কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) নিষিদ্ধ সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কার্যক্রম ফের মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি সংগঠনটির কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আংশিক কমিটি ঘোষণার দুই সপ্তাহের মধ্যে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে পোস্টারিংয়ের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে।
জানা গেছে, গত ২৯ জুলাই কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের দুই সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়। কমিটিতে নৃবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. আমিনুর রহমান বিশ্বাসকে সভাপতি এবং একই শিক্ষাবর্ষের ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষার্থী পার্থ সরকারকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। তবে বর্তমানে তাদের কারও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রত্ব নেই বলে জানা গেছে।
এরই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার প্রথম প্রহরে, ফজরের সময় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে ছাত্রলীগের পোস্টার দেখা যায়। অভিযোগ রয়েছে, শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি আমিনুর রহমান বিশ্বাসের নেতৃত্বে ১৫ আগস্ট উপলক্ষে এসব পোস্টারিং করা হয়েছে।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। নিষিদ্ধ সংগঠনের কার্যক্রম প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল, ছাত্রশিবিরসহ কয়েকটি ছাত্রসংগঠন।
বৃহস্পতিবার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান শুভ ও সদস্যসচিব মো. আবুল বাশারের স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে ছাত্রলীগের পোস্টারিংসহ কথিত কর্মকাণ্ডের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়।
এ বিষয়ে শাখা ছাত্রদলের সদস্যসচিব মো. আবুল বাশার বলেন, ‘যদি-কিন্তু ছাড়াই স্পষ্ট করে বলতে চাই, নিষিদ্ধ ও পতিত আওয়ামী লীগের কোনো কার্যক্রম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় বা এর আশপাশে করতে দেওয়া হবে না। গত ১৭ বছরে সংঘটিত সব অনিয়ম, দমন-পীড়ন ও অপরাধের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ক্যাম্পাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তি যদি পতিত আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে আইন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিবিধান অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো অপশক্তিকে ক্যাম্পাসের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট করার সুযোগ দেওয়া হবে না।’
জাতীয় ছাত্রশক্তি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সংগঠক নাঈম ভূঁইয়া বলেন, ‘আজকে নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি সংগঠন ক্যাম্পাসের দেওয়ালে পোস্টার টানিয়েছে। নিষিদ্ধ সংগঠনের বিষয়ে কোনো ছাড় নয়। ক্যাম্পাসের আশপাশে যেকোনো সময় তাদের প্রতিহত করতে আমরা প্রস্তুত। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বলব, যত দ্রুত সম্ভব সিসিটিভি ফুটেজ চেক করে তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা করুন।’
কুবি শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মোজাম্মেল হোসেন আবির বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের রক্তাক্ত ইতিহাস ও শিক্ষার্থীদের ওপর তাদের সন্ত্রাসী কার্যক্রম আমরা ভুলিনি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অবিলম্বে চিহ্নিত ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে যেসব শিক্ষকের ইন্ধনে তারা মাথাচাড়া দিতে চায়, তাদের বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ নিতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগকে পাওয়া মাত্রই তাদের সন্ত্রাসী কার্যক্রমের হিসাব কড়ায়-গণ্ডায় নেওয়া হবে। শিক্ষার্থীদের প্রতি ফোঁটা রক্তের হিসাব নেওয়া হবে।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নতুন কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এর আগেও বিভিন্ন ঘটনায় আলোচনায় এসেছেন।
২০২৪ সালের ২৮ এপ্রিল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্যের কার্যালয়ে প্রবেশকে কেন্দ্র করে শিক্ষক সমিতি ও শাখা ছাত্রলীগের পদপ্রত্যাশী নেতাকর্মীদের মধ্যে মারামারি ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় শিক্ষকদের ওপর হামলার অভিযোগে তৎকালীন উপাচার্য, প্রক্টরসহ ২০ জনের বিরুদ্ধে থানায় দেওয়া লিখিত অভিযোগে আমিনুর রহমান বিশ্বাস ও পার্থ সরকারের নামও উল্লেখ করা হয়েছিল।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হামলার প্রতিবাদে ছাত্রীদের আন্দোলনে অংশগ্রহণ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করার অভিযোগ ওঠে আমিনুর রহমান বিশ্বাসের বিরুদ্ধে। এর প্রতিবাদে এবং তার বিচারের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেন।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর অন্তর্বর্তী সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯-এর ১৮(১) ধারায় সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। একই সঙ্গে সংগঠনটির সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়।
জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলনের সময় শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের ওপর হামলা ও সহিংসতায় সংগঠনটির সম্পৃক্ততার অভিযোগসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রেক্ষাপটে সরকার এ সিদ্ধান্ত নেয়।
পোস্টারিংয়ের বিষয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. আব্দুল হাকিম বলেন, ‘আমরা দেখেছি ক্যাম্পাসের বাইরে আওয়ামী লীগের কিছু পোস্টার লাগানো হয়েছে। আমরা দেখিনি কে বা কারা এটা লাগিয়েছে। এটা ক্যাম্পাসের বাইরে, তাই আমাদের অধীনে নেই। তবে কেউ যদি লিখিত দেয়, আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা নির্দেশ দিয়েছি, শুধু আওয়ামী লীগ নয়, ক্যাম্পাসের ভেতরে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক ব্যানার টানানো নিষেধ।’
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এই বক্তব্যের পরও ক্যাম্পাসের আশপাশে নিষিদ্ধ সংগঠনের পোস্টারিংয়ের ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে কারা এসব পোস্টার লাগিয়েছে তা শনাক্ত করা প্রয়োজন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

