আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ফেরদৌস আরার ঈদস্মৃতি

আফসানা খানম আশা

ফেরদৌস আরার ঈদস্মৃতি

দেশের নজরুলসংগীত শিল্পীদের মধ্যে যে কজন প্রথিতযশা পেশাদার নজরুলসংগীত শিল্পী রয়েছেন, তার মধ্যে অন্যতম ফেরদৌস আরা। এ বছর পেশাগতভাবে সংগীতজীবনের দীর্ঘ চার যুগের এই পথচলাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে ফেরদৌস আরাকে একুশে পদক পুরস্কার বা বাংলাদেশের জাতীয় ও দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মানে ভূষিত করা হয়। তার এই একুশে পদক প্রাপ্তি এবং ঈদের আয়োজন নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেছেন আমার দেশ-এর আফসানা খানম আশা

সম্প্রতি আপনি রাষ্ট্রের দ্বিতীয় সম্মাননা একুশে পদক পেয়েছেন। আপনার অনুভূতি কী?

বিজ্ঞাপন

একুশে পদক—বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পদকের মধ্যে এটি দ্বিতীয় অবস্থানে আছে, প্রথমটি স্বাধীনতা পদক। এ দুটো পদক জাতীয় সম্মান বহন করে। এটার জন্য উপযুক্ত কে, আর কোন ইয়ারে কে হবেন, এই যে নিরীক্ষা করে বাছাই করা হতো, এটাতে একটা সময় আমার মনে হতো যে, নামগুলো আসবে আবার নামগুলো বাদ হয়ে যাবে। কারণ যে যার মতো তাদের পছন্দের লোকদের সিলেক্ট করবে। কারণ বেশ কয়েক বছর ধরে আমার নাম আসে আর যায়। আমি একেবারে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম যে, আমার নাম আসবে আবার বাদ হয়ে যাবে। এবারও যে সময় সিলেকশন হয়, আমি ঢাকায় ছিলাম না। কিন্তু আমি শুনেছিলাম, আমার নাম আছে, কিন্তু এবারও আমি ভেবেছিলাম আমার নামটি থাকবে না। যখন আমি ঢাকায় ফিরলাম তখন জানতে পারলাম, আমার নাম এবার বাদ যায়নি। শুনে আমি বেশ আপ্লুত হলাম, একটা সুখের প্রলয় আমার ওপর বয়ে গেল। খুশিটা এ কারণে হয়েছি যে, যখন কেউ কোনো কিছু চাইবার উদ্দেশে বা লক্ষ্যের উদ্দেশে এগোয় না, নিজের কাজ নিয়ে নীরবে-নিভৃতে দীর্ঘকাল করে যায়, যেমন আমি দীর্ঘকাল আমি গান গেয়ে আসছি, কোনো কিছু পাওয়ার আশায় নয়। আলহামদুলিল্লাহ ওপরওয়ালার ইচ্ছায় আমি এটা পেয়েছি, আমার ইচ্ছায় নয়। আমাকে যারা সিলেক্ট করেছেন, সেই জুড়ি বোর্ডের সদস্যদের প্রতি আমার সম্মান আরো বেড়ে গেল, কারণ আমি কোনোদিন কাউকে বলতে যাইনি। কাউকে এই ব্যথার কথা জানাইনি পর্যন্ত। সেখানে যখন এই সম্মাননা পেয়ে যাই, তখন মনে হয় এটা পরম পাওয়া।

দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আপনি বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতার থেকে গান গাইতে পারেননি, এর কারণ কী ছিল?

বিটিভি, বেতার, শিল্পকলা ও সরকারিভাবে যত বিদেশযাত্রা বা রাষ্ট্রীয় যত প্রোগ্রাম—কোনোখানেই আমাকে একেবারে ডাকা হতো না। আমি কখনো কারো বিরুদ্ধে বা কারোর পক্ষে বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলে অবস্থান করিনি। আমি আমার সংগীতেই শুধু নিবদ্ধ ছিলাম। স্ক্রিনে আমি সবাইকে দেখতে পেতাম। রাষ্ট্রের যেকোনো অনুষ্ঠানে আমি সবাইকে দেখতে পেতাম। আমি ছাড়া আমি সবাইকে দেখতে পেতাম। আমার একটু খারাপ লাগত, অবাকও লাগত যে, কোন দোষে আমি বঞ্চিত হচ্ছি। আমি আজও জানি না। তবে আমি জানতে চাই, কেউ যদি আমাকে জানাতে পারত যে, এই কারণে আপনাকে ডাকা হতো না, তা হলে আমি যে বঞ্চিত ছিলাম, এটা আমি আমার প্রতি পদে দেখতে পেতাম। তবে আমি নিজে পরম শান্তি পেতাম এটা ভেবে যে, আমি একনিষ্ঠভাবে ও একাগ্রচিত্তে আমার গানকে সঙ্গে নিয়ে ছিলাম এবং এটাই করে যাব।

নতুন বাংলাদেশে এখন কি বিটিভি বা বেতারে গান গাওয়া নিয়ে কোনো প্রতিকূলতা আছে?

কী ছিল আর কী আছে, তা আমি এখনো জানি না। আমাকে এখন বিটিভিতে বেশ কিছু প্রোগ্রামে ডাকা হয়েছে। রেডিও থেকে সেভাবে এখনো কোনো ডাক পড়েনি, শিল্পকলা থেকেও না। কার্যক্রম হয়তো শুরু হয়নি, হয়তো হবে। সমস্ত জাতির কাছে এটাই আশা করছি, কাজী নজরুল ইসলামকে জাতীয় কবি নামকরণের মধ্য দিয়ে দুয়ার অনেকটা প্রশস্ত হয়েছিল, তার সেই অনবদ্য, উদ্যমী গান দিয়ে আমরা দেশকে স্বাধীনভাবে পেয়েছি, আমাদের দেশের মাতৃভাষাকে পেয়েছি। এখন সেই বাংলা ভাষা জাতিসংঘে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। আমরা এভাবে জয়ী হবো সাংস্কৃতিকভাবে। দুয়ার খুলে যাক, এটাই আমি চাই। কারো শাসন আমল বদলালেই আমাদের জাতীয় কবির গান চর্চা কমে যাবে, আমাদের শিল্পীদেরও যারা অতি ক্ষুদ্র মানুষ তাদেরও বাদ দেওয়া হবে, এটা যেন আর না হয়, সেটাই আমার চাওয়া।

ঈদের প্রিপারেশন কেমন?

ঈদের প্রিপারেশন একেক বয়সে একেক রকম হয়। আমি আমার ছোটবেলাকে খুব মিস করি। ঘরের মধ্যে আমাদের সব কাজিনদের মেলা বসত। আমাদের বাইরে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে যত না বন্ডিং, তার চেয়ে বেশি ছিল কাজিনদের সঙ্গে। তাই সবাই একসঙ্গে হতাম ঈদে। ঈদে সবাই ছুটি পেত, তাই সবাই যেন সবার সঙ্গে দেখা করতে পারে, ভালোবাসায় বুকে জড়িয়ে নিতে পারে, তাই আমার বাবা-মা সবসময় এই আয়োজনটি করতেন। এই জিনিসটা এখন খুব মিস করি এই বয়সে এসে, কেননা এখন আমি নিজেই বাবা-মা, নিজেই দাদি-নানি। এখন ভালো লাগে যখন দেখি ছোট বাচ্চারা আমার মতো গলায় ছোট ব্যাগ ঝুলিয়ে সুন্দর একটা ড্রেস পরে সালাম করে। এখন নিজের ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনিদের মধ্যে যখন সেই উচ্ছলতা দেখতে পাই, তখন মনে হয় সত্যি ঈদ এলো। এখন ওদের ঈদ। ওরা ঘুরে ঘুরে শপিং করবে—কোথায় গলার মালা পাবে, কোথায় আংটি পাবে। এখন ওদের কেনাকাটা করার পালা। এগুলো দেখেই ভালো লাগে। আরো ভালো লাগে আমার যে স্কুলটা রয়েছে ‘সুরসপ্তক’। এ ছাড়া ক্ষুদে গানরাজের গ্রুপটা, সেরা কণ্ঠের গ্রুপ ওরা আসে আমার সঙ্গে মিট করতে, এটা একটা পরম পাওয়া।

ঈদে রান্নাবান্না কে করেন?

ঈদে আমি সবসময় স্পেশাল কিছু রান্নার চেষ্টা করতাম। এখনো সেই উচ্ছ্বাস কাজ করে—ঈদের সময় কী রান্না করব, কে কী খেতে পছন্দ করবে, তাদের কী খাওয়াব। তার আগে আমি আরো কিছু মানুষের কথা মনে করি, তাদের সঙ্গে ঈদ ভাগাভাগি করি। ছোটবেলায় আমার বাবা-মাকে দেখতাম আমাদেরই এতিমখানা ও মাদরাসায় ছোট বাচ্চাদের নিয়ে ঈদ করতেন। এখন আমরাও আমাদের শ্বশুরবাড়িতে ঈদের আগেই ২৭ রমজানে গিয়ে তাদের সঙ্গে সময় কাটাই ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করার জন্য। সবাই মিলে ভাগাভাগি করে ঈদের যে আনন্দ, এর চেয়ে বড় কোনো আনন্দ আর নেই। আগে শ্বশুর-শাশুড়ি বেঁচে থাকতে তাদের জন্য যেতাম; এখনো যাই, তবে এখন মানুষের জন্য যাই, তাদের ভালোবাসার জন্য যাই।

ঈদের স্পেশাল রান্না কী হয়?

সমস্ত রান্না খাবার টেবিলে বিছানো থাকত। বোনেরা ও মা মিলে রান্না করতেন, আর আমি তখন নতুন যা শিখতাম তা-ই বানাতাম। আমি ফিস আইটেম বেশি বানাতাম। সবাই অবাক হতেন ফিস কেন! আমার ভাবনা ছিল আমরা তো মাংসাশী প্রাণী, তাই ঈদে হয় গরু, না হয় খাসি, না হয় মুরগি থাকেই। তো সেই সময় মাছ ভালো লাগে, একটু ডিফরেন্ট থাকে খাবারটা। একই রকম ভালো লাগে না, তাই পরে আবার ঘুরিয়ে অন্য আইটেম বানাতাম। কাবাব বানাতাম। মুগডাল দিয়ে মাছের বড়া বানাতাম, দই-বড়া বানাতাম। এখন আমার ছেলের বউ প্ল্যান করে কী কী রান্না হবে, আমি এখন রান্না করার চাইতেও সাপোর্ট দিই বেশি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন