আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ঝুলে আছে ঢাবি উপাচার্য নিয়োগ, স্থবির কার্যক্রম

মাহির কাইয়ুম, ঢাবি

ঝুলে আছে ঢাবি উপাচার্য নিয়োগ, স্থবির কার্যক্রম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়- এর উপাচার্য নিয়োগ প্রক্রিয়া অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। পদত্যাগপত্র জমা দিলেও সরকারিভাবে তা গৃহীত না হওয়ায় বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান দায়িত্বে বহাল রয়েছেন। এদিকে নতুন উপাচার্য নিয়োগে দেরি এবং প্রশাসনিক অনিশ্চয়তার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এদিকে গত সোমবার (২ মার্চ) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, উপাচার্য পদত্যাগপত্র জমা দিলেও আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত তিনি দায়িত্বে থাকবেন। পরবর্তীতে সাময়িকভাবে ‘নেক্সট ইন কমান্ড’-এর কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করা হবে এবং এরপর নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় স্থায়ী উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হবে।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, “স্পেসিফিক তারিখ উল্লেখ করে আবেদন আমাদের কাছে জমা আছে। টেম্পোরারি দায়িত্বে নেক্সট ইন কমান্ড চলে যাবেন। এরপর গ্লোবালি বেস্ট প্রসেস অনুসরণ করে পারমানেন্ট ভিসি নিয়োগ দেওয়া হবে।”

নতুন উপাচার্য নিয়োগে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।

সার্চ কমিটির মাধ্যমে উপাচার্য নিয়োগের আভাস:

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, নতুন উপাচার্য সার্চ কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। সম্ভাব্য এ কমিটির প্রধান হিসেবে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলনের নাম আলোচনায় রয়েছে।

গত ২২ ফেব্রুয়ারি অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান শিক্ষামন্ত্রীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র জমা দেন। ব্যক্তিগত ও প্রশাসনিক কারণ উল্লেখ করে তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন বলেন, "ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগের জন্য বৈশ্বিক বা আন্তর্জাতিক মান কী, তা জানতে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ভিসি নিয়োগ যেন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়, মানসম্মত হয় তা নিশ্চিত করা হবে" - শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।"

"অসাধারণ! দারুণ আশা জাগানিয়া কথা। শিক্ষা ও গবেষণাকে তিনি যে গুরুত্ব দিচ্ছেন তার প্রতিফলন প্রধানমন্ত্রীর এই কথায় স্পষ্ট। তড়িঘড়ি করে দলীয় কাউকে দিচ্ছেন না। আমি অনুরোধ করব একটি আন্তর্জাতিক সার্চ কমিটি করে একজন বিশ্বমানের ভিসি নিয়োগ দিন। তারপর তাকে যেন শিক্ষক সমিতি ও ছাত্র রাজনীতি কোনো ভাবে ডিসটার্ব করতে না পারে তার জন্য আমি আশা করব প্রধানমন্ত্রীর নিজের শক্তি ব্যয় করবেন। দেখবেন শিক্ষা ও গবেষণায় এক নতুন পরিবেশ তৈরী হবে। বিশ্বাস করুন দেশ বদলে যাবে আর মানুষ আপনাকেই বাহবা দেবে। দলান্ধদের নিয়োগ দিলে না দেশের ভালো হবে, না আপনার ভালো হবে না দলের। একটা নতুন সুন্দর বাংলাদেশ গঠন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগ দিয়েই শুরু হউক। পুরোনো গান্ধা নিয়ম নীতি সব আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করুন। দেশটাকে সুস্থ ধারায় ফেরান। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিশ্বায়ন করুন।"

তিনি আরও বলেন, "বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগে, শিক্ষক নিয়োগে ধর্ম, দেশ, দল দেখা একদম উচিত না। কারণ এর নাম যে বিশ্ববিদ্যালয়। এখন থেকে এই সরকারের প্রতিটি খারাপ নিয়োগই ব্যর্থতার কফিনে ঠোকা একেকটি পেরেক হয়ে উঠতে পারে। আর প্রতিটি সঠিক ও যোগ্য নিয়োগ হতে পারে সাফল্যের কপালে পরানো একেকটি বিজয়ের মালা।"

স্বাভাবিক কার্যক্রমে স্থবিরতা:

এদিকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর ২৬ আগস্ট অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০তম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান। এর আগে তিনি ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ–এর ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা ও প্রশাসনিক সূত্র জানিয়েছে, উপাচার্যের দপ্তরে এখন মূলত রুটিন কাজ চলছে। গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া যাচ্ছে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দিন আহমেদ বলেন, “অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আছে। স্যার জরুরি রুটিন কাজগুলো করছেন। কিন্তু বড় প্রকল্প, নতুন নিয়োগ, একাডেমিক নীতিনির্ধারণী বিষয়- এসব নিয়ে কার্যত বসা যাচ্ছে না। মন্ত্রণালয় থেকেও এখনো পরিষ্কার কোনো নির্দেশনা আসেনি।”

তিনি আরও বলেন, প্রথম বর্ষের ভর্তি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত, বড় উন্নয়ন প্রকল্পের নকশা চূড়ান্তকরণ, আসন্ন পহেলা বৈশাখের প্রস্তুতি- এসব বিষয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

উপাচার্যের দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, অফিসিয়াল ফাইলপত্রে স্বাক্ষর হচ্ছে- কখনো অফিসে, কখনো বাসভবনে গিয়ে। তবে বড় ধরনের নীতিগত বা দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম এক ধরনের ধীরগতির মধ্যে পড়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মুন্সি শামস উদ্দিন আহম্মদ বলেন, “উনি একটি আবেদন সরকারের কাছে জমা দিয়েছেন। যতক্ষণ পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে কোনো অফিসিয়াল অর্ডার বা গভর্নমেন্ট অর্ডার (জিও) না আসছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।”

তিনি বলেন, “স্বাভাবিক কাজকর্ম- ফাইল, কাগজপত্র-চলছে। তবে যেহেতু একটি আদেশের অপেক্ষা রয়েছে, সে কারণে সামগ্রিক গতিতে কিছুটা প্রভাব পড়ছে।”

এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, উপাচার্য ইতোমধ্যে উপাচার্য বাংলো থেকে ব্যবহৃত কিছু আসবাবপত্র সরিয়ে নিয়েছেন এবং পদত্যাগ-পরবর্তী প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন।

এ বিষয়ে অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান বলেন, “আমি যদি পদ আঁকড়ে থাকি, তাহলে তা চাকরি করা হবে, প্রকৃত দায়িত্ব পালন হবে না। রাজনৈতিক সরকারের অনেক চিন্তা থাকে। তাদেরকে তাদের মতো করে কাজ করতে দেওয়া উচিত।”

তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগে ফিরে গিয়ে কিছুদিন বিশ্রাম ও গবেষণায় মনোযোগ দিতে চান। ভবিষ্যতে জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষাক্ষেত্রে কাজ করার সুযোগ পেলে তা গ্রহণ করবেন বলেও উল্লেখ করেন।

তিনি আরও বলেন, “আমি এসেছিলাম ক্রান্তিকালে। তখন বিশ্ববিদ্যালয় পুরো অচল ছিল। এটি ছিল এক ধরনের উদ্ধারকারী মিশন। আমার নিয়োগপত্রেও সাময়িক নিয়োগের কথা ছিল। চেষ্টা করেছি বিশ্ববিদ্যালয়কে অচল অবস্থা থেকে একটি স্থিতিশীল পর্যায়ে আনতে।”

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা বলছে মন্ত্রণালয়:

শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, শিক্ষাঙ্গণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকার হঠাৎ কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না।

তিনি বলেন, “আমরা সুন্দর পরিকল্পনা করে লং টার্ম পরিবর্তন আনতে চাই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গ্লোবাল বেস্ট প্র্যাকটিস সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। এত বড় ও প্রসিদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগে যেন সর্বোত্তম প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়, সে বিষয়ে বিশেষ নজর রয়েছে।”

এদিকে সরকারিভাবে পদত্যাগ গ্রহণ ও নতুন উপাচার্য নিয়োগের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত আদেশ জারি না হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে অনিশ্চয়তা কাটেনি। সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত সিদ্ধান্ত না এলে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা আরও বাড়তে পারে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...