সিনেমাটা দেখার পর বনলতা এক্সপ্রেসকে আপনার আর ট্রেন মনে হবে না; মনে হবে জীবন্ত দুঃখের এক বাহন, যার একেকটা বগি একেকটা দুঃখ দিয়ে ভর্তি।
জাতীয় নাগরিক কমিটির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ নিয়ে এক দীর্ঘ ও ব্যতিক্রমী রিভিউতে এসব লেখেন । ঈদুল ফিতরে মুক্তি পায় আলোচিত এই সিনেমা ‘বনলতা এক্সপ্রেস’।
সোমবার (১ জুন) রাত ১১টার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে এ রিভিউ দেন তিনি। এতে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার গল্প, চরিত্র এবং মানবজীবনের দর্শনকে এক সূত্রে গেঁথে উপস্থাপন করেন হাসনাত। সিনেমাটিকে কেবল বিনোদন নয়, বরং জীবনের বহুমাত্রিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
সিনেমার একটি দৃশ্যের প্রসঙ্গ টেনে এমপি লেখেন, অসুস্থ এক মায়ের জন্য হেলিকপ্টার আনার আবদার শুনে মন্ত্রী মহোদয় অবাক হলেন। বললেন, ‘একটা মামুলি বিষয়কে আপনি এত বড় কেন করছেন?’ গণিতের প্রফেসর রশিদ উদ্দিন উত্তর দিলেন, ‘মন্ত্রী সাহেব, মামুলি বিষয়কে বড় করে তোলাই তো মানুষের কাজ!’
বনলতা এক্সপ্রেস মুভিতেও আসলে একই কাজ করা হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। হাসনাত লেখেন, ছোট ছোট গল্প দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে অনেকগুলো মানুষের জীবনকে, তাদের দুঃখকে।
ডাক্তার আশাব চরিত্রের প্রসঙ্গ টেনে হাসনাত আব্দুল্লাহ লেখেন, ম্যাজিক দেখানো, মায়ের সঙ্গে মজা করা হাসিখুশি ছেলেটাও একটা পর্যায়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে বলল— ‘না পারলাম ভালো মানুষ হইতে, না পারলাম ভালো ডাক্তার হইতে…।’
সঙ্গে সঙ্গে আশাব হয়ে গেল বাংলাদেশের সমস্ত বড় ছেলে; যাদের পেছনে থাকে শৈশবের ট্রমা, বর্তমানজুড়ে থাকে আফসোস, আর হাতে থাকে কিছু অনর্থক ম্যাজিকের কার্ড।
দেখতে দেখতে মনে হয়, আমরাও কি অনর্থক কিছু কার্ড আর মুখে ফেইক হাসি ঝুলিয়ে বেড়ানো ডাক্তার আশাব নই?
নিঃসন্তান কিন্তু ক্ষমতাবান মন্ত্রী আবুল খায়ের, নাকি মাত্র ২৪ বছর বয়সি একমাত্র ছেলের কফিন নিয়ে যাত্রা করা রশিদ উদ্দিন- কার দুঃখ আসলে বেশি?
হাতে মাত্র এক বছরের জীবন নিয়ে আজিজ যখন স্ত্রী, ছেলে আর মেয়ের ওপর থেকে মায়া কাটাতে ব্যস্ত, ঠিক সেই সময়ে জীবনে নতুন যাত্রা শুরু করতে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে সদ্য এডমিশন ক্যান্ডিডেট রুবি।
হাসনাত লেখেন, যেই ট্রেনে একজন তরুণ কফিনে চড়ে যাচ্ছে ঠিক একই ট্রেনে একজন তরুণী জীবন নতুনভাবে শুরু করছে। একটি বিদায়ের দিকে, অন্যটি আগমনের দিকে। শেষ আর শুরুকে একই রেখায় বেঁধে। সেই একই রেললাইনে বসে গণিতের প্রফেসর কান্নায় ভেঙে পড়ে বললেন, হোল ওয়ার্ল্ডে আমি ম্যাথে জায়ান্ট নাম্বার এইট, কিন্তু ম্যাথ আমার হাতে নাই, ম্যাথ আমার হাতে নাই...।
তিনি প্রশ্ন তুলে লেখেন, ‘ম্যাথ কি আসলে আমাদের কারও হাতেই থাকে? নাকি আমাদের সব ম্যাথের সমাধান নিয়ে ওপরে একজন বসে থাকেন আর আমাদের হিসাব মেলানোর ছোটোছুটি দেখেন?’
জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী জীবনকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হাসনাত আব্দুল্লাহ লেখেন, ‘জানাজার নামাজের কোনো আজান হয় না। কারণ জন্মের সময়ই আমাদের কানে আজান দিয়ে দেওয়া হয়। জন্মের সময় আজান আর মৃত্যুর সময় তার নামাজ। এর মাঝখানের সময়টুকুই আমাদের জীবন।’
এছাড়াও বনলতা এক্সপ্রেসকে একটা পৃথিবী উল্লেখ করে এনসিপির এ নেতা লেখেন, যে পৃথিবীর এক পাশে সন্তানের কফিন, আরেক পাশে নতুন এক শিশুর জন্ম। যে পৃথিবীর এক পাশে ক্ষমতার দম্ভ, আরেক পাশে মানুষের প্রতি ভালোবাসা। এক পাশে নীলাকে হারিয়ে ফেলার কষ্ট, আরেক পাশে চিত্রার বাড়িয়ে দেওয়া হাত।
দিনশেষে বনলতা এক্সপ্রেস আমার গল্প, আমাদের গল্পই। জন্মের আজান, মৃত্যুর জানাজা, হারানোর দুঃখ কিংবা পাওয়ার আনন্দ-সব নিয়েই আমাদের জীবন। বারবার হাঁটু গেড়ে পড়ে যাওয়ার পরও আবার উঠে দাঁড়িয়ে ছুটে চলাই মানবজাতির নিয়তি।
নিয়তি বলেই একটা থেঁতলে যাওয়া ব্যাঙও মাটির সঙ্গে অর্ধেক লেপ্টে থাকা দেহটা নিয়ে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লাফায়, চলে, চলতে থাকে। তাকে থামানো যায় না। এই চলতেই থাকাই জীবনের ধর্ম। থেমে গেলেও,কষ্ট পেলেও জীবন কষ্ট পেতে পেতে সূর্যের মতো স্পষ্ট হয়ে সুস্মিত শিশিরের মতো সবার মাঝে বারবার ছড়িয়ে পড়ে। ঠিক বনলতা এক্সপ্রেসের মতো।
এই বনলতা এক্সপ্রেসকে কেউ থামাতে পারে না উল্লেখ করে হাসনাত লেখেন, কারণ এই ট্রেন মানবজীবনেরই মতো যেখানে স্থবিরতা নয়, কেবল রূপান্তরই চূড়ান্ত সত্য। সেই রূপান্তরের ভেতর দিয়েই মানুষ অশ্রুকে অভিজ্ঞতায়, সংগ্রামকে সাফল্যে, দুঃখকে মহাকাব্যে, সম্ভাবনাকে ইতিহাসে পরিণত করে।
যে রূপান্তর শিশুকে প্রৌঢ়ে, বীজকে বৃক্ষে, স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করে, সেই রূপান্তরকে বন্ধ করে দেওয়ার সাধ্য কার আছে?
উল্লেখ্য, ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ নির্মাণ করেছেন তানিম নুর। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় উপন্যাস ‘কিছুক্ষণ’ অবলম্বনে নির্মিত সিনেমাটি অ্যাডভেঞ্চার, রোমান্টিক ও কমেডি ঘরানার একটি চলচ্চিত্র।
সম্প্রতি সিনেমাটির প্রদর্শনী ঘিরে বিভিন্ন এলাকায় আলোচনা-সমালোচনা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়েও নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে সিনেমাটির রিভিউ আরও একবার আলোচনায় নিয়ে এসেছে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’কে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

