ঢাবিতে পরীক্ষায় অসদুপায়: ছাত্রদল, ছাত্রলীগ ও হল সংসদ নেতাসহ ৬৮ শিক্ষার্থীকে শাস্তি

ঢাবিতে পরীক্ষায় অসদুপায়: ছাত্রদল, ছাত্রলীগ ও হল সংসদ নেতাসহ ৬৮ শিক্ষার্থীকে শাস্তি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের দায়ে ছাত্রদল, ছাত্রলীগ ও হল সংসদের নেতাসহ ৬৮ শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মোবাইল ফোন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে পরীক্ষায় নকলের অভিযোগে একই বিভাগের দুই শিক্ষার্থীকে ‘পরীক্ষা+২’ ও ‘পরীক্ষা+১’ মেয়াদে শাস্তি দেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

শাস্তিপ্রাপ্তরা হলেন—মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল ছাত্রদলের সদস্য ফাতহুন করিব চৌধুরী এবং হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল সংসদের নির্বাচিত কার্যনির্বাহী সদস্য মো. ফেরদাউস। এ ছাড়া ছাত্রলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং ডাকসু নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া আয়ান আবদুল্লাহও পরীক্ষায় অসদুপায়ের দায়ে ‘পরীক্ষা+১’ শাস্তি পেয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, শাস্তিপ্রাপ্তদের মধ্যে বিভিন্ন বিভাগ, ইনস্টিটিউট ও অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী রয়েছেন। গত ৭ সেপ্টেম্বরের সিন্ডিকেট সভায় অসদুপায় অবলম্বনসহ বিভিন্ন অপরাধের দায়ে ৬৪ শিক্ষার্থীকে ‘পরীক্ষা+১’, ‘পরীক্ষা+২’ ও ‘পরীক্ষা+৩’ মেয়াদে শাস্তি দেওয়া হয়। এর বাইরে এআই ব্যবহারের দায়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দুই শিক্ষার্থীর শাস্তির সিদ্ধান্তও একই সভায় চূড়ান্ত করা হয়।

এআই ব্যবহার করে নকল:

ফোন এবং এআই ব্যবহার করে পরীক্ষায় অসদুপায়ের ঘটনায় শাস্তি পাওয়া ফাতহুন করিব চৌধুরী ও মো. ফেরদাউস দুজনই গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের ১৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, করিব চৌধুরীকে ‘পরীক্ষা+২’ এবং ফেরদাউসকে ‘পরীক্ষা+১’ মেয়াদে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। তারমানে কারিব যে পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন করেছেন, সেটি বাতিলের পাশাপাশি পরবর্তী দুটি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন না। অন্যদিকে ফেরদাউসের সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা বাতিলের পাশাপাশি পরবর্তী একটি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে না।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, গত ১১ জুন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের একটি পরীক্ষা চলাকালে ফাতহুন করিব চৌধুরীকে দুই পায়ের মাঝখানে মোবাইল ফোন রেখে ব্যবহার করতে দেখা যায়। পরে তাঁর মোবাইল ফোন পরীক্ষা করে গুগলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সেবা জেমিনিতে করা সার্চের তথ্য পাওয়া যায়। জেমিনিতে ওই পরীক্ষার প্রথম প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছিল। পরীক্ষা শুরুর পর সকাল ১০টা ১৭ মিনিটে তাঁর উত্তরপত্র জব্দ করা হয়। সে সময় উত্তরপত্রে সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তরের কিছু অংশ লেখা ছিল। পরে জেমিনিতে ওই প্রশ্ন লিখে পাওয়া উত্তরের সঙ্গে করিবের উত্তরপত্রে লেখা দুই লাইনের হুবহু মিল পাওয়া যায়। এরপর উত্তরপত্র, মোবাইল ফোনসহ সংশ্লিষ্ট আলামত জব্দ করে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়।

বিষয়টি পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা পরিষদের সভায় উত্থাপন করা হয়। গত ২০ আগস্ট অনুষ্ঠিত সভায় আলোচনা শেষে করিবের বিরুদ্ধে শাস্তির সুপারিশ করা হয়। ওই সুপারিশের ভিত্তিতে ৩১ আগস্ট অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় তাঁর বিরুদ্ধে ‘পরীক্ষা+২’ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

করিবের এক সহপাঠী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পরীক্ষার হলে তিনি মোবাইল ফোনে এআই ব্যবহার করে উত্তর লিখছিলেন। একপর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক বিষয়টি ধরে ফেলেন।

অন্যদিকে, চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করে পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগে ‘পরীক্ষা+১’ শাস্তি পেয়েছেন হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল সংসদের নির্বাচিত কার্যনির্বাহী সদস্য মো. ফেরদাউস। তিনি তৎকালীন ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে শিবির-সমর্থিত প্যানেল থেকে কার্যনির্বাহী সদস্য পদে নির্বাচিত হন।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ১০৭ নম্বর কোর্সের রিটেক পরীক্ষা চলাকালে আনুমানিক বেলা ১১টার দিকে শৌচাগারে যাওয়ার কথা বলে পরীক্ষার হল থেকে বের হন ফেরদাউস। পরে বিভাগের করিডরে গিয়ে এক সিনিয়র শিক্ষার্থীর কাছ থেকে স্মার্টফোন নিয়ে চ্যাটজিপিটির মাধ্যমে পরীক্ষার প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ ওঠে।

এ সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকরা তাকে ধরে ফেলেন। পরে জব্দ করা ফোনের সার্চ হিস্ট্রি পরীক্ষা করে পরীক্ষায় আসা প্রশ্নগুলোই সেখানে অনুসন্ধান করা হয়েছিল বলে জানা যায়। এরপর অসদুপায়ের প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করে দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক তাঁর উত্তরপত্র রিপোর্ট করে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দপ্তরে পাঠান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী, বিষয়টি পরে শৃঙ্খলা পরিষদে পাঠানো হয়। ২০ আগস্ট অনুষ্ঠিত শৃঙ্খলা পরিষদের সুপারিশের ভিত্তিতে ৩১ আগস্ট উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় ফেরদাউসের শাস্তির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে ৭ সেপ্টেম্বর ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. হিমাদ্রি শেখর চক্রবর্তী স্বাক্ষরিত আদেশে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।

শাস্তির তালিকায় ছাত্রলীগ নেতাও:

পরীক্ষায় অসদুপায়ের দায়ে ‘পরীক্ষা+১’ শাস্তি পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছেন ছাত্রলীগ নেতা আয়ান আবদুল্লাহ। তিনি অর্গানাইজেশন স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড লিডারশিপ বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি ডাকসু সূর্য সেন হল ছাত্রলীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক ছিলেন বলে জানা গেছে। পাশাপাশি ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রলীগের পক্ষে মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক পদে প্রার্থী হয়েছিলেন।

তাকেও পরীক্ষায় অসদুপায়ের দায়ে ‘পরীক্ষা+১’ শাস্তি দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ যে পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, সেটি বাতিলের পাশাপাশি পরবর্তী একটি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন না।

আরও যারা শাস্তি পেয়েছেন

৭ সেপ্টেম্বরের বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট আদেশে বিভিন্ন বিভাগ, ইনস্টিটিউট ও অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। তালিকায় রয়েছেন কায়সুফুন নেছা, ফাহমিদ তাওসিফ ইসলাম, মো. জায়েদুল আলম আবির, মমি ভট্টাচার্য, মো. সাইফুজ্জামান, নিপু আক্তার, সুফিয়া খাতুন, বড়াই নিপু রাণী, আশরাফুল ইসলাম, ফারহানা আক্তার মিমি, সৈয়দ শাফকাত জামিল, মো. জুনায়েদ খান রায়ান, মো. আসিফ ইকবাল, আশরাফ হোসাইন, তানুশ্রী বিশ্বাস, সুমাইয়া ওয়াইশে, গোবিন্দ বণিক, আবু জুবায়ের, সাব্বির উদ্দিন রিয়ন, মো. হায়াত মাহমুদ, মো. মিরাজ হোসাইন, সাইফুর রহমান, উর্মি আক্তার, আতিক হাসান, অর্জ্য ব্যানার্জি, ফারিহা মেহজাবিন, মাহমুদুল হাসান, মালিহা তাবাসসুম, নুরুল আবসার সম্রাট, ফারহান আহমেদ, ইত্তাবা মুত্তাকী খান তকি, জারগার ফয়সাল আলতাফ, মো. কিরণ হোসেন, সাদিয়া আক্তার, মাহামুদ নুর মারুফ, মো. মাসুম বিল্লাহ, মো. সোহাগ মিয়া, রাকিবুল ইসলাম, মো. তামজিদ, মাহাদি হাসান ইসলাম, রাজ তালুকদার জয়, নাবিল আহমেদ রুদ্র, ফাতেমা পুষ্প, মো. সাব্বির হোসান, মোহাম্মদ হোসাইন ও সাইদা শামীমা তাবাসসুম।

এছাড়া মো. সোহেল রানা, সামিরা সুলতানা, হাসান মো. মেহেদী ও তাসনিম আজাদ তোহা, রফিকুল ইসলাম, কাজী মোহাইমিনুল ইসলাম, শেখ ফজিলাতুননেছা, মো. শাকিবুল ইসলাম, আল জুবায়ের ও মো. জাহিদুল ইসলাম, মুকিদুন্নেছা এবং সাজিব মল্লিক শাস্তিপ্রাপ্তদের তালিকায় রয়েছেন।

‘পরীক্ষা+১’, ‘পরীক্ষা+২’ ও ‘পরীক্ষা+৩’ কী:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাস্তির বিধান অনুযায়ী, ‘পরীক্ষা+১’ বলতে যে পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন করা হয়েছে, সেটি বাতিলের পাশাপাশি পরবর্তী আরও একটি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ না দেওয়ার অর্থ প্রকাশ করে। একইভাবে ‘পরীক্ষা+২’ ও ‘পরীক্ষা+৩’ বলতে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা বাতিলের পাশাপাশি পরবর্তী যথাক্রমে দুটি ও তিনটি পরীক্ষায় অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা বোঝানো হয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন