আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

আয়া সোফিয়ায় প্রথম জুমা

মাহফুজ আল মাদানী

আয়া সোফিয়ায় প্রথম জুমা

সুলতান রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান সরকার প্রধান হওয়ার পর থেকে আয়া সোফিয়াকে মসজিদে ফিরিয়ে আনার স্বপ্নে বিভোর ছিলেন। তবে সেটা খুব সহজ ছিলো না। যার কারণে তিনি বুদ্ধিমত্তার সাথে জনমত গঠনের দিকে মনোনিবেশ করেন। আস্তে আস্তে ব্যাপক সাড়া ফেলে। ২০১৪ সালে আনতালিয়া ইয়ূত ফোরামের মাধ্যমে ‘জায়নামাজ নিয়ে আয়া সোফিয়া চল’ স্লোগানে আপামরজনতার মধ্যে বিপ্লব গড়ে তুলেন। সর্বশেষ জনগণের দাবীর প্রেক্ষিতে ১০ জুলাই ২০২০, শুক্রবার আয়া সোফিয়াকে যাদুঘরের মর্যাদা নাকচ করে মসজিদে রূপান্তরের আদেশ দেয়া হয়। সুলতান এরদোয়ানের স্বাক্ষরের পরপরই এদিন আসরের আযান আয়া সোফিয়া হতে সম্প্রচার করা হয়। যা ছিল প্রায় ৮৬ বছর পর ফিরে পাওয়া মসজিদ আয়া সোফিয়া। মামলার রায়ে তুরষ্কের সর্বোচ্চ আদালত ‘১৯৩৪ সালে মন্ত্রিসভার যে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মসজিদ থেকে আয়া সোফিয়াকে যাদুঘরে রূপান্তরিত হয়েছিল তা আইন মেনে করা হয় নি’ বলে ঘোষণা করেন। একই দিন সুলতান এরদোয়ান ২৪ জুলাই ২০২০, শুক্রবার নামাজ আদায়ের বিবৃতিও প্রদান করেন। যে ঘোষণা তুরস্কসহ মুসলিম বিশ্বের আপামর জনতাকে করে উচ্ছ্বসিত। যা ছিলো বায়তুল মাকদিস পুনরুদ্ধারের বীজ বপনের সূচনা।

বিজ্ঞাপন

যখন থেকে গুঞ্জন উড়ছিলো খুব শীঘ্রই আয়া সোফিয়াকে আবার নামাজের স্থান হিসেবে ঘোষণা করা হচ্ছে তখন থেকেই প্রতীক্ষার প্রহর গুণছিলাম। সর্বশেষ সংবাদ মাধ্যমে নিউজ প্রকাশিত হলো যে, ১০ জুলাই রায় ঘোষিত হবে। আমি মনে মনে ভাবছিলাম যেদিন রায় ঘোষিত হবে সেদিন সম্ভবত মসজিদে নামাজ আদায় হবে। সেজন্য প্রস্তুতি নিয়েই রেখেছিলাম, রায় ঘোষণার দিন যেভাবেই হোক উপস্থিত হয়ে নামাজ আদায় করবো। রায় ঘোষণা হওয়ার দিন রীতিমত জায়নামাজ নিয়ে আয়া সোফিয়াতে উপস্থিত হই। মজার বিষয় হলো, আমি আসলে কল্পনাই করতে পারিনি যে, এতো আয়োজন করে আয়া সোফিয়া মসজিদ হিসেবে ফিরে আসবে। সবশেষে, আয়া সোফিয়াতে পৌছেঁ দেখি নামাজের মতো কোন ব্যবস্থা তখনো হয়নি, এবং ঐ দিন রায় ঘোষণা হওয়ার কথা থাকলেও জুমুআর নামাজের আগে রায় প্রকাশিত হয়নি। পরে আয়া সোফিয়ার পাশেই বিখ্যাত ব্লু মোস্ক বা সুলতান আহমেদ মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করি। নামাজ আদায় শেষে আয়া সোফিয়ায় প্রবেশ করি। বলে রাখা ভালো, তখনও আয়া সোফিয়াতে প্রবেশ করতে প্রবেশ ফি বাধ্যতামূলক ছিল। আমার কাছে একবছরের মিউজিয়াম কার্ড থাকায় অনায়াসে প্রবেশ করতে পারি।

আয়া সোফিয়াতে প্রবেশ করে চতুর্দিক ঘুরে ঘুরে ভালো করে অবলোকন করতে থাকি আর কল্পনা করে মনে মনে বলতে থাকি, আয়া সোফিয়া ইনশাআল্লাহ্! খুব শীঘ্রই আমরা তোমাকে তোমার মূল হিসেবে ফিরে পাবো। তোমাতে মহান রবের তরে মাথাবনত করে আমরা ফিরে পাবো ইস্তাম্বুল বিজেতা মহাবীর সুলতান মুহাম্মদ ফাতিহ রহ. এর রেখে যাওয়া আমানত। ঐদিন বিকালে আসরের পরপরই রায় ঘোষিত হয় আয়া সোফিয়া আবারো মসজিদ হিসেবে নামাজের জন্য খুলে দেয়া হবে। এটাও বলা হয় যে, আগামী ২৪ জুলাই শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে আয়া সোফিয়াতে জুমার নামাজ আদায়ের মাধ্যমে উদ্ধোধন হবে। এবং এই সময়ের মধ্যে আয়া সোফিয়াকে নামাজের জন্য প্রস্তুত করা হবে। যেহেতু এটা মিউজিয়াম ছিল এবং তাতে নামাজের পরিবেশ ছিলো না। সেদিন থেকেই ক্ষণ গণনা শুরু করতে থাকি।

২৪ জুলাই শুক্রবার। আমরা রুমমেট সবাই বৃহস্পতিবার রাত থেকে প্রস্তুতি নিতে থাকি পরদিন আয়া সোফিয়াতে জুমার নামাজ আদায়ের জন্য। বাসা থেকে আয়া সোফিয়া যেতে সময় লাগে ঘন্টাখানেক। সকাল নয়টায় রওয়ানা দিয়ে পৌঁছাতে প্রায় পৌনে এগারোটা বেজে যায়। মসজিদের আশেপাশে জায়গা না পাওয়ায় অনেক দূরেই অবস্থান করতে হয়। আগের দিন সন্ধ্যার থেকে মসজিদের চতুর্পাশ কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে যায়। তাও আমরা নামাজের বহু আগে চলে যাওয়াতে অনেকটা কাছে ছিলাম যেখান থেকে মসজিদ দেখা যাচ্ছিল। আসার সময় দেখতে পাই আমাদের পিছনে প্রায় দেড় থেকে দুই কিলোমিটার জুড়ে মানুষের সমাগম। সবদিকের যান চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। ৮৬ বছর পর নামাজ আদায় এবং নিজে উপস্থিত থাকার অনুভুতি ভাষায় প্রকাশ অনেকটা কঠিন বা অসম্ভব। সেদিন আল্লাহু আকবার ধ্বণিতে ইস্তাম্বুলসহ তুরস্কের আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হয়েছিল। মানুষের হাতে কালিমা খচিত পতাকা আর কপালে কালেমা খচিত ব্যাজে অনন্য এক পরিবেশ। সকাল থেকে মসজিদে পবিত্র কোরআনের সুরা ইয়াসিন, সুরা মারইয়াম, সুরা কাহাফ, সুরা আল ফাতহসহ বিভিন্ন সুরা তেলাওত করা হচ্ছিল। নামাজে সুলতান এরদোয়ানসহ মন্ত্রীপরিষদের অনেকেই অংশ নেন। অংশ নেন লক্ষাধিক মুসলিম জনতা। করোনার প্রাদুর্ভাব জনসমাগম ঠেকাতে পারেনি। খুতবার আগে সুলতান এরদোয়ান পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করেন। ধর্মমন্ত্রী নামাজের খুতবা পাঠ ও ইমামতি করেন। হাতে তরবারী নিয়ে খুতবা প্রদানের মাধ্যমে জানান দেন মুসলিম জাতি বীরের জাতি। আল্লাহ ছাড়া কারো রক্ত চক্ষুকে ভয় করে না। খুতবার এই ভিডিও ঝড় তুলে বিশ্বজুড়ে। এটা ছিল আধুনিক তুরস্কে আতাতুর্কের কালো অধ্যায় থেকে ইসলামের দিকে এগিয়ে যাওয়ার অন্যতম সোপান। আধুনিক তুরস্ক বিশ্বে আবার তাদের উসমানীয় শাসনের জানান দিতে সক্ষম হয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

বিষয়: