বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টার

উপযুক্ত সেবা পাচ্ছেন না শিক্ষার্থীরা

ফাহমিদুর রহমান ফাহিম ও আব্দুস সালাম

উপযুক্ত সেবা পাচ্ছেন না শিক্ষার্থীরা

ক্যাম্পাসজুড়ে হাজারো শিক্ষার্থীর ভরসার জায়গা হওয়ার কথা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টার। অসুস্থতা, দুর্ঘটনা কিংবা হঠাৎ শারীরিক জটিলতায় দ্রুত চিকিৎসাসেবা পাওয়ার আশায় প্রতিদিন সেখানে ছুটে যান শিক্ষার্থীরা; কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। পর্যাপ্ত চিকিৎসক-সংকট, প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাব, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের অপ্রতুলতা এবং সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ—সব মিলিয়ে কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন অনেক শিক্ষার্থী। ফলে প্রশ্ন উঠছে, শিক্ষার্থীবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারগুলো কতটা প্রস্তুত? বিস্তারিত লিখেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ফাহমিদুর রহমান ফাহিম এবং রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আব্দুস সালাম

বিজ্ঞাপন
রাজশাহী-বিশ্ববিদ্যালয়-1

রাবি মেডিকেল সেন্টার

শিক্ষার্থীরা নাম দিয়েছেন নাপা সেন্টার

ক্লাসের চাপ, পরীক্ষার দুশ্চিন্তা কিংবা আবাসিক হলের অনিয়মিত জীবনযাত্রায় প্রতিদিনই কেউ না কেউ অসুস্থ হয়ে পড়েন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। তখন শিক্ষার্থীদের একমাত্র ভরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টার। কিন্তু সেই সেন্টারেই এখন চিকিৎসক-সংকট, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি পরিচালনার জনবল ঘাটতি এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে ধুঁকছে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা। ৩০ হাজারের বেশি নিয়মিত শিক্ষার্থীর বিপরীতে নেই পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। ফলে প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থীকে সীমিত জনবল নিয়েই সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্মরত চিকিৎসকদের।

সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন নারী শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০ হাজারেরও বেশি নারী শিক্ষার্থী থাকলেও মেডিকেল সেন্টারে নেই কোনো গাইনোকোলজিস্ট। জরুরি বিভাগেও পর্যাপ্ত চিকিৎসক নেই। ডিজিটাল এক্স-রে ও ইসিজি মেশিন থাকলেও দক্ষ টেকনোলজিস্ট ও বিশেষজ্ঞের অভাবে সেগুলোর পূর্ণ ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে না। চিকিৎসা নিতে এসে দীর্ঘ অপেক্ষা, ওষুধ সংগ্রহে ভোগান্তি আর কাঙ্ক্ষিত সেবা না পাওয়ার হতাশা দিন দিন বাড়ছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে।

গত বছরের ১৭ জুলাই ডেঙ্গুতে বাংলা বিভাগের এক শিক্ষার্থী মারা গেলে শিক্ষার্থীরা মেডিকেল সেন্টারের নাম দেন ‘নাপা সেন্টার’। এর প্রতিবাদে সে সময় তারা প্যারিস রোডে মানববন্ধন করেন এবং সেন্টারে ‘নাপা সেন্টার’ লেখা-সংবলিত একটি ব্যানার টানিয়ে দেন।

স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ১৯৫৮ সালে মেডিকেল সেন্টারটি চালু করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। প্রতিষ্ঠার প্রায় সাত দশকেও জনবল ঘাটতির কারণে যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারছে না মেডিকেল সেন্টারটি। সংশ্লিষ্টদের দাবি, রাবি প্রশাসনের অবহেলা এর অন্যতম কারণ।

শুরু থেকে এখন পর্যন্ত কখনোই পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ দেয়নি কর্তৃপক্ষ। জুলাই বিপ্লবের পর অ্যাডহকে পাঁচজন চিকিৎসককে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে তাদের মধ্যে একজন বিসিএসে সুযোগ পেয়ে চলে গেছেন। বর্তমানে তাদের পাঁচজন আছেন। এছাড়া অবসরে যাওয়া দুই চিকিৎসককে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে রাবি মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসকের পদ রয়েছে ৩৬টি। কিন্তু এই স্বল্প পদের বিপরীতেও চিকিৎসক আছেন মাত্র ১৪ জন। অবসরে যাওয়া দুই চিকিৎসককে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও অ্যাডহক নিয়োগ দেওয়ায় চিকিৎসকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২১ জনে। মোট ৩৬টি পদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ১৫টি পদই পড়ে রয়েছে ফাঁকা।

রাজশাহী-বিশ্ববিদ্যালয়-2

অন্যদিকে সেন্টারে দুজন পুরুষসহ মোট ছয়জন নার্স থাকার কথা থাকলেও যাত্রা শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত তা দুজনেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার ছয়জনের বিপরীতে রয়েছেন তিনজন। নাক-কান-গলা, মনোরোগ, অর্থোপেডিক ও গাইনোকোলজিস্ট কোনো চিকিৎসক নেই।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মেডিকেল সেন্টারটিতে নেই কোনো মাইক্রোবায়োলজিস্ট, পেশেন্ট বেড ও পর্যাপ্ত অক্সিজেন চ্যানেল। একটি ইসিজি মেশিন আছে, তবে সেটা পরিচালনা করার জন্য একজনও স্পেশালিস্ট নেই। সম্প্রতি ইমার্জেন্সি সেকশন থেকে একজন স্টাফকে এনে ইসিজি মেশিনটি সচল রাখা হলেও বন্ধ রয়েছে সেবা। ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন থাকলেও সেটা পরিচালনার জন্য পূর্ণকালীন টেকনোলজিস্ট নেই।

এছাড়া মেডিকেল সেন্টারটিতে পর্যাপ্ত অবকাঠামো থাকলেও কোনো প্যাথলজি ডাক্তার নেই। শিক্ষার্থীরা যখন সেবা নিতে আসছেন, তখন প্যাথলজি ডাক্তার না থাকায় শুধু প্রাথমিক চিকিৎসাতেই সীমাবদ্ধ রাখছেন কর্তব্যরত চিকিৎসকরা।

প্রায় ৩০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর সেবাদানের জন্য অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যা মোট চারটি। এর মধ্যে একটি ব্যবহার করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের জন্য। তবে বিপুলসংখ্যক এই শিক্ষার্থীর জন্য মাত্র চারটি অ্যাম্বুলেন্স পর্যাপ্ত নয় বলে জানায় মেডিকেল সেন্টার সংশ্লিষ্টরা।

ওষুধ পাওয়ার ক্ষেত্রেও অভিযোগ রয়েছে সেবা নিতে যাওয়া শিক্ষার্থীদের। শিক্ষার্থীদের দাবি, সাধারণ কিছু ওষুধ সবাইকেই দেওয়া হয়। অধিকাংশ সময়ই যথাযথ ওষুধ পান না তারা। এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, খেলতে গিয়ে আঘাত পাওয়াসহ বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে গেলে তারা নামমাত্র চিকিৎসা দিয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজে রেফার করে দেয়। এদিকে প্রতিবছর একেকজন শিক্ষার্থীকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ফি বাবদ গুনতে হয় ১০০ টাকা। শিক্ষার্থীদের দেওয়া মোট এই অর্থের সংখ্যাটা নেহাত কম নয়।

অভিযোগ জানিয়ে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ ফেরদৌস বলেন, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া সত্ত্বেও আমাদের ক্যাম্পাসের একমাত্র চিকিৎসাকেন্দ্রটির অবস্থা বর্তমানে অত্যন্ত জরাজীর্ণ ও শোচনীয়। প্রতিদিন হাজার হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে এখানে আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম, পর্যাপ্ত জরুরি ওষুধ এবং প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তীব্র সংকট রয়েছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য সামান্য অসুস্থতাতেও শিক্ষার্থীদের বাধ্য হয়ে ক্যাম্পাসের বাইরে ছুটতে হয়, যা আর্থিক ও মানসিকভাবে চরম ভোগান্তি সৃষ্টি করে।

তিনি আরো বলেন, এমনকি গভীর রাতে কোনো শিক্ষার্থী গুরুতর অসুস্থ হলে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া বা জরুরি প্রাথমিক সেবা পাওয়ার ন্যূনতম সুব্যবস্থাও এখানে নেই। দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এই বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থীদের মৌলিক স্বাস্থ্যঝুঁকি দূর করতে মেডিকেল সেন্টারটির আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি। তাই শিক্ষার্থীদের সুচিকিৎসা নিশ্চিতকল্পে অবিলম্বে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ, ২৪ ঘণ্টা জরুরি সেবা চালু এবং মেডিকেল সেন্টার ৫০ শয্যায় রূপান্তর করে আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ডাক্তার বৃদ্ধির জন্য প্রশাসনের কাছে বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।

ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী রাইহান আহম্মেদ বলেন, রাবি মেডিকেল, যাকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ‘নাপা সেন্টার’ বলে ডাকে—এর কারণ ছিল কিছু হলেই শুধু নাপা দেওয়া হতো। তবে আমরা যদি লক্ষ করি, রাকসু হওয়ার পর এর ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। এখন আর আগের মতো শুধু নাপা নয়, বিভিন্ন ধরনের ওষুধ পাওয়া যায়। তবে রাবি মেডিকেলের এখনো আরো অনেক উন্নতি করতে হবে। এখানে ভালো মানের ডাক্তার রাখতে হবে, আমরা অসুস্থ হলে প্রাথমিক একটা চিকিৎসা যাতে এখান থেকে পাই, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। পরিশেষে বলতে চাই, অন্তত ৫০ শয্যাবিশিষ্ট একটি কক্ষ প্রস্তুত করা উচিত, যেখানে দুজন ডাক্তার থাকবেন সর্বাবস্থায়, যাতে আমরা কেউ অসুস্থ হলে আর রাজশাহী মেডিকেলে যেতে না হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, শূন্য ১৮টি পদের বিপরীতে ২০২০ সালের ২৪ অক্টোবর চিকিৎসক পদে ১৩ জনের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। তবে তাদের মৌখিক পরীক্ষা না হওয়ায় নিয়োগ কার্যক্রম আটকে আছে। এদিকে বিগত সরকারের পতন হলে কর্তব্যরত আরো চারজন ডাক্তার পদত্যাগ করেন। এতে বর্তমানে শূন্য পদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২২ জনে। সবশেষ একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞসহ অ্যাডহক নিয়োগ দেওয়ায় বর্তমানে শূন্য পদসংখ্যা ১৫টি।

সার্বিক বিষয়ে রাবি মেডিকেল সেন্টারের চিফ মেডিকেল অফিসার মাফরুহা সিদ্দিকা লিপি বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আমাদের মেডিকেল সেন্টারে জনবলসংকট অনেক বড় একটি বাধা ছিল। বহু দিন পর কয়েকজনকে পেয়েছিলাম, তার মধ্যে থেকে দুজন চলে গেলেন। শিক্ষার্থীরা খালি অভিযোগ করে যে তারা সেবা পায় না। মেডিকেলে লোকই নেই, তারা সেবাটা পাবে কীভাবে? দিনে তিনটা, অর্থাৎ মাসে ৯০টা শিফট এই জনবল দিয়ে সম্ভব হয় না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে গেলে বারবার তারা শুধু আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ রেখেছেন।

রাজশাহী-বিশ্ববিদ্যালয়-3

তিনি আরো বলেন, এই প্রশাসন আসার পর আমি বারবার তাদের কাছে গিয়েছি, আমাদের সমস্যার কথা বলেছি। তারা যে খুব বেশি কিছু করছেন, সেটা বলার সুযোগ নেই। একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দিয়েছে প্রশাসন। অবসরে যাওয়া আমার দুই সহকর্মী চুক্তিতে আবারও জয়েন করেছেন। তবে এটি যথাযথ সেবা নিশ্চিত করতে যথেষ্ট নয়। এখনো আমাদের একজন ডাক্তারকে প্রতিদিন শতাধিক রোগী দেখতে হয়। ইমার্জেন্সি রুমে ২৪ ঘণ্টা যদি সিস্টার ও ব্রাদার রাখা যায়, তাহলে ডাক্তারের প্রেশারটা অনেকটা কমে আসবে। কিন্তু এই চাহিদাটা কিছুতেই পূরণ হচ্ছে না। আমি প্রশাসনকে বলব, তারা যেন দ্রুত এই বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মাঈন উদ্দিন বলেন, আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর মেডিকেলের অবস্থা খুবই ক্রিটিক্যাল ছিল; অনেকে আর্লি রিটায়ারমেন্ট করেছেন, কারো নরমাল রিটায়ারমেন্ট হয়েছে, কেউ পালিয়ে গেছে। এমন অবস্থায় আমরা প্রথমে একজন এবং পরে পাঁচজনকে অ্যাডহক নিয়োগ দিয়েছিলাম। এছাড়া আমরা ওষুধের জন্য কমিটি করে সেটার বাজেট বাড়িয়েছি। কিছু যন্ত্রপাতি কিনে দেওয়া হয়েছে। কিছু ডেকোরেশনও করা হয়েছে। তখন আমরা বিজ্ঞাপন দিয়ে নিয়োগ দিতে পারিনি।

পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল তৈরির বিষয়ে তিনি বলেন, এটা আসলে লং টার্ম প্ল্যান; এখন শর্ট টার্ম প্ল্যানে যেটুকু সুবিধা দিলে অর্থাৎ জনবলসংকটের বিশাল একটা ঘাটতি আছে, সেটা পূরণ করতে পারলে আমার মনে হয়, যে উদ্দেশ্যে মেডিকেল করা হয়েছে, তা পূরণ করা সম্ভব হবে। বর্তমান উপাচার্য বলেছেন, সবার আগে যেন মেডিকেলে নিয়োগ দেওয়া হয়। এটা যেহেতু জরুরি সেবা, তাই মেডিকেলে নিয়োগ নিয়ে সবার আগে কাজ করবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

বেগম-রোকেয়া-বিশ্ববিদ্যালয়-1

রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়

রাতে অসুস্থ হলে প্রাথমিক চিকিৎসাও পাওয়া যায় না

প্রতিষ্ঠার ১৭ বছরেও সেকেন্ডারি লেভেলে উন্নীত হয়নি রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি) মেডিকেল সেন্টার। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২টি বিভাগে প্রায় আট হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। এর মধ্যে নারী শিক্ষার্থী প্রায় চার হাজার। তবে এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে কর্মরত চিকিৎসক মাত্র চারজন। এছাড়া নারী শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো গাইনি বিশেষজ্ঞ নেই। ফলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে শিক্ষার্থীদের বাড়তি খরচ করে যেতে হচ্ছে বাইরের ক্লিনিকে বা হাসপাতালে। সেকেন্ডারি লেভেলে সাধারণ চিকিৎসার বাইরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দ্বারা সেবা প্রদান, প্রয়োজনীয় ল্যাবরেটরি পরীক্ষা (রক্ত, এক্স-রে, ইউরিন ইত্যাদি) এবং স্বল্পমেয়াদি ভর্তির সুবিধা প্রদান করা হয়।

এছাড়া ২৪ ঘণ্টা জরুরি চিকিৎসাসেবা, পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ এবং প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী নিশ্চিত করা সেকেন্ডারি লেভেলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এতে করে শিক্ষার্থীরা সামান্য থেকে মাঝারি রোগের চিকিৎসা ক্যাম্পাসেই পেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ১৭ বছর পার হলেও মেডিকেল সেন্টার এখনো ২৪ ঘণ্টা চালু করা হয়নি। নেই কোনো আবাসিক চিকিৎসকের ব্যবস্থাও। সেবার মান প্রাথমিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ।

সরেজমিনে জানা যায়, মেডিকেল সেন্টারের চিকিৎসা ব্যবস্থা এখনো প্রাথমিক স্তরেই আটকে আছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনিক ভবনের নিচতলায় তিন-চারটি কক্ষ নিয়ে মেডিকেল সেন্টারটি সেবা দিচ্ছে। নেই পর্যাপ্ত জায়গা। মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র চারজন এবং নার্স মাত্র একজন। বিপরীতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারী মিলিয়ে প্রায় ৯ হাজার মানুষ এই সেবার ওপর নির্ভরশীল।

মেডিকেল সেন্টার সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৫০ জন শিক্ষার্থী এখানে সেবা নেন। আর এই সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। মেডিকেল সেন্টার থেকে প্রায় ৫০ ধরনের ওষুধ সরবরাহ করা হলেও সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতি হাজারে একজন চিকিৎসক এবং প্রতি চিকিৎসকের বিপরীতে তিনজন নার্স থাকা প্রয়োজন। সেখানে বেরোবিতে একজন চিকিৎসককে গড়ে প্রায় ২ হাজার ২৫০ জনকে সেবা দিতে হচ্ছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।

একাধিক শিক্ষার্থী জানান, আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে রোগ নির্ণয়ের জন্য বাইরের ক্লিনিকে যেতে হয়। এতে বাড়তি ব্যয় বহন করতে গিয়ে আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীরা চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শুক্রবার ও শনিবার মেডিকেল সেন্টার বন্ধ থাকে। এছাড়া বর্তমানে জ্বালানি সংকটে অফিস টাইম ৪টা পর্যন্ত হওয়ায় মেডিকেল সেন্টার সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত সীমিত সময় সেবা দেয়, যা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য পর্যাপ্ত নয়। জরুরি অবস্থায় শয্যা সুবিধা না থাকায় রোগীদের প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরের রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিতে হয়।

শিক্ষার্থীদের দাবি, মেডিকেল সেন্টার সপ্তাহে সাত দিন এবং ২৪ ঘণ্টা চালু রাখতে হবে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত চিকিৎসক নিয়োগ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সংযোজন এবং আধুনিক চিকিৎসা যন্ত্রপাতি স্থাপন করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী রিফাত রাফি বলেন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে মানসম্মত চিকিৎসাসেবার অভাব রয়েছে। পর্যাপ্ত চিকিৎসক, জরুরি সেবা, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও আধুনিক যন্ত্রপাতির ঘাটতির কারণে শিক্ষার্থীরা ঠিকভাবে চিকিৎসা পাচ্ছে না। এমনকি সামান্য আঘাতের ক্ষেত্রেও প্রাথমিক সেলাইয়ের ব্যবস্থা নেই, ফলে বাইরে যেতে বাধ্য হতে হয়।

তিনি আরো বলেন, দ্রুত অবকাঠামো উন্নয়ন, জনবল নিয়োগ, জরুরি সরঞ্জাম নিশ্চিতকরণ ও ২৪ ঘণ্টা সেবা চালু করা জরুরি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী তাসনিম জান্নাত তানিম বলেন, মানুষের অসুস্থতা কখনো সময় বা স্থান-কাল ভেদে আসে না। কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টার বিকাল ৫টার মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সন্ধ্যা বা রাতে কোনো শিক্ষার্থী অসুস্থ হলে প্রাথমিক চিকিৎসাটুকুও পাওয়া সম্ভব হয় না।

তিনি বলেন, মেডিকেল সেন্টারে পর্যাপ্ত অভিজ্ঞ ও মানসম্মত চিকিৎসকও নেই। এ কারণে অনেক সময় আমাদের বাইরে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হয়।

গত বছরের ৬ আগস্ট থেকে প্রতি বুধবার বিকাল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত খণ্ডকালীন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ সেবা চালু করা হয়েছিল। এ সেবা দিতেন প্রাইম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মনোরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং বিভাগীয় প্রধান ডা. খন্দকার আনজুমানারা বেগম শীলা। পরে মেডিসিন বিশেষজ্ঞও যুক্ত করা হয়। তবে রমজানের ঈদের ছুটির পর থেকে এসব বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সেবা বন্ধ রয়েছে।

বেগম-রোকেয়া-বিশ্ববিদ্যালয়-2

এ ব্যাপারে ডেপুটি চিফ মেডিকেল অফিসার ও অফিস প্রধান (ডেন্টাল সার্জন) ডা. এএমএম শাহরিয়ার বলেন, আমাদের মেডিকেল সেন্টারের চিকিৎসাসেবা বর্তমানে প্রাথমিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। সে অনুযায়ী বিদ্যমান সেবায় শিক্ষার্থীরা সন্তুষ্ট থাকলেও প্রতিষ্ঠার ১৭ বছর পার হওয়ায় এখন সেকেন্ডারি স্তরের চিকিৎসাসেবা চালু করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, প্রায় ৯ হাজার সেবাগ্রহীতার বিপরীতে মাত্র চারজন চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করছেন, যা মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা। এছাড়া বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতো সেকেন্ডারি স্তরের চিকিৎসাসেবা চালু করতে হলে পৃথক ভবন নির্মাণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রয়োজন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. শওকাত আলী বলেন, আমরা অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিয়ে কাজ করছি। নতুন করে রিসার্চ ইনস্টিটিউট ও ছাত্রী হলে কাজ শুরু করছি। আশা করি মেডিকেল সেন্টারের কাজও শুরু করতে পারব। এতে মেডিকেল সেন্টারেরও সংকট কাটিয়ে উঠতে পারব।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন