চলতি বছর এসএসসি, দাখিল ও সমমানের পরীক্ষায় অনুপস্থিতির সংখ্যা বেড়েই চলেছে। গত ১০ এপ্রিল থেকে এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত তিনটি পরীক্ষায় অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীর হার গতবারের চেয়েও কিছুটা বেশি। গতবার যেখানে তিনটি পরীক্ষায় ১১টি বোর্ডে গড়ে ১ দশমিক ১৪ শতাংশ পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল সেখানে এবার সেই হার ১ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
এবার অনুপস্থিতি বাড়ার সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ বোর্ডগুলোর পক্ষ থেকে এখনো চিহ্নিত করা হয়নি। তবে সাধারণ কিছু দিক বিবেচনা করে বোর্ড কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অন্যবারের চেয়ে এবারের পরীক্ষায় নকলমুক্ত রাখার চেষ্টাসহ বেশ কড়াকড়ি করা হচ্ছে। যে কারণে পরীক্ষায় অবৈধ সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা না দেখে অনেকেই অনুপস্থিত থাকছেন। এ ছাড়া পরীক্ষার যথাযথ প্রস্তুতি না থাকা, বিভিন্ন কাজে জড়িয়ে পড়া, মেয়েদের ক্ষেত্রে বিয়ে হয়ে যাওয়াসহ নানা কারণে বরাবরের মতো বহু পরীক্ষার্থীর নিবন্ধন করেও পরীক্ষায় অনুপস্থিতি দেখা যাচ্ছে।
সূত্রমতে, চলতি বছর ৯টি সাধারণ এবং মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের অধীনে এসএসসি, দাখিল এবং এসএসসি ভোকেশনাল পরীক্ষায় অংশ নিতে ১৯ লাখ ২৮ হাজার ১৮১ জন পরীক্ষার্থী রেজিস্ট্রেশন করে। এর মধ্যে ১০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত প্রথম দিনের পরীক্ষায় ১১ বোর্ড মিলিয়ে অনুপস্থিত ছিল ২৬ হাজার ৯২৮ পরীক্ষার্থী (১ দশমিক ৫৬ শতাংশ)। এদিন মাদরাসা বোর্ডে অনুপস্থিতির হার ছিল সবচেয়ে বেশি ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ। আর কারিগরি বোর্ডে অনুপস্থিতির হার ছিল ১ দশমিক ৯৬ শতাংশ।
১৫ এপ্রিল দ্বিতীয় পরীক্ষায় আরো বেড়ে ১১ বোর্ডে অনুপস্থিত ছিল ২৮ হাজার ৯৪৩ জন (১ দশমিক ৬৫ শতাংশ)। এর মধ্যে মাদরাসা বোর্ডে সবচেয়ে বেশি ৪ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ এবং কারিগরি বোর্ডে অনুপস্থিতি ছিল ২ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। ১৭ এপ্রিল তৃতীয় পরীক্ষায় অনুপস্থিতি ছিল ২৭ হাজার ৯০৫ জন (১ দশমিক ৭০ শতাংশ)। এদিন মাদরাসা বোর্ডে ৪ দশমিক ২৮ শতাংশ এবং কারিগরিতে ৪ দশমিক ৯৫ শতাংশ অনুপস্থিত ছিল। এবার তিনটি পরীক্ষা মিলিয়ে গড় অনুপস্থিতি ১ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
গত বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল ২০ লাখ ২৪ হাজার ১৯২ জন। সে সময় প্রথম দিনের পরীক্ষায় ১ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ, দ্বিতীয় দিনে ১ দশমিক ১৬ শতাংশ এবং তৃতীয় দিনে ১ দশমিক ১৮ শতাংশ পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল। তিনটি পরীক্ষা মিলিয়ে অনুপস্থিতির হার ছিল ১ দশমিক ১৪ শতাংশ। সব দিক বিবেচনায় এবার অনুপস্থিতির হার বেশ বেড়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. খন্দোকার এহসানুল কবির আমার দেশকে জানান, অনুপস্থিতির প্রকৃত কারণ বের করতে কিছুটা সময় লাগবে। তবে আমাদের ধারণা-নতুন সরকারের সময়ে নতুন পরিস্থিতিতে এবার পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এবার নকলমুক্ত পরিবেশে পরীক্ষা নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। আগের মতো পাসের হার বাড়ানোর কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। শিক্ষার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে চাই। গত তিনটি পরীক্ষায় তেমন কোনো খারাপ খবর পাওয়া যায়নি। দু-এক জায়গায় কিছু অনিয়ম হলেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনসহ সবাই সুষ্ঠু পরীক্ষা অনুষ্ঠানের জন্য সহযোগিতা করছে। এই পরিস্থিতিতে অবৈধ সুবিধা পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা না দেখে হয়তো অনেকে পরীক্ষা দিতে আসেনি।
তা ছাড়া গত বছর পাসের হার বেশি ছিল, গ্রেস নম্বর দিয়ে পাসের হার বেশি দেখানো হয়েছিল। সে কারণে এবার অনিয়মিত পরীক্ষার্থী কম। গতবারের চেয়ে এবার ৯৫ হাজার পরীক্ষার্থী কমেছে। মাদরাসা ও কারিগরি বোর্ডের পরীক্ষায় অনুপস্থিতির ক্ষেত্রে একই কারণ থাকতে পারে।
তবে পরীক্ষায় অনুপস্থিতি প্রসঙ্গে কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রুহুল আমিন বলেন, মাত্র কয়েকদিন হলো এখানে যোগদান করেছি। তাই প্রকৃত কারণ এখনো বুঝে উঠতে পারিনি। তবে যতটুকু জানতে পেরেছি, কারিগরিতে শিক্ষক স্বল্পতা আছে। শিক্ষার্থীরা ক্লাসে কম আসে। ক্লাসের প্রতি শিক্ষার্থীদের অনীহা আছে। পড়া শেষ করে বা দক্ষতা অর্জন করে তাদের কী লাভ হবে, সে বিষয়ে অনেকেরই অজ্ঞতা আছে। যে কারণে হয়তো পরীক্ষায় অনুপস্থিতি বেশি। এ বিষয়ে প্রচারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বোঝানোর চেষ্টা করা হবে। তা ছাড়া শিক্ষার্থীরা মনে হয় কিছু একটা (কাজ) করে, সেজন্য পরীক্ষায় তাদের অনুপস্থিতি বাড়ছে।
যশোর এলাকার একটি কারিগরি স্কুলের একজন সিনিয়র শিক্ষক জানান, এসএসসি পরীক্ষার আগেই অনেকে পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। বিশেষ করে মেয়েদের অনেকের বিয়ে হয়ে যায়। অনেকে পরীক্ষার তারিখও ভুলে যায়। তা ছাড়া অনেকের পরীক্ষার প্রস্তুতি ঠিকমতো না থাকায় ফরম ফিলাপ করেও পরীক্ষা দিতে চায় না। অনেকে আবার বিভিন্ন কাজ বা চাকরিতে ঢুকে যায়। কেউ কেউ বিদেশেও চলে যাওয়ায় পরীক্ষায় অনুপস্থিতি বাড়ছে।
ঝিনাইদহের একটি মাদরাসার সুপার জানান, পরীক্ষার আগে অনেক প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার্থী বেশি দেখানোর জন্য শিক্ষার্থীদের অনাগ্রহ সত্ত্বেও বুঝিয়ে এমনকি আর্থিকভাবে ছাড় দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করানো হয়। বাস্তবে প্রস্তুতি না থাকায় শেষ মুহূর্তে তারা পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকে। এবারের পরীক্ষায় নকল বা অবৈধ সুবিধা বন্ধের বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

