এবং কমিটি পুনর্গঠন পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। পরবর্তী সময়ে নতুন নেতৃত্বে আসেন জুনায়েদ বাবুনগরী। ২০২১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে হেফাজতের আন্দোলন সহিংস উপায়ে দমন করেন তৎকালীন স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা।
এরপর ব্যাপক গ্রেপ্তার, মামলা ও সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে হেফাজত রাষ্ট্রীয় চাপের মুখে পড়ে এবং কার্যত দুই ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। একটি সমঝোতামুখী, অন্যটি আন্দোলনমুখী। এই সময় থেকেই কওমি রাজনীতির ভেতরে কৌশলগত মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়। কেউ সরকারের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখতে চান, কেউ বাস্তববাদী সমঝোতার পক্ষে। নতুন দল গঠন, শাখা আত্মপ্রকাশ, জোট ও ভাঙনÑ সব মিলিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি আরো জটিল হয়েছে।
এ বিষয়ে প্রখ্যাত আলেম, লেখক, মুফতি ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হারুন ইজহার আমার দেশকে বলেন, ‘কওমিরা ঐতিহাসিকভাবে মূলতঃ সামাজিক শক্তি। তবে রাজনৈতিক অঙ্গনে তাদের সাফল্য না থাকার কারণ সাংগঠনিক দুর্বলতা। হেফাজতে ইসলাম একসময় এক বিশাল ঐক্যের ভিত রচনা করেছিল। কিন্তু সাংগঠনিক অপরিপক্বতার কারণে সেই ঐক্য টেকেনি।’
কওমি দলের বিভাজন ও নেতৃত্বগত দ্বন্দ্ব
কওমি অঙ্গনের প্রধান দলগুলো হলো হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ নেজাম-ই-ইসলাম পার্টি ও ইসলামী ঐক্যজোট।
হেফাজতে ইসলাম মূলত কওমি মাদরাসার শিক্ষাব্যবস্থা এবং ইসলামী নৈতিকতা সংরক্ষণের লক্ষ্যে কাজ করে। দলটি নির্বাচনে সরাসরি অংশগ্রহণ করে না। আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর নেতৃত্বে দলটি সম্প্রতি নানা বিতর্কের মুখোমুখি হয়েছে।
১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ প্রধানত নির্বাচনি রাজনীতিতে সক্রিয়। তারা বিএনপি-বিরোধী অবস্থান নেয়, যা প্রায়শই জোটভিত্তিক দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত। একই বছরের মধ্যে তাদের একটি আলাদা শাখা আত্মপ্রকাশ করে। এই বিভাজন মূল দলের সঙ্গে রাজনৈতিক ও কৌশলগত দ্বন্দ্ব বাড়িয়েছে। নেতাদের মধ্যে নেতৃত্ব ও ভোট কৌশল নিয়ে মতবিরোধ দলকে প্রায়ই বিভক্ত অবস্থায় রাখে।
বাংলাদেশ নেজাম-ই-ইসলাম পার্টি ঐতিহ্যবাহী ইসলামিক রাষ্ট্র কাঠামো বজায় রাখার লক্ষ্যে কাজ করেছে। কিন্তু আধুনিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কখনো জোটে মিলিত হয়, কখনো পৃথক থাকে।
ইসলামী ঐক্যজোট মূলত ছোট কওমি দলগুলোকে সমন্বয় করার চেষ্টা চালায়। তবে জোট ও সমন্বয় সংক্রান্ত মতবিরোধ তাদের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বাড়িয়েছে।
এ ব্যাপারে মারকাযুল কুরআন ওয়াল হিকমাহ মাদরাসা পরিচালক, লেখক ও প্রকাশক মাওলানা ইসহাক খান আমার দেশকে বলেন, মতভিন্নতা, মতপার্থক্য ও বিভাজন এটা সব ঘরানার মধ্যেই কম-বেশি আছে। তবে কওমি ঘরানার মধ্যকার গতানুগতিক রাজনীতিকেন্দ্রিক যেসব বিভাজন দেখা যাচ্ছে তা দুঃখজনক। বিশেষত, যে কোনো মূল্যে প্রচলিত ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার জন্য ইসলামী আকীদা-আদর্শচ্যুত হওয়াটাও ইদানীং অনেকের কাছে সহজ হয়ে যাচ্ছে।
চার দশকের বিভাজন
১৯৮০-এর দশকে খেলাফত আন্দোলন ও ইসলামী আন্দোলন প্রধানভাবে সক্রিয় ছিল এবং ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করার চেষ্টা চালানো হচ্ছিল। তবে ১৯৯০–২০০০ সালের মধ্যে নতুন দল ও শাখা গঠন, বিশেষ করে খেলাফত মজলিসের আলাদা শাখা, দলগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি করে।
২০০০–২০১০ সালের মধ্যে হেফাজতের অগ্রযাত্রা এবং ধর্মীয় ও সামাজিক প্রভাব বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দলগুলোর কৌশলগত বিভাজন আরো দৃঢ় হয়। ২০১৩-২৫ সালের মধ্যে আন্দোলন, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, রাজনৈতিক সমঝোতা বিভাজনের পালে আরো হাওয়া দেয়।
বিভাজনের মূল কারণগুলো হলো আদর্শিক পার্থক্য, কৌশলগত অবস্থান, নেতৃত্বগত দ্বন্দ্ব, প্রজন্মগত ফারাক ও প্রশাসনিক বিভাজন। ধর্মীয় নীতি, শিক্ষানীতি ও রাষ্ট্রীয় নীতিতে মতবিরোধ, জোটে যোগদান বা স্বতন্ত্র নির্বাচনি পথ, নতুন প্রজন্ম ও প্রবীণ আলেমদের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির ফারাক ইত্যাদি সব মিলিয়ে কওমি রাজনীতির অস্থিতিশীলতা ও বিভাজনের চিত্র স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
পূর্বাচলে অবস্থিত মারকাযুস সুনান মাদরাসার প্রিন্সিপাল ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ঢাকা মহানগরের (পল্টন জোন) সহ-সেক্রেটারি মুফতি শফিকুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশে ইসলামী দল শক্তিশালী হওয়ার কথা হলেও কওমিকেন্দ্রিক দলগুলো বাস্তবে ঐক্য গড়তে পারেনি। আদর্শ প্রায় অভিন্ন হলেও পরিবারতন্ত্র, নেতৃত্বের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, আঞ্চলিক ও প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক বলয়, শিক্ষক-পীর অনুসরণের প্রবণতা, নবীন-প্রবীণ দ্বন্দ্ব প্রভৃতি বিষয়গুলো বিভাজন গভীর করেছে। অপেশাদার ও ইস্যুভিত্তিক রাজনীতি, জনজীবন থেকে দূরত্ব ও দেশি-বিদেশি সংস্থাগুলোর প্রভাবও জনগণের কাছে দলগুলোর আস্থা আরো কমিয়েছে। ফলে জনগণের শ্রদ্ধা থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনে প্রত্যাশিত সমর্থন মেলে না; সামগ্রিকভাবে পারস্পরিক অসহযোগিতাই স্থায়ী বিভক্তির মূল কারণ। উদার মানসিকতা ও সমন্বিত নেতৃত্ব গড়ে উঠলে ঐক্য সম্ভব, নচেৎ এ বিভাজন অব্যাহত থাকবে।
আনুষ্ঠানিকভাবে কওমি অঙ্গন দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকার দাবি করলেও বাস্তবে বিভিন্ন আলেমের বক্তব্য স্থানীয় ভোটারদের প্রভাবিত করে। ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেখা যায়, ধর্মীয় অঙ্গন একক রাজনৈতিক ব্লক নয়; বরং বহুমাত্রিক। কেউ নীরব, কেউ সক্রিয়, কেউ সমঝোতামুখী, কেউ বিদ্রোহী মনোভাবাপন্ন। সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনের সময় হেফাজতের এক শীর্ষ নেতা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দেওয়া ‘হারাম’ ঘোষণা করলে কওমি সমাজে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়।
কওমি রাজনীতির ভেতরে শিক্ষা বোর্ড ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়েও দ্বন্দ্ব রয়েছে। ২০১৭ সালে দাওরায়ে হাদিসকে সরকারি স্বীকৃতি দিয়ে আল-হাইয়াতুল উলয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ নামে কেন্দ্রীয় বোর্ড গঠন করা হয়। তবে বোর্ডের নিয়ন্ত্রণ, পরীক্ষা পদ্ধতি ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে বোর্ডগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। কোনো অংশ কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ চায়, অন্য অংশ স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে চায়। ফলে অন্তর্দ্বন্দ্ব বাড়ে।
এ ছাড়া ‘কওমি জননী’ বিতর্কও বিভাজনের একটি অধ্যায়। নারী শিক্ষা ও বোর্ড নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নে প্রথাগত ও আধুনিকপন্থীদের সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর এক শোকরানা মাহফিলে স্বৈরশাসক শেখ হাসিনাকে ‘কওমি জননী’ উপাধি দেওয়া হয়, যা ব্যাপক বিতর্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করে।
বর্তমানে কওমি রাজনীতি বহুমাত্রিক ও বিকেন্দ্রীভূত রূপ নিয়েছে। একদিকে তারা ধর্মীয় ও সামাজিক প্রভাব ধরে রেখেছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক বাস্তবতায় একক অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে কওমি সংগঠনগুলো সরাসরি বা পরোক্ষভাবে অংশ নেয়। কওমি ঘরানার প্রধান দলগুলোর মধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জাতীয় ভোটের দুই দশমিক ৭০ শতাংশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দুই দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ এবং খেলাফত মজলিস শূন্য দশমিক ৭৬ শতাংশ ভোট পায়।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী ২৯৭টি আসনের মধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ একটি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দুটি এবং খেলাফত মজলিস একটি আসন পায়। এতে বোঝা যায়, তারা উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় নির্বাচনে অংশ নিলেও শক্তিশালী একক নির্বাচনি ব্লক গঠন করতে পারেনি। ইসলামপন্থি ভোট বিভক্ত থাকায় সম্মিলিতভাবে বড় প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হয়। ফলে বিএনপি ও অন্যান্য বড় দল সুবিধা পায়। বড় দলগুলো, বিশেষ করে বিএনপি হেফাজতকে নিজেদের দিকে টানার চেষ্টা চালায়, যদিও হেফাজত আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনৈতিক দল নয়।
২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কওমি সংগঠনগুলো ভোট শেয়ার, আসন এবং নির্বাচনি কৌশলের মাধ্যমে অংশ নিয়ে প্রভাব তৈরি করলেও তারা ঐক্যবদ্ধ শক্তি হিসেবে বড় ভূমিকা রাখতে পারেনি। ফলে কওমি অঙ্গনের অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও মতানৈক্য ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের নির্বাচনি রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে থেকে যাবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

