মেসি আমাদের ফুটবল আনন্দ

মেসি আমাদের ফুটবল আনন্দ

২০০৬ সালে প্রথম যখন লিওনেল মেসিকে দেখেছিলাম, তখন এক মুহূর্তের জন্যও ভাবিনি এই হালকা-পাতলা শরীরের, এলোমেলো ঝাঁকড়া চুলের বিস্ময়ভরা চোখের কিশোরপনায় ভরা তরুণটি পরের দুই দশকে কোটি কোটি মানুষের ফুটবল দেখার সংজ্ঞাটাই বদলে দেবে এবং একদিন তার বিদায়ের ঘোষণায় নিজের জীবনের কতগুলো বছরকে হঠাৎ করে একসঙ্গে মনে পড়ে যাবে।

জার্মানি বিশ্বকাপের সেই মেসি আজও আমার চোখে পরিষ্কার।

বিজ্ঞাপন

কতই-বা বয়স তখন তার। ১৮ মাত্র। আর্জেন্টিনা দলে এসেছেন ভবিষ্যতের তারকা হিসেবে। তাকে নিয়ে তেমন বাড়তি কোনো হইচই নেই। আমরা তখন তাকে ‘মেসি’ বলে চিনতে শুরু করেছি; কিন্তু জানতাম না সামনে কী অপেক্ষা করছে। তার দৌড়ে একটা অদ্ভুত ব্যাপার ছিল। বলটা যেন পায়ে আটকে থাকত, আর শরীরের চেয়ে কয়েকগুণ দ্রুত ছুটত তার চিন্তা। ডিফেন্ডাররা বুঝে ওঠার আগেই মাঠের ফাঁক খুঁজে ফেলার ওস্তাদি ছিল তার!

সাংবাদিক হিসেবে জার্মানির সেই বিশ্বকাপ তখন আমার জীবনেরও ব্যস্ত সময়। মাঠের প্রেস বক্সে বসে শুধু খেলা দেখাই নয়, রয়েছে প্রতিটি ম্যাচের মধ্যে গল্প খুঁজে নেওয়া, পরদিনের কাগজের জন্য লেখার বিষয় খোঁজা, রাত জেগে রিপোর্ট লেখা এবং সকালে ছাপা হওয়া সেই কাগজ হাতে নিয়ে আগের রাতের উত্তেজনাকে আবার নতুন করে অনুভব করাÑএসবই ছিল সাংবাদিক হিসেবে আমাদের প্রতিদিনের জীবন। সেই ব্যস্ততার মধ্যেও মেসি আলাদা করে নজর কেড়েছিলেন বিশ্বকাপে তার খেলা প্রথম ম্যাচেই। সত্যি বলছি, সেদিনের সেই তরুণ ছটফটে ফুটবলার আমার এবং আমাদের ফুটবল-স্মৃতির সবচেয়ে বড় অংশ হয়ে যাবেনÑএত দূরের চিন্তা আমি অন্তত করিনি।

জার্মানির গ্যেলজেনকিরশেনের ভেলটিন্স অ্যারেনায় ১৬ জুন সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে ম্যাচে অভিষেক হয় মাত্র ১৮ বছর বয়সি মেসির।

ম্যাচে আর্জেন্টিনা তখন ৩-০ এগিয়ে। ম্যাচের ৭৪ মিনিটে কোচ হোসে পেকেরম্যান তাকে মাঠে নামান। ঝাঁকড়া চুলের এক কিশোর, গায়ে আর্জেন্টিনার ১৯ নম্বর জার্সি। মাত্র কয়েক মিনিটেই বোঝা গেল এই ছেলেটির মধ্যে অন্যরকম কিছু আছে। ৭৮ মিনিটে মেসির বাড়ানো বল থেকেই হার্নান ক্রেসপো গোল করেন। বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচেই অ্যাসিস্ট! আর ৮৮ মিনিটে ক্রেসপোর সঙ্গে ওয়ান-টু করে বল পেয়ে মেসির শটে বল জালে জড়ায়। আর্জেন্টিনার ৬-০ জয়ের শেষ গোলটি হয়ে যায় তার প্রথম বিশ্বকাপ গোল।

জার্মানি বিশ্বকাপে মেসি মোট তিন ম্যাচে মাঠে নামেন। সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে গোল ও অ্যাসিস্টের পর নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে তিনি ছিলেন শুরুর একাদশে। মেক্সিকোর বিপক্ষে নকআউট ম্যাচেও বদলি হিসেবে খেলেন। তিন ম্যাচে রয়েছে একটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট।

সে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা। ডাগআউটে বসে জার্মানির বিরুদ্ধে টাইব্রেকারে দলের হার দেখেন বিষণ্ণ মেসি।

প্রায় আলোচনার বাইরে থাকা মেসি চার বছর পর ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে হওয়া বিশ্বকাপে দলের অধিনায়ক হলেন। মেসি ক্যাপ্টেন, ম্যারাডোনা কোচ। ড্রিম জুটি! কিন্তু সে স্বপ্নও শেষ হলো ব্যর্থতায়। কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নিল আর্জেন্টিনা। এবারও প্রতিপক্ষ সেই জার্মানি। হারের ব্যবধান জার্মানি ৪, আর্জেন্টিনা ০। পুরো বিশ্বকাপে কোন গোল পাননি মেসি। চরম ব্যর্থতায় অধিনায়কত্বের ক্যারিয়ার শুরু।

তবে বিশ্বকাপে ব্যর্থ হলেও মেসি তখন ক্লাব ফুটবলের কিং। মাঠের প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই বার্সেলোনার বস। শুরুর দুই বিশ্বকাপের ব্যর্থতা কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলে ২০১৮-তে ব্রাজিল বিশ্বকাপে চোয়ালবদ্ধ জেদ নিয়ে নামেন মেসি। প্রায় একক প্রতিভায় পুরো দলকে ফাইনালে তুলে আনলেন।

২০১৪-এ তিনি ছিলেন অন্যরকম এক মেসি। তখন তিনি শুধু বিশ্বের সেরা একজন নন, আর্জেন্টিনার স্বপ্নের সবচেয়ে বড় ঠিকানার নামও। একের পর এক ম্যাচের বাধা টপকে আর্জেন্টিনা যখন ফাইনালে পৌঁছাল, তখন মনে হচ্ছিল এবার হয়তো সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটবে।

কিন্তু ফুটবল সব সময় গল্পের শেষটা আমাদের ইচ্ছেমতো লেখে না।

মারিও গোটজের গোলে জার্মানির কাছে ফাইনালে হেরে গেল আর্জেন্টিনা। মেসি মাঠে দাঁড়িয়ে রইলেন, চোখে হতাশা। হাতে সেরা খেলোয়াড়ের ট্রফি, গোল্ডেন বল। কিন্তু মুখে হাসি নেই। বিশ্বকাপ যে জেতা হলো না তার! এতবার ব্যালন ডি’অর জেতা হলো। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিও হাতে উঠল। লা-লিগার ট্রফিতে আলমারি ভরে উঠেছে; কিন্তু বিশ্বকাপ যে ছোঁয়া হলো না!

সেই বিশ্বকাপ আরেকবার মেসির অপূর্ণতার গল্প লিখল।

সেই অপূর্ণতা নিয়েই শেষ হলো ২০১৮ বিশ্বকাপ।

২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনার জন্য ছিল টানাপোড়েনের এক অধ্যায়। আইসল্যান্ডের সঙ্গে ১-১ ড্র দিয়ে শুরু। পরের ম্যাচে ক্রোয়েশিয়ার কাছে ০-৩ হারে দলের শেষ ষোলোয় ওঠাই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ২-১ জয় দিয়ে ঘুরে দাঁড়ায় আর্জেন্টিনা। মেসি করেন টুর্নামেন্টে নিজের প্রথম গোল। তার পাস থেকেই মার্কোস রোহোর জয়সূচক গোলের আক্রমণও তৈরি হয়। চার পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ রানার্সআপ হয়ে শেষ ষোলোয় ওঠে আর্জেন্টিনা।

শেষ ষোলোয় প্রতিপক্ষ ছিল ফ্রান্স। ম্যাচে দুবার পিছিয়ে পড়েও আর্জেন্টিনা তিন গোল করে। গ্যাব্রিয়েল মেকার্দো ও সার্জিও আগুয়েরোর গোলে ছিল মেসির অবদান। শেষ পর্যন্ত কিলিয়ান এমবাপ্পের দুরন্ত পারফরম্যান্সে ৪-৩-এ হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা।

চার ম্যাচে এক গোল ও দুটি অ্যাসিস্ট নিয়ে মেসি শেষ করেন রাশিয়া বিশ্বকাপ। এরপর মেসির জীবনে এলো আরো কিছু কঠিন বছর।

কোপা আমেরিকার দুই ফাইনালে হার, চারধারের সমালোচনা, নিজের দেশের মানুষের হতাশা, জাতীয় দল থেকে কিছুটা অভিমানেই আকস্মিক অবসরের ঘোষণা, আবার ফিরে আসা—সব মিলিয়ে মেসির গল্পটা তখন আর কেবল সাফল্যের গল্প ছিল না; বরং সেটি হয়ে উঠেছিল একজন মানুষের বারবার ভেঙে পড়ে আবার উঠে দাঁড়ানোর গল্প।

এখানেই মেসি বাকিদের চেয়ে আলাদা। হেরেছেন। হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন। ব্যর্থতার বলয় চেপে ধরেছে। সমালোচনার তীরে বিদ্ধ। কিন্তু হার মানেননি। উঠে দাঁড়িয়েছেন। চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞায় ফের সাজিয়েছেন স্বপ্ন।

জীবনে সবাই কোনো না কোনো সময় হারে। কখনো পেশায়। কখনো সম্পর্কে। কখনো স্বপ্নে। কখনো ভাগ্যের পরিহাসে নিজের কাছেই। পার্থক্য শুধু এই যে, সবাই আবার উঠে দাঁড়াতে পারে না।

মেসি পেরেছিলেন। তিনি ফিরে এসেছিলেন। আর সে প্রত্যাবর্তনই শেষ পর্যন্ত তাকে নিয়ে গেল জীবনের সবচেয়ে বড় মঞ্চে।

২০২২। কাতার বিশ্বকাপ। বিশ্ব দেখল নতুন এক মেসিকে। ২০০৬-এর তরুণ মেসি নেই। ২০১৪-এর স্বপ্নভরা অধিনায়কও নেই। এবার তিনি অভিজ্ঞ, পরিণত, বহু ক্ষত পেরিয়ে আসা একজন নেতা। তার চোখে তখন এক ধরনের শান্ত জেদের জোস। যেন তিনি জানেন—আর খুব বেশি সুযোগ সামনে নেই। এখনই সময়। আসল সময়।

সৌদি আরবের কাছে প্রথম ম্যাচে হারার পর আবারও প্রশ্ন উঠল। আবারও সংশয়। আবারও মেসির দিকে সবার সংশয়—তিনি পারবেন তো?

তারপর মেক্সিকোর বিপক্ষে সেই গোল। এরপর পোল্যান্ড। তারপর অস্ট্রেলিয়া। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে সেই উত্তেজনায় ভরা কোয়ার্টার ফাইনাল। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে সেমিফাইনাল।

তারপর ফাইনাল।

আর্জেন্টিনা বনাম ফ্রান্স।

সেদিন টেলিভিশনের পর্দার সামনে বসে দেখা সে ফাইনালের প্রতিটি মুহূর্ত আজও মনে আছে।

আর্জেন্টিনা এগিয়ে গেল ২-০ গোলে। মনে হলো গল্প শেষের দিকে। ঠিক তখনই গল্পে ক্লাইমেক্স জমিয়ে এমবাপ্পে লিখলেন ফ্রান্স ফিরে আসার অধ্যায়। আবার আর্জেন্টিনা এগিয়ে গেল। আবার ফ্রান্স ম্যাচে সমতা ফেরাল। এমবাপ্পে হ্যাটট্রিক করলেন।

শেষ পর্যন্ত ফাইনাল গড়াল পেনাল্টি শুটআউটে।

মন্টিয়েলের শেষ শটটি জালে জড়িয়ে যাওয়ার পর যে অনুভূতি তৈরি হয়েছিল, সেটিকে শব্দে পুরোপুরি প্রকাশ করা কঠিন। মনে হয়েছিল, ২০০৬ থেকে যে গল্পটি আমি দেখছি, ২০১৪-তে যে গল্প অসম্পূর্ণ থেকে গিয়েছিল, ২০১৮-তে যে মানুষটি কেঁদে জাতীয় দল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন—সে মানুষটির জন্য অবশেষে ফুটবল নিজের দরজাটা খুলে দিল।

মেসি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। মেসি পারলেন। গোল করলেন। জিতলেন। অবশেষে বিশ্বকাপ মেসির মুঠোয়! হাতে সোনালি ট্রফি। চোখে জল। মেসি কাঁদছেন। ডি মারিয়া কাঁদছেন। এই কান্না কিন্তু সাফল্যের, সুখের। বিজয় আর আনন্দের। বিশ্বজয়ের উল্লাসের। দুই হাতে ট্রফি ধরে মেসি আকাশের দিকে তুলে ধরে উল্লাসে ফেটে পড়ছেন—এমন একটা ছবিই তো বিশ্বফুটবলের পাওনা ছিল। রাশিয়া বিশ্বকাপ সেই অপূর্ণতা ঘুচিয়ে দিল। মেসির হাতে উঠে বিশ্বকাপও যেন পূর্ণতা পেল!

নিজের পঞ্চম বিশ্বকাপে এসে বিশ্বকাপ ট্রফি ছোঁয়ার স্বপ্ন পূরণ হলো মেসির। এর আগে দলকে বিশ্বকাপ ফাইনালে তুলে আনলেও শেষ ধাপটা পার হতে পারেননি। হারের কান্নায় শেষ হয় বিশ্বকাপ। সেদিন কাঁদলেও থেমে যাননি মেসি। ভেঙেও পড়েননি। আবার উঠে দাঁড়ান। সেই উঠে দাঁড়ানোর শক্তিতেই বারুদ হয়ে জ্বললেন। লুসেইল আইকনিক স্টেডিয়ামে হাজার হাজার রঙিন টুকরো কনফেত্তির আলোয় মেসির হাতে বিশ্বকাপ এবং তার আবেগ দেখে মনে হলো—ট্রফি নয়, যেন পুরো বিশ্ব মেসির হাতের মুঠোয়!

২০২৬ বিশ্বকাপ মেসি ও আর্জেন্টিনাকে আরেকবার জানিয়ে দিল—ফুটবল সব সময় অ্যাডভেঞ্চারের গল্প বলে না। বাস্তবতাও শেখায়। পুরো বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখানো মেসি স্পেনের বিরুদ্ধে ফাইনালে নিষ্প্রভ! কোচ ও দলের অতিরিক্ত রক্ষণশীল কৌশলে কুপোকাত আর্জেন্টিনা। পুরো বিশ্বকাপে আক্রমণাত্মক মেজাজে খেলে আসা আর্জেন্টিনা সেদিন কেন এমন গুটিয়ে যাওয়া ফুটবল খেললেন—সে প্রশ্ন বিশ্বকাপের অনেক অজানা প্রশ্নের একটি হয়ে রইল।

মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবলকে গুডবাই বলেছেন। আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সি গায়ে তাকে আর দেখা যাবে না। এই দীর্ঘ পথচলায় মেসি পুরো বিশ্বকে যে ফুটবল আনন্দ উপহার দিয়েছেন, তা সত্যিকার অর্থেই অসাধারণ!

২০০৬ বিশ্বকাপ থেকে ২০২৬ বিশ্বকাপ—এই ২০ বছরে চারপাশের অনেক কিছুই বদলে গেছে। সংবাদপত্রের ধরন বদলেছে। খবর পৌঁছানোর মাধ্যম বদলেছে। পাঠকের অভ্যাস বদলেছে। সাংবাদিকদের কাজের পদ্ধতিও বদলেছে। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে একটি জিনিস আশ্চর্যজনকভাবে একই রয়ে গেছে; আর তা হলো মেসিকে দেখার আনন্দ। সে আনন্দের দিন আর আসবে না!

মেসি আমাদের জীবনের দুই দশকের ফুটবল স্মৃতিকে সত্যিকার অর্থেই চ্যাম্পিয়নশিপের আনন্দে ভরেছেন। ধন্যবাদ মেসি।

ধন্যবাদ ফুটবলকে এত বছর ধরে এত সুন্দর করে তোলার জন্য!

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন