হারিকেন ও হাঁড়ি-পাতিল নিয়ে ঢাবিতে বিক্ষোভ

হারিকেন ও হাঁড়ি-পাতিল নিয়ে ঢাবিতে বিক্ষোভ
হারিকেন ও হাঁড়ি-পাতিল নিয়ে ঢাবিতে ছাত্রশক্তির বিক্ষোভ। ছবি: আমার দেশ

দেশব্যাপী চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে হারিকেন ও রান্নার হাঁড়ি-পাতিল হাতে নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) বিক্ষোভ করেছেন জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীরা। সংকটের প্রতীক হিসেবে হারিকেন ও খালি হাঁড়ি-পাতিল হাতে নিয়ে তারা সরকারের জ্বালানি ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে বিভিন্ন স্লোগান দেন।

সোমবার (৩ আগস্ট) বিকেল সাড়ে ৫টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি সংলগ্ন রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে জাতীয় ছাত্রশক্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার উদ্যোগে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।

বিজ্ঞাপন

বিক্ষোভে নেতাকর্মীরা হারিকেন ও রান্নার হাঁড়ি-পাতিল হাতে নিয়ে ‘বাহ আজব তারেক ভাই, খাম্বা আছে কারেন্ট নাই’, ‘চুলা আছে গ্যাস নাই, বাহ আজব তারেক ভাই’ এবং ‘শিক্ষা ঐক্য, মুক্তি মুক্তি’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন। এ সময় তারা গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি বন্ধে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেন।

সমাবেশে জাতীয় ছাত্রশক্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি তাহমিদ আল মুদ্দাসসির চৌধুরী বলেন, দেশের বিদ্যুৎ খাতে আবারও ২০০২ থেকে ২০০৪ সালের পরিস্থিতি ফিরে এসেছে। তখন যেমন খাম্বা থাকলেও বিদ্যুৎ পাওয়া যেত না, বর্তমানে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ খাতে আমরা আবারও ২০০২-২০০৪ সালের যুগে ফিরে গেছি, যেখানে শুধু খাম্বা আছে, কিন্তু ঘরে বিদ্যুৎ নেই। গ্রামে খবর নিয়ে দেখেন, ১২-১৩ ঘণ্টা পর একবার বিদ্যুৎ আসে। তাও এক-দেড় ঘণ্টার বেশি থাকে না।’

বিদ্যুৎ সরবরাহের এই সংকটের পাশাপাশি গ্রাহকদের অতিরিক্ত ও অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

তার দাবি, অনেক ক্ষেত্রে আগের তুলনায় তিন গুণের বেশি বিল আসছে।

তাহমিদ আল মুদ্দাসসির বলেন, বিদ্যুৎ সংকট শুধু সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকেই ব্যাহত করছে না, এর প্রভাব পড়ছে শিল্প ও উৎপাদন খাতেও। একইসঙ্গে গ্যাস সংকটের কারণে কারখানাগুলোর উৎপাদন সীমিত করতে হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।

গ্যাস সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় মানুষ দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসের সমস্যায় ভুগছেন। রান্নার জন্য অনেকে বাধ্য হয়ে সিলিন্ডার ব্যবহার করছেন। কিন্তু সিলিন্ডারের দামও গত কয়েক মাসে দফায় দফায় বাড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘গ্যাস সংকটের কারণে কারখানাগুলোর উৎপাদন সীমিত করতে হচ্ছে। ঢাকা শহরের আবাসিক এলাকায় কোথাও গ্যাস নেই। মানুষ সিলিন্ডার ব্যবহার করবে, কিন্তু গত চার মাসে দফায় দফায় সিলিন্ডারের দাম বাড়ানো হয়েছে।’

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট দ্রুত সমাধান না হলে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা সরকারকে হুঁশিয়ার করে দিতে চাই, এভাবে গ্যাস সংকট চলতে থাকলে আমরা তিতাসসহ জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সব প্রতিষ্ঠানে তালা দেব, অবরোধ করব।’

সমাবেশে জাতীয় ছাত্রশক্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ সাকিব বলেন, দেশে বর্তমানে কোনো মহামারি, যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ কিংবা বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ চলছে না। তারপরও জনগণকে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও দ্রব্যমূল্যের সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, দেশে কিংবা পৃথিবীর কোথাও কোনো মহামারি চলছে না। কোথাও যুদ্ধ চলছে না। বাংলাদেশে কোথাও সিভিল ওয়ার চলছে না। গত এক বছরে বাংলাদেশ কোনো বড় দুর্যোগেরও শিকার হয়নি। কিন্তু বিএনপি সরকার গঠন করার পর থেকেই আমরা একটি কৃত্রিম সংকট, কৃত্রিম মহাদুর্যোগ এবং লুটপাটের স্বর্গরাজ্যে বাংলাদেশকে পরিণত হতে দেখছি।

সাকিব বলেন, তীব্র গ্যাস সংকট, অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। সরকারের বিভিন্ন নীতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, একদিকে ভিন্নমতের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ রয়েছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষকে নিত্যদিনের মৌলিক চাহিদা পূরণে সংকটে পড়তে হচ্ছে।

তিনি বলেন, তীব্র গ্যাস সংকট, ভূতুড়ে বিদ্যুৎ বিল ও অস্বাভাবিক দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদ জানাই। একদিকে ভিন্নমতের ওপর দমন-নিপীড়ন, অন্যদিকে সাধারণ জনগণের দুর্ভোগ- সিন্ডিকেট সরকারের চরম অযোগ্যতার বহিঃপ্রকাশ।

অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের নামে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বন্ধ করা ছাড়া নিকট অর্থনৈতিক সংকট থেকে বাংলাদেশের পরিত্রাণের বিকল্প নেই।

তিনি আরও বলেন, নতুন করে খাম্বা যুগ কিংবা হারিকেনের যুগে আর ফিরতে চাই না। আমরা মুক্তি চাই। নিরাপত্তা চাই।

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন মোহাম্মদ সাকিব। তিনি বলেন, রাজধানীর মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরেও টানা কয়েকদিন ধরে গ্যাস সংকট চলছে। এর পাশাপাশি বিদ্যুতের মূল্য এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ছে।

তিনি বলেন, ‘গত ১৬-১৭ দিন ধরে রাজধানী ঢাকার মতো জায়গায় গ্যাস সংকট চলছে। বিদ্যুতের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি আমরা প্রত্যক্ষ করছি।’

সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘অথচ এই পরিস্থিতিতেও আমরা দেখি, আমাদের পিএম ভাইয়া প্রতিদিন রিলস বানাচ্ছেন। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক।’

সাকিব অভিযোগ করেন, প্রধানমন্ত্রী একদিকে দলীয় ক্যাডারবাহিনী নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছেন, অন্যদিকে জনগুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে বিবেচিত তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণেও ব্যর্থ হয়েছেন।

সমাবেশে জাতীয় ছাত্রশক্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সহ-সভাপতি মোহাম্মদ আবু সাঈদ বলেন, দেশে আবারও বিদ্যুৎ খাতে সিন্ডিকেটের প্রভাব তৈরি হয়েছে। এর ফলে একদিকে বিদ্যুৎ সরবরাহে সংকট দেখা দিয়েছে, অন্যদিকে গ্রাহকদের অস্বাভাবিক বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

তিনি বলেন, ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের সেই বিদ্যুৎ সিন্ডিকেট আবারও চালু হয়েছে। সারাদেশে বিদ্যুৎ নেই, অথচ অসহনীয় বিদ্যুৎ বিল আমরা পরিশোধ করছি।

বিদ্যুৎ খাতে বিপুল অর্থ ব্যয়ের দাবি তুলে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এর মধ্যে এর পরিমাণ এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।’

গ্যাস সংকটের কারণে রাজধানীর মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও ব্যাপক ভোগান্তি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেন আবু সাঈদ। তিনি বলেন, ঢাকায় দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস সংকট চলছে। এর প্রভাব পড়েছে যানবাহন ও জ্বালানি সরবরাহেও।

তিনি বলেন, ঢাকায় দীর্ঘ এক মাস ধরে গ্যাস নেই। সিএনজি চলছে না। মানুষের গাড়ি চলছে না। পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। আমাদের গ্যাস কোথায় যাচ্ছে- আমরা জানতে চাই।

বিক্ষোভ থেকে জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীরা গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট দ্রুত নিরসন, অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল বন্ধ, জ্বালানির মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার দাবি জানান।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন