আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

সাক্ষাৎকারে আব্দুল কাদের

শিক্ষার্থীদের স্বার্থ সমুন্নত রাখতে ডাকসুকে নিয়মিত করতে হবে

মাহির কাইয়ুম, ঢাবি

শিক্ষার্থীদের স্বার্থ সমুন্নত রাখতে ডাকসুকে নিয়মিত করতে হবে
ফাইল ছবি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে (ডাকসু) ভিপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঐতিহাসিক ৯ দফার ঘোষক আব্দুল কাদের। বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শাখার আহ্বায়ক আব্দুল কাদের লড়ছেন ‘বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ’ প্যানেল থেকে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষ এবং বিজয় একাত্তর হলের আবাসিক শিক্ষার্থী। তার বাড়ি লক্ষ্মীপুর জেলায়।

আমার দেশকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আব্দুল কাদের বলেন, তিনি নির্বাচিত হলে ডাকসুকে প্রতি বছর নিয়মিত করতে চান। তিনি মনে করেন, একমাত্র ডাকসু নির্বাচন নিয়মিত হলেই শিক্ষার্থীদের স্বার্থ নিয়ে কথা বলার প্রতিনিধি থাকবে। প্রশাসনকে চাপ প্রয়োগ করে অধিকার আদায়ের প্রতিনিধি থাকবে। শিক্ষার্থীদের স্বার্থকে সমুন্নত রাখতে হলে অবশ্যই ডাকসুকে নিয়মিত করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান সংকট কীÑএমন প্রশ্নের জবাবে আব্দুল কাদের বলেন, আমার দৃষ্টিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্যমান সংকটগুলোর মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা, আবাসন সংকট, সেকেলে শিক্ষাব্যবস্থা, দলীয় নিয়োগ এবং মানসম্মত খাবারের সংকট। তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতি ও শিক্ষক রাজনীতি কেমন হবে, তার কাঠামোয় এখনো কোনো পরিবর্তন আসেনি। অভ্যুত্থানের আগে যেভাবে শিক্ষার্থীরা লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি করেছে, এখনো সেটাই করছে। শিক্ষকরা দলীয় লেজুড়বৃত্তি করছেন, রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ পাচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়টি একাডেমিক নয়, পুরোপুরি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। এই যে অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়েও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক কাঠামোয় কোনো পরিবর্তন এলো না, এটিই সবচেয়ে বড় সংকট।

আব্দুল কাদের বলেন, এই লেজুড়বৃত্তিক প্রবণতা কৃত্রিম আবাসন সংকট তৈরি করে। বাজেট হলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন হল নির্মাণ করে না। লেজুড়বৃত্তিক প্রশাসন ও ছাত্র সংগঠন মিলে হলে হলে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এবং ওই সংকটকে কাজে লাগিয়ে গণরুম-গেস্টরুম কালচার তৈরি করে। এভাবে একটি আসনের জন্য শিক্ষার্থীদের বছরের পর বছর রাজনৈতিক দাস বানিয়ে রাখে। তিনি বলেন, তৃতীয়ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থা সেই সেকেলে পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে। একাডেমিক সিলেবাস থেকে শুরু করে রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ের কার্যক্রমÑসবকিছু মান্ধাতার আমলের পদ্ধতিতে হচ্ছে। এগুলো শিক্ষার্থীদের ব্যাপকভাবে ভোগাচ্ছে। অন্যদিকে, দলীয় পরিচয়ে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি জায়গা দলীয়করণ করে ক্ষমতাসীন দল। বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হলেও কৌশলে ছায়া প্রশাসন বসিয়ে ক্ষমতাসীন দল তাবেদারি করে। এগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বকীয়তা নষ্ট করে।

নির্বাচিত হলে প্রধানত কী কী পরিবর্তন আনতে চানÑএমন প্রশ্নের জবাবে কাদের বলেন, ‘আমি নির্বাচিত হলে সর্বপ্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক কাঠামো কেমন হবে তার একটি রূপরেখা তৈরি করব। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ও একাডেমিক এরিয়ায় ছাত্র রাজনীতি ও শিক্ষক রাজনীতি কেমন হবে, তা একটি নীতিমালার মধ্যে নিয়ে আসব। দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতোমধ্যে দুই হাজর ৮০০ কোটি টাকার মেঘা প্রকল্পের একটি বাজেট হয়ে গেছে। সেখানে ১০টি হল নির্মাণের বাজেটও আছে। কাজেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে আবাসন সংকট থাকবে না। তবে হল নির্মাণের আগ পর্যন্ত যেসব শিক্ষার্থী আবাসিক সুবিধা পাবে না, তাদের জন্য বিশেষ স্কলারশিপের ব্যবস্থা করা হবে।

তৃতীয়ত, সেকেলে একাডেমিক সিস্টেম ভেঙে আধুনিকায়নের দিকে মনোযোগী হব। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির দিন থেকে শুরু করে গ্র্যাজুয়েশন শেষে সার্টিফিকেট হাতে পাওয়া পর্যন্ত সব কাজ যাতে একটি অ্যাপের মাধ্যমে সম্পন্ন করা যায়, আমরা সে উদ্যোগ নেব। প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি সেলের জন্য কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ থাকে কিন্তু তাদের কার্যক্রম সেই সেকেলে প্রক্রিয়ায়ই চলছে।

চতুর্থত, বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিকভাবে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ আমরা রুখে দেব। আমরা শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করব, যেখানে শিক্ষার্থীরাও শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে পারবে; অভিযোগ করতে পারবে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনগুলোর খাবারের মানোন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো, প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে বিশেষ বৃত্তির আওতায় আনা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ক্যাম্পাসে পার্টটাইম কাজের ব্যবস্থা করাসহ বেশকিছু পরিকল্পনা আমাদের হাতে রয়েছে।

ডাকসু নির্বাচনে বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ প্যানেল নিয়ে কাদের বলেন, ‘আমরা সর্বাপেক্ষা গ্রহণযোগ্য শিক্ষার্থীদের আমাদের প্যানেলে প্রার্থী হিসেবে রাখার চেষ্টা করেছি। প্যানেলে যারা আছেন তারা শুধু জুলাই অভ্যুত্থানে নয়; বরং ক্যাম্পাসে যে কোনো সংকটে শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে, যে কারণে তারা শিক্ষার্থীদের আস্থার জায়গা হয়ে উঠেছে।’

কাদের বলেন, আমাদের প্যানেলের প্রার্থীরা শিক্ষার্থীদের কাছে প্রুভেন ফ্যাক্টর। আমাদের প্যানেলের প্রত্যেক প্রার্থী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ‘কানেক্টেড’। শিক্ষার্থীদের স্বার্থের জায়গাটা আমাদের প্রধান প্রায়োরিটি। আশা করছি তারা আমাদের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখবে।

বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ প্যানেলের বাইরেও গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের অনেক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, এটি সাংগঠনিক দুর্বলতা কি নাÑএমন প্রশ্নের উত্তরে কাদের বলেন, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ গণঅভ্যুত্থানের পর গড়ে উঠেছে। কাজেই এখানে যারা আছে সবার ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্য আছে, শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর ম্যান্ডেট আছে। তবে আমরা সাংগঠনিকভাবে অভ্যন্তরীণ ভোটাভুটির মাধ্যমে যাদের বেশি উপযুক্ত মনে করেছি, তাদের মনোনীত প্যানেল ‘বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ’-এ প্রার্থী হিসেবে রেখেছি। এর বাইরে যারা নির্বাচন করতে আগ্রহী, তাদের আমরা অনুৎসাহিত করিনি। আমরা তাদের স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করার জন্য অনুপ্রাণিত করেছি।

আব্দুল কাদের বলেন, প্যানেলের বাইরেও আমাদের এত এত প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, এটি সাংগঠনিক দুর্বলতা নয়; বরং সক্ষমতা। নির্বাচনের মাধ্যমে আমাদের নেতারা আরো বেশি জনসম্পৃক্ততা পাক, এটি আমরা চাই। আমরা অভ্যুত্থান পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছিলাম। ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরা আমাদের মূল্যায়ন করবে আমরা আশাবাদী।

বিগত ডাকসুর তুলনায় এবারের নির্বাচনের পার্থক্য তুলে ধরে কাদের বলেন, ২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচন ছিল শুধুই আনুষ্ঠানিকতা। শিক্ষার্থীদের চাপের মুখে কোনোরকম একটি নির্বাচন দেওয়া হয়েছিল। ওই নির্বাচনে শিক্ষার্থীরা ভোট দিতে পারেননি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছাত্রলীগের পক্ষ নিয়ে নিয়েছিল। মূলত ওই নির্বাচন যে ‘মেটিকুলাসলি ডিজাইনড’ একটি নির্বাচন ছিল, এটি সবার কাছে স্পষ্ট। তিনি বলেন, এবারের ডাকসু গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে মাঠপর্যায়ে ব্যাপক আনুষ্ঠানিকতা লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ নির্বাচন উপহার দেবে বলে আমরা আশা করছি ।

যদি ভিপি হিসেবে নির্বাচিত না-ও হন, শিক্ষার্থীদের কল্যাণে আপনার ভূমিকা কেমন হবেÑএমন প্রশ্নের উত্তরে কাদের বলেন, ‘আমি ভিপি হই কিংবা না হই, আমার অবস্থান সব সময় শিক্ষার্থীদের পক্ষে থাকবে। শিক্ষার্থীদের ম্যান্ডেট নিয়ে আজীবন কথা বলে যাব।’

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন