২০১৫ সালে ফ্রান্স আসেন জাফর তালহা। একটি শব্দও ফ্রেঞ্চ জানতেন না। ভর্তি হন গুস্তাব জম কলেজ পিয়াখলেতের ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসন বিভাগে। ক্লাস শেষে কাজ করতেন রেস্টুরেন্টে। ২০১৮ সালে তিন বছরের ডিপ্লোমা কোর্স শেষ করেন। কৃতিত্বের জন্য ফ্রান্স সরকার থেকে ‘বুরস আ মেরিট’ নামক সরকারি বৃত্তিও পান। বর্তমানে তালহা পোস্ট অফিসের একটি শাখার ইনচার্জের দায়িত্ব পালন করছেন।
জাফর তালহার বাড়ি সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার তিনচটি গ্রামে। আলাউদ্দিন আজাদের আট সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় জাফর। ডিপ্লোমা কোর্স শেষে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য সুযোগ পেলেও আর্থিক সমস্যার জন্য চালিয়ে যেতে পারেননি। আবার চলে যান রেস্টুরেন্টের কাজে। বছর দুয়েক পর রেস্টুরেন্টের কাজ ছেড়ে খুঁজতে থাকেন ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক চাকরির। এরই মধ্যে তিনি গরনোবল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পোস্ট অফিস ও ব্যাংকিংয়ের ওপর আরও এক বছরের কোর্স করেন। সৌভাগ্যবশত তার ডাক পড়ে পোস্ট অফিসের চাকরির। এক মাসের ট্রেনিং শেষে দুই বছর অস্থায়ীভাবে বিভিন্ন অঞ্চলের পোস্ট অফিসে কাজ করেন। কিছু দিন পর কেন্দ্রীয় অফিসে স্থায়ী নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলে জাফর তালহাও আবেদন করেন। সেখানেও তিনি কৃতকার্য হন।
বাংলাদেশে পোস্ট অফিসগুলো মৃত পর্যায় চলে গেলেও ইউরোপে সবচেয়ে সচল পাবলিক প্রতিষ্ঠনের মধ্যে একটি। চিঠি প্রেরণ, টাকা উত্তোলন ছাড়াও বিভিন্ন কাজে পোস্ট অফিসে আসে লোকজন। তালহা বলেন, এখানে বছর দেড়েক কাজ করার সুবাদে এলাকার মানুষের সঙ্গে খুবই ভালো পরিচয়। অনেকটা বন্ধুর মতো সম্পর্ক বলা যায়। বিভিন্ন উৎসবে কেউ কেউ ফুল, চকলেটের মতো ছোট ছোট উপহার প্রদান করে। এগুলো বেশ উপভোগ করি। প্রতিদিন এখানকার স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। শতভাগ ফ্রেঞ্চ অধ্যুষিত শহরে একজন বাংলাদেশি পোস্ট অফিস পরিচালনা করছে এটা তাদের কাছে অবাক করার মতো বিষয় ছিল। ফ্রান্সের স্থানীয় পত্রিকা লো দফিনে লিবার্টিও জাফর তালহাকে নিয়ে প্রতিবেদন করে। সেখানে লেখা হয়, পোস্ট অফিসের গ্রাহকেরা তার নিখুঁত বাগ্মিতা, ভাষা জ্ঞান, পেশাগত দক্ষতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহারে মুগ্ধ।
সময়টা মসৃণ ছিল না
তালহা বলেন, ফ্রান্সে আমার আগমন ২০১৫ সালে। প্রথম সময়টা আমার জন্য মসৃণ ছিল না। পরিবার থেকে হাজার কিলোমিটার দূরে। প্রতিটি ক্ষণে ক্ষণে মা-বাবাসহ পরিবারের সবাইকে মিস করতাম। ছোট্ট এই শহরে সামান্যসংখ্যক বাংলাদেশি মানুষের বসবাস থাকলেও তাদের সঙ্গে আমার দেখা ও পরিচয় হয়ে উঠে প্রায় এক বছর অবস্থানের পর। নিজের ভাষায় কারও সঙ্গে একটু আলাপ করব, দেশের কথা বলব, একটু দেশি গন্ধ নেব তা হয়ে উঠেনি বছর দেড়েক। প্রতিনিয়ত খুঁজতাম যদি একজন বাংলাদেশি মেলে। বিদেশ বিভূঁই না এলে দেশ ও দেশি মানুষের কদর বুঝা যায় না।
শুধু দেশি মানুষই নয়, দেশি খাবারেরও অভাববোধ করতেন তালহা। বলেন, প্রথমদিকে আমার আরেকটি প্রতিবন্ধকতা ছিল খাবারে। তিনবেলা ডাল, ভাত, মাছ খাওয়া অভ্যস্ত বাঙালির পেটে কি তিন বেলা সালাদ পাস্তা বাগেত (শক্ত ব্রেড) চিজ আর শুকনো খাবার হজম হয়? হোস্টেলে থাকার দরুণ নিজের মতো করে রান্নার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। কেন্টিনে মুসলিম ছাত্রদের আলাদা হালাল খাবার থাকলেও এসব খাবার কোনো বাঙালির পেটে হজম হওয়ার মতো নয়। তিন বছর এই খাবারের জন্য আমার প্রায় দশ কেজির মতো ওজন কমেছে।
প্রথম বাংলাদেশির দেখা
এ এক মজার ঘটনা। মন্টেলিমাখ শহর। এক পাকিস্তানি রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার খেতে গেলাম। রেস্টুরেন্টর মালিক আমাকে প্রথম দেখাতেই বাংলাদেশি বলে চিহ্নিত করে ফেললেন। এজন্য টাকা কম রাখলেন। উনাকে জিজ্ঞেস করলাম, এই শহরে আর কোনো বাংলাদেশি আছে কি না। এক বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টে ঠিকানা দিলেন। কিন্তু ওই ঠিকানায় গিয়ে আমি হতাশ হই। আমি তো কোনো বাংলাদেশি দেখি না। রেস্টুরেন্টের চারদিকে কয়েকবার ঘুরাঘুরি করলাম। আমার এমন ঘুরাঘুরি দেখে রেস্টুরেন্টের ভদ্র মহিলার সন্দেহ হলো। তিনি আমাকে ফ্রেঞ্চ ভাষায় জিজ্ঞেস করলেন। আমি বললাম, জি বাংলাদেশি খুঁজছি। ভদ্রমহিলা আমাকে ভাঙা বাংলাতে বলেন, আমি বাংলাদেশি। আমি চাকমা বাঙালি। তিনি আমাকে রেস্টুরেন্টের ভেতর নিয়ে কফি ওফার করলেন। কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে অঞ্জনা দিদির সঙ্গে পরিচয় হলো। দিদি প্রায় দশ বছর থেকে এখানে বসবাস করেন। বাড়ি রাঙামাটি। দিদি ভাঙা ভাঙা বাংলাতে কথা বলেন। সব কথা বুঝা কঠিন। তবুও আমি তৃপ্ত মনে দিদির কথা শুনলাম। কথা বললাম। দিদির মাধ্যমেই পরে একে একে পরিচিত হই কাশেম ভাই, আরিফ ভাই, ঝিলমিল আপুসহ কমিউনিটির অনেকের সঙ্গে।
কঠিনেরে ভালোবাসিলাম
ফ্রান্সে অভিবাসীদের জন্যে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে তাদের ভাষা। দক্ষিণ এশিয়ার বাংলা, ইংরেজিতে অভ্যস্ত অভিবাসীদের কাজের ক্ষেত্রে ভালো দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও শুধু ভাষা প্রতিবন্ধকতার জন্য ফ্রান্সের মূল ধারার সঙ্গে মিশতেও অসুবিধা হয়। ফ্রান্সে পা রাখার পর ফ্রেঞ্চ একটি বাক্য বলা দূরে থাক, একটি শব্দও বলতে পারতেন না তালহা। এজন্য প্রতিনিয়ত নানা বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। তালহা বলেন, প্রথম তিন মাস বোবা মানুষের মতো শুধু ইশারা ইঙ্গিতে যোগাযোগ করতে হয়েছে। এ যেন জবান থাকতেও জবানহীন। ফ্রেঞ্চ ভাষা পৃথিবীর কঠিন ভাষার মধ্যে একটি। তবুও কঠিন এ ভাষা আয়ত্তে আনতে ছিলাম অটল। আগ্রহ, ভালোবাসা দুটোই ছিল। এমন অভিবাসীও আছেন, যারা দশ পনেরো বছর ফ্রান্স কাটিয়ে দিয়েছেন কিন্তু এখনও ফ্রেঞ্চ ভাষা আয়ত্তে আনতে পারেননি। ফার্মেসিতে গিয়ে একটি প্যারাসিটামল কিনে আনতে গেলেও কারও সাহায্য নিতে হয়।
এসেছে ফলাফল
কলেজের প্রথম বছর শুধু ফ্রেঞ্চ ভাষার জন্য ক্লাস করেন তালহা। ভাষা সমস্যা এক বছরে মোটামুটি কেটে যায়। এরপর কলেজের মূল ক্লাসে জয়েন করেন। ভাষা শেখার কঠিন এ পথ সফলভাবেই পার করেছেন তিনি। যার ফলাফলও পেয়েছেন তিনি। তালহা বলেন, ভাষা শেখায় আমার কিছু সহপাঠি ও মেডাম মারির অবদান অতুলনীয়। ২০১৫ সালে প্রথম বছর যেখানে আমি একটি শব্দও জানতাম না সেই আমি ২০১৮ সালে কলেজের বিতর্ক প্রতিযোগিতায় পঞ্চম হয়ে কলেজ শেষ করি। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অবদান আমার ক্লাসমেইট ও শিক্ষকদের। ছাত্রবান্ধব শিক্ষক থাকলে বোবাও কথা বলতে পারে। আমি তার অন্যতম প্রমাণ। আমি অবশ্যই নিজের চেষ্টা ও আগ্রহকে বড় করে দেখব। আগ্রহ ও চেষ্টা না থাকলে ভরা নদীতেও নৌকা দৌড়াবে না।
স্বপ্ন দেশের জন্য
বাংলাদেশ থেকে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরত্বে থেকেও এলাকার নানা ইতিবাচক কাজে নিজেকে যুক্ত রেখেছেন। কো-চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন কানাইঘাট গণশিক্ষা উন্নয়ন ফাউন্ডেশনে। এরই মধ্যে ফাউন্ডেশনেরে উদ্যোগে উপজেলাভিত্তিক মক্তব শিক্ষা নিয়ে মাঠপর্যায়ের গবেষণা ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। আগামী দিনে গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করার স্বপ্ন জাফর তালহার।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

