অভিযুক্তদের সিট বাতিল, তদন্ত কমিটি গঠন

ঢাবিতে ব্যবসায়ীকে রাতভর আটকে রেখে নির্যাতন-লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি, নেপথ্যে ছাত্রদল

ঢাবিতে ব্যবসায়ীকে রাতভর আটকে রেখে নির্যাতন-লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি, নেপথ্যে ছাত্রদল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের একটি কক্ষে এক ব্যবসায়ীকে রাতভর আটকে রেখে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে ঢাবি ছাত্রদলের একাংশ ও ঢাকা কলেজ ছাত্রদল সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। অভিযোগ, ঈদ উপলক্ষে পলাশী মোড়ে অস্থায়ী গরু-ছাগলের বাজার থেকে চাঁদা আদায়ের অংশ হিসেবে ওই ব্যবসায়ীর কাছ থেকে এক লক্ষ টাকা দাবি করা হয়।

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী কামরুজ্জামান আপন পলাশীর দোকানমালিক সমিতির সেক্রেটারি। তাকে গত বৃহস্পতিবার রাতভর সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ১৯ নম্বর রুমে আটকে রেখে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। শুক্রবার সকালে বিষয়টি জানাজানি হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম অভিযান চালিয়ে তাকে উদ্ধার করে এবং অভিযুক্তদের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে হলে থেকে বহিষ্কার করা হয়।

বিজ্ঞাপন

আপন জানান, ছাত্রদল নেতা সোহেল রানা সিয়াম একাধিকবার ফোন করে তাকে হলে ডেকে নেন। পরে বাবু মিয়ার সহযোগিতায় ১৯ নম্বর রুমে আটকে রেখে সারারাত ধরে শারীরিক নির্যাতন চালানো হয় এবং পলাশীর অস্থায়ী পশুর হাটে চাঁদাবাজির তথ্য প্রকাশ না করার জন্য চাপ দেয়া হয়। শেষে তার কাছ থেকে এক লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়।

অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের শিক্ষার্থী বাবু মিয়া (আইন বিভাগ, তৃতীয় বর্ষ, ২০১৭-১৮ সেশন) এবং সোহেল রানা সিয়াম (পালি অ্যান্ড বুড্ডিস্ট স্টাডিজ বিভাগ, স্নাতকোত্তর দ্বিতীয় বর্ষ, ২০১৮-১৯ সেশন)। তারা দুজনেই ছাত্রদলের রাজনীতির সাথে যুক্ত বলে জানিয়েছে হল প্রশাসন।

এ ছাড়া ব্যবসায়ী নির্যাতনে অভিযুক্তদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আরও তিন বহিরাগত ছাত্রদল নেতা। তারা হলেন— মো. তারেক (দর্শন বিভাগ, ঢাকা কলেজ), কমল রায় (দর্শন বিভাগ, ঢাকা কলেজ, ২০১৮-১৯ সেশন) এবং মো. মুজাহিদ হোসাইন পলাশ (ট্রিপল-ই)। তারা নিজেদের ছাত্রদলের কর্মী পরিচয় দিয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন হলের সিনিয়র হাউজ টিউটর অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রুহুল আমিন, সহকারী অধ্যাপক মাজহারুল ইসলাম ও সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ ওমর ফারুক।

অধ্যাপক ওমর ফারুক জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্তরা চাঁদার দাবিতে ব্যবসায়ীকে আটকে রাখার কথা স্বীকার করেছে।

অন্যদিকে, একই হাটে ছাগল কিনতে গিয়ে চাঁদাবাজির শিকার হন শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের শিক্ষার্থী রায়হান উদ্দিন। তিনি জানান, আমি আমার বোনের জন্য একটি ছাগল কিনতে গেল একটি চক্র চাঁদা না দিয়ে আমাদের যেতে দিচ্ছিল না। এ সময় ভিডিও করতে গেলে চাঁদাবাজরা পালিয়ে যায়।

স্থানীয়দের দাবি, পলাশীতে অনুমোদনহীনভাবে বসা পশুর হাট থেকে ‘হাসিল’, ‘সালামি’, ‘দেন’ ইত্যাদি নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে ছাত্রদলের দুটি গ্রুপ— সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ও লালবাগ থানা ছাত্রদল।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঘটনার জেরে দুই ছাত্রদল গ্রুপের মধ্যে গত মঙ্গলবার একাধিকবার হাতাহাতি ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাও ঘটে।

এদিকে অভিযুক্ত সেলিম রানা সিয়াম ছাত্রদলের পোস্টেড নেতা নয় বলে দাবি করেছে সংগঠনটির ঢাবি শাখার দপ্তর সম্পাদক মল্লিক ওয়াসি উদ্দিন তামি। তিনি বলেন, জাতীয় পার্টির ছাত্র সংগঠন হিসেবে পরিচিত 'জাতীয় ছাত্র সমাজ' ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা আংশিক কমিটি ঘোষণা করেছিল যেখানে সভাপতি হিসেবে সেলিম রানা সিয়ামকে রাখা হয়েছিল। তবে সে এখন হয়ত ছাত্রদলের ব্যানার ব্যবহার করে ফায়দা হাসিল করছে।

লালবাগ থানার অফিসার ইনচার্জ (তদন্ত) সাইদুজ্জামান জানান, পলাশীতে গরু-ছাগলের অস্থায়ী হাট বসেছে বলে তারা জানেন এবং এটি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর যৌথ টিম কাজ করছে। তবে এখন পর্যন্ত চাঁদাবাজির বিষয়ে থানার কোনো লিখিত অভিযোগ জমা পারেনি।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দিন আহমেদ বলেন, আমরা ঘটনার ব্যাপারে জানা মাত্র ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করতে প্রক্টরিয়াল টিম পাঠাই এবং অভিযুক্তদের জবানবন্দি ও মুসলেকা নিতে সক্ষম হই।

এ বিষয়ে হল প্রশাসন অভিযুক্তদের বরাদ্দ সিট সাময়িকভাবে বাতিল করেছে এবং তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এতে আহ্বায়ক হিসেবে রয়েছেন সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ ওমর ফারুক এবং সদস্য হিসেবে রয়েছেন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রুহুল আমিন ও সহকারী অধ্যাপক মাজহারুল ইসলাম।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন