‘কোটা গেছে যেই পথে, কমিটি যাবে সেই পথে’ স্লোগানে ঢাবিতে বিক্ষোভ

‘কোটা গেছে যেই পথে, কমিটি যাবে সেই পথে’ স্লোগানে ঢাবিতে বিক্ষোভ

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ পর্যায়ের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা এনটিআরসিএর পরিবর্তে ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডির হাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে তীব্র বৃষ্টির মধ্যেও বিক্ষোভ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নেতারা।

সোমবার (১০ আগস্ট) রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে আয়োজিত এ বিক্ষোভে ‘কোটা গেছে যেই পথে, কমিটি যাবে সেই পথে’, ‘বাণিজ্য নয় শিক্ষা, শিক্ষা শিক্ষা’, ‘টাকা নয় মেধা, মেধা মেধা’, ‘কমিটি নয় মেধা, মেধা মেধা’, ‘চাচা নয় চাকরি, চাকরি চাকরি’ এবং ‘মামা নয় চাকরি, চাকরি চাকরি’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন তারা।

বিজ্ঞাপন

বিক্ষোভ সমাবেশে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, এনটিআরসিএর পরিবর্তে ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত বাতিল করা না হলে জুলাই আন্দোলনের চেয়েও শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। তিনি বলেন, শিক্ষার্থী ও বেকার যুবকদের স্বার্থবিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া হবে না।

ডাকসুর ভিপি বলেন, ‘এই অন্যায় ও শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের বিরুদ্ধে পুরো ছাত্র সমাজকে আবার ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। বাংলাদেশের সব কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানাব, আপনারা প্রত্যেকটি জায়গায় অন্যায্য কমিটি-বাণিজ্যের বিরুদ্ধে এবং কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তুলুন।’

তিনি বলেন, এনটিআরসিএর মাধ্যমে যেভাবে আগে স্কুল-কলেজে শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করা হতো, সেই ব্যবস্থা আবার ফিরিয়ে আনতে হবে। ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা দ্রুত বাতিল করতে হবে।

সরকারের উদ্দেশে সাদিক কায়েম বলেন, ‘দ্রুত সময়ের মধ্যে এই অন্যায্য সিদ্ধান্ত বাতিল করুন। শিক্ষার্থী ও বেকার যুবকদের পেটে লাথি দিয়ে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত আমরা মেনে নেব না।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই সিদ্ধান্ত বাতিল না হলে বাংলাদেশের আপামর ছাত্র-জনতাকে সঙ্গে নিয়ে আমরা দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলব। জুলাই বিপ্লবে যেভাবে রাজপথে নেমেছিলাম, তার চেয়েও শক্তিশালীভাবে রাজপথে নেমে শিক্ষার্থীদের দাবি আদায় করব।’

ডাকসুর নেতারা অভিযোগ করে বলেন, এনটিআরসিএর মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবে শিক্ষক নিয়োগের পরিবর্তে স্থানীয় ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডির হাতে নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব, ঘুষ-বাণিজ্য ও স্বজনপ্রীতির সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগের পরিবর্তে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপের আশঙ্কা রয়েছে বলে দাবি করেন তারা।

বিক্ষোভকারীরা বলেন, ম্যানেজিং কমিটির হাতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈরাজ্য তৈরি করতে পারে। তাদের দাবি, প্রতিষ্ঠানভিত্তিক কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ হলে প্রার্থীদের মেধা ও যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থনৈতিক লেনদেন কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্ক প্রাধান্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। অতীতে বিভিন্ন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে অনিয়ম ও জাল সনদের অভিযোগ সামনে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া আবার স্থানীয় কমিটির হাতে তুলে দেওয়া হলে অনিয়মের সুযোগ আরও বাড়তে পারে।

ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য সর্বমিত্র চাকমা শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ম্যানেজিং কমিটির হাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকারের সমালোচনা করে বলেন, জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি বড় ধরনের বিজয় অর্জন করেছে। যারা নির্বাচনে জয়ী হতে পারেননি, তাদের অনেককেই বিভিন্ন দায়িত্বে বসানো হয়েছে। শুধু দলের শীর্ষ নেতাদের কপাল ফিরলে হবে না- এবার শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ম্যানেজিং কমিটির হাতে তুলে দিয়ে দলের তৃণমূল নেতাদেরও ‘ব্যবস্থা’ করা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। সর্বমিত্র চাকমা সরকারকে এমন গণবিরোধী সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানান।

মঙ্গলবার ছাত্র জমায়েত

শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির হাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে পরবর্তী কর্মসূচিও ঘোষণা করেছে ডাকসু। ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বিকেল ৩টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে ছাত্র জমায়েত অনুষ্ঠিত হবে। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং চাকরিপ্রত্যাশীদের অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ডাকসুর নেতারা।

ডাকসুর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শিক্ষক নিয়োগে মেধাভিত্তিক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করাই তাদের আন্দোলনের মূল লক্ষ্য। এনটিআরসিএর মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়োগের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক কমিটির হাতে নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হলে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির আশঙ্কা তৈরি হতে পারে বলে তারা মনে করছেন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত ঘিরে আন্দোলন

এর আগে গত ৩ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক সভায় ১৯তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা থেকে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ পর্যায়ের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডির হাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর থেকেই সিদ্ধান্তটি বাতিলের দাবিতে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রতিবাদ ও কর্মসূচি পালনের ঘোষণা আসছে।

এদিন ডাকসুর পাশাপাশি জাতীয় ছাত্রশক্তি ও শিক্ষার্থীদের একটি অংশও একই দাবিতে পৃথক কর্মসূচি ঘোষণা করে। সোমবার সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে বিক্ষোভ মিছিলের ঘোষণা দেয় ডাকসু। একই স্থানে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দেয় জাতীয় ছাত্রশক্তি। পরবর্তী সময়ে সংবাদ সম্মেলনেরও আয়োজন করা হয়েছে বলে জানানো হয়।

শিক্ষার্থীদের দাবি, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক ও আর্থিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। অন্যদিকে, ম্যানেজিং কমিটির হাতে নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হলে নিয়োগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন