খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে (খুবি) সংস্কার ও শিক্ষার্থীদের অধিকার নিশ্চিতের লক্ষ্যে উত্থাপিত ৩৭ দফা দাবির অধিকাংশই দুই বছরেও বাস্তবায়িত হয়নি। প্রধান ফটকের নাম ‘শহিদ মীর মুগ্ধ তোরণ’ রাখা এবং পরীক্ষার খাতায় কোডিং পদ্ধতি চালুর মতো কয়েকটি দাবি পূরণ হলেও আবাসন, জমি অধিগ্রহণ, লাইব্রেরি, চিকিৎসাসেবা, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থান-সংশ্লিষ্ট অধিকাংশ দাবি এখনো অপূর্ণ রয়েছে।
২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চে ‘দাবি উত্থাপন মঞ্চ’ আয়োজন করে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ৩৭ দফা দাবি তুলে ধরেন। এসব দাবির মধ্যে ছিল শহিদ মীর মুগ্ধের নামে প্রধান ফটকের নামকরণ, সব শহিদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ, ক্যাম্পাস সম্প্রসারণে জমি অধিগ্রহণ, শতভাগ আবাসন নিশ্চিত করা, ২৪ ঘণ্টা লাইব্রেরি খোলা রাখা, চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়ন, কর্মসংস্থানে সহায়তা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
তোরণের নাম বদলালেও হয়নি স্মৃতিস্তম্ভ, জমি অধিগ্রহণ
দাবি উত্থাপনের দুই বছর পরও সব শহিদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি বাস্তবায়িত হয়নি। প্রধান ফটকের নাম ‘শহিদ মীর মুগ্ধ তোরণ’ করা হলেও ক্যাম্পাস সম্প্রসারণের জন্য প্রস্তাবিত জমি অধিগ্রহণ এবং বিক্রি হয়ে যাওয়া জমি পুনরায় অধিগ্রহণের দাবিতে কার্যকর অগ্রগতি দেখা যায়নি। এসব বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ ও আশ্বাসের কথা বলা হলেও জমি অধিগ্রহণের দাবি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
শিক্ষার্থীদের জন্য শতভাগ আবাসন নিশ্চিত করার দাবিরও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও সে অনুপাতে আবাসিক সুবিধা বাড়েনি। একইভাবে চারুকলা স্কুলের জন্য স্বতন্ত্র ভবন নির্মাণ এবং কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ সংস্কারের দাবিও পূরণ হয়নি।
২৪ ঘণ্টার লাইব্রেরি ও সংগঠন ফোরামও অধরা
কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার দাবিও বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমানে লাইব্রেরিটি নির্ধারিত সময় পর্যন্ত খোলা থাকে। এ ছাড়া আবাসিক হলগুলোর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে ‘সংগঠন ফোরাম’ গঠনের দাবিও পূরণ হয়নি।
রেজিস্ট্রেশন ফি ২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণের দাবিও বাস্তবায়িত হয়নি। এ নিয়ে পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে নামতে হয়েছে। অন্যদিকে পরীক্ষার খাতায় কোডিং পদ্ধতি চালু হয়েছে। তবে মূল্যায়ন পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের প্রস্তাব পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। তাদের প্রস্তাব ছিল অ্যাটেনডেন্সে ৫ এবং কন্টিনিউয়াস অ্যাসেসমেন্টে ৩৫ নম্বর নির্ধারণ করা। বর্তমানে এ দুই ক্ষেত্রে যথাক্রমে ১০ ও ৩০ নম্বর রয়েছে।
চিকিৎসা, অভিযোগ সেল ও ক্যারিয়ার সেন্টারেও অগ্রগতি নেই
বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারের সেবার মানোন্নয়নেও শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন দেখছেন না। পৃথক অভিযোগ সেল গঠন, কেন্দ্রীয় ক্যারিয়ার প্লেসমেন্ট সেন্টার প্রতিষ্ঠা, শিক্ষার্থীদের অর্জন তুলে ধরতে ‘অ্যাচিভমেন্ট কর্নার’ চালু এবং বিনাসুদে শিক্ষাঋণের ব্যবস্থা করার উদ্যোগও বাস্তবায়িত হয়নি।
ফলে শিক্ষার্থীদের চিকিৎসাসেবা, অভিযোগ জানানোর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা, ক্যারিয়ার উন্নয়ন এবং আর্থিক সহায়তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
দুই বছর পরও নেই সময়সীমাভিত্তিক বাস্তবায়ন পরিকল্পনা
সব মিলিয়ে দুই বছর পর ৩৭ দফা দাবির কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলেও শিক্ষার্থীদের আবাসন, অবকাঠামো, চিকিৎসা, গবেষণা ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত অধিকাংশ দাবি এখনো অপূর্ণ রয়েছে। কোন দাবি বাস্তবায়িত হয়েছে, কোনটি প্রক্রিয়াধীন এবং কোনটির ক্ষেত্রে কী ধরনের বাধা রয়েছে—তা স্পষ্ট করে প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি সময়সীমাভিত্তিক বাস্তবায়ন পরিকল্পনা প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবিগুলো প্রশাসন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। ইতোমধ্যে যেসব দাবি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করা হয়েছে। আর যেসব দাবি অবকাঠামো, অর্থায়ন বা নীতিগত সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্পৃক্ত, সেগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের কল্যাণ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রশাসন কাজ করছে।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

