র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্তির চিন্তা করছে সরকার। ২০০৩ সালে পাস হওয়া এ সংক্রান্ত আইনটি রহিত করে র্যাব বিলুপ্তির প্রস্তাবও তৈরি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নস অর্ডিনেন্স, ১৯৭৯’ সংশোধনের মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর অধীনে ‘এসআরএফ’ বা ‘এসআরবি’ নামে পৃথক একটি ইউনিট গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে র্যাব বিলুপ্ত হলেও বাহিনীটির যেসব সদস্য বা কর্মকর্তা মানবতাবিরোধী অপরাধ, গুম ও মানবাধিকার লংঘনের মতো গুরুতর অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাদের বিচার প্রচলিত ফৌজদারি আইনে হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র আমার দেশকে এ তথ্য জানিয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আমার দেশকে জানান, র্যাব বিলুপ্তির প্রস্তাবনা তৈরির সময় জাতিসংঘ, হিউম্যান রাইটস কমিশন, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও গুম প্রতিরোধ কমিশনের প্রতিবেদন, যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সুপারিশ আমলে নেওয়া হয়েছে। তারা সবাই মানবাধিকার সমুন্নত রাখার স্বার্থে র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করেন।
র্যাব বিলুপ্তির প্রস্তাবনার বিষয়ে ওই কর্মকর্তা আরো জানান, ২০০৩ সালে বাংলাদেশ পুলিশ, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ নৌবাহিনী, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (তৎকালীন বিডিআর) ও বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড সদস্যদের নিয়ে র্যাব গঠিত হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় এ বাহিনীটি শুরুর দিকে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়ে দেশবাসীর নজর কাড়ে। তবে, শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈরশাসনামলে বাহিনীটি নিপীড়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। সেই সময়ে নারায়ণগঞ্জের সেভেন মার্ডার, কক্সবাজারের আলোচিত একরামুলসহ বিরোধী দল ও মতের নাগরিকদের ক্রস ফায়ারে হত্যা, গুম ও খুনের শত শত ঘটনা রেকর্ড করে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। র্যাবের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা এখনো বহাল রয়েছে। খুব শিগগির এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কোনো আশাও দেখছেন না বলে জানান ওই কর্মকর্তা। র্যাব গঠনের আইন রহিতের বিল তৈরির সময় এসব যুক্তিকে পর্যালোচনায় নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
প্রস্তাবিত আইনে যা রয়েছে
‘র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) রহিত করিয়া স্পেশাল রেসপন্স ফোর্সেস/ ব্যাটালিয়ন (এসআরএফ/ এসআরবি) নামে বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে একটি ইউনিট গঠন, উহার নিয়ন্ত্রণ, পরিচালন, শৃঙ্খলা ও রক্ষণাবেক্ষণকল্পে আনীত বিল’ শিরোনামে তৈরি প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নস অর্ডিনেন্স, ১৯৭৯-এর অধীনে গঠিত র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) রহিত করিয়া স্পেশাল রেসপন্স ফোর্সেস/ব্যাটালিয়ন (এসআরএফ/এসআরবি) নামে বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে একটি বিশেষ ইউনিট গঠন, উহার নিয়ন্ত্রণ, পরিচালন, শৃঙ্খলা ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং আনুষঙ্গিক বিষয়াদি সম্পর্কে বিধান করা সমীচীন।’
সংসদের আগামী অধিবেশনের জন্য প্রস্তুতকৃত এ বিলের (প্রস্তাবিত আইন) ২৮ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘এ (প্রস্তাবিত) আইন কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে র্যাব গঠন সংক্রান্ত আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (সংশোধন) আইন, ২০০৩ দ্বারা র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন গঠনের বিষয়ে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন অধ্যাদেশ ১৯৭৯ ও এর পরে অধ্যাদেশে উল্লিখিত যেসব বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল সেসব বিধান রহিত হবে।’
র্যাব বিলুপ্ত হলেও সংস্থাটির সব সম্পদ, তহবিল, নগদ ও ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ, দায়, স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি, সব হিসাব বই, রেজিস্ট্রার, রেকর্ডপত্র ও এ সংক্রান্ত সব দলিল নতুন আইন কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের প্রস্তাবিত নতুন ইউনিটের নিকট স্থানান্তর ও ন্যস্ত হবে। র্যাবের বিদ্যমান জনশক্তির বিষয়ে প্রস্তাবিত আইনের ২৮ (৪) নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, র্যাব বিলুপ্তির পর নতুন বিধি বা প্রবিধান না হওয়া পর্যন্ত এ সংস্থাটির সব কর্মকর্তা ও আর্মড পার্সোনেল বা কর্মচারী এ (প্রস্তাবিত) আইন দ্বারা গঠিত পুলিশের নতুন ইউনিটে সংযুক্ত হবেন।
পুলিশের নতুন এ ইউনিটের মহাপরিচালক প্রয়োজনে, প্রেষণে প্রেরিত বা অস্থায়ীভাবে সংযুক্ত কর্মকর্তা বা আর্মড পার্সোনেল বা কর্মচারীকে প্রেরণকারী সংস্থায় ফেরত পাঠানোর সুপারিশ করতে পারবেন বলে আইনের প্রস্তাবিত খসড়ায় বলা হয়েছে।
দায়ীদের বিচার চলমান থাকবে
প্রস্তাবিত নতুন আইন অনুযায়ী র্যাব বিলুপ্ত হলেও এর সদস্যদের মধ্যে হত্যা, গুম ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো ফৌজদারি অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিচার ও তদন্ত প্রক্রিয়া যথাযথ আইন অনুযায়ী চলবে। এ বিষয়ে খসড়া আইনের ২৮(৮) নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘পূর্বতন (রহিতকৃত) আইনের অধীনে র্যাবের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত কোনো মামলা বা আইনগত কার্যধারা কোনো আদালত বা কর্তৃপক্ষের নিকট চলমান থাকলে তা এমনভাবে নিষ্পত্তি করতে হবে, যেন উক্ত আইন রহিত হয়নি।’
আদালত সূত্র ও আইনজীবীরা জানিয়েছেন, র্যাবের বিভিন্ন কর্মকর্তা ও সদস্যের বিরুদ্ধে গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের (ক্রসফায়ার) অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালসহ দেশের বিভিন্ন আদালতে তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া চলছে। র্যাবের সাবেক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে গুম, খুন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের একাধিক অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। পুবাইলে তিনজনকে হত্যা এবং সুন্দরবন ও উপকূলীয় অঞ্চলে তথাকথিত অপারেশনের নামে বহু হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
গুম ও নির্যাতনের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা মামলায় র্যাব-২ কর্মকর্তা মহিউদ্দিন ফারুকীকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলছে। গুম ও নির্যাতনের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের গুমের মামলায় র্যাব-১১ কর্মকর্তা আলেপ উদ্দিনকেও গ্রেপ্তার দেখিয়ে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয় এবং বিচারিক কার্যক্রমের আওতায় আনা হয়েছে।
আইনজীবীরা জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায় র্যাবের বিভিন্ন পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা ও সদস্যের বিরুদ্ধে গুম ও ক্রসফায়ারের অসংখ্য অভিযোগ জমা রয়েছে এবং সেগুলোর তদন্ত চলছে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সেভেন মার্ডার মামলায় ১৬ র্যাব সদস্যকে আদালত মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সূত্র জানিয়েছে, কক্সবাজার জেলার টেকনাফের সাবেক পৌর কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যা মামলায় পতিত স্বৈরশাসক শেখ হাসিনাসহ র্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, কর্নেল (অব.) আনোয়ার লতিফ খান তুষার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুব আলম মিনু, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ, মেজর (অব.) রুহুল আমিন ওরফে রাজন, স্কোয়াড্রন লিডার নাজমুস মাহমুদ ওরফে রাজু এবং লেফটেন্যান্ট কমান্ডার আশিকুর রহমান ওরফে সৈকতের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দিয়েছে।
জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থার সুপারিশ
জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের প্রকাশিত প্রতিবেদনে র্যাব বিলুপ্ত করার সুপারিশ করা হয়েছিল। ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি সুপারিশ পেশ করে বলা হয়, র্যাবকে বিলুপ্ত করুন।
এর আগে ওই বছরের ২৮ জানুয়ারি র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটির ৫০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন জুড়ে রয়েছে র্যাবের মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গুমের ঘটনার বর্ণনা। এতে বলা হয়েছে, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও গুমের ঘটনায় অভিযুক্ত বিশেষায়িত ইউনিট র্যাব বিলুপ্ত করা সময়ের দাবি। সরকারের উচিত জাতীয় তদন্ত কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী র্যাব বিলুপ্ত করার পদক্ষেপ নেওয়া। এই ইউনিট পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত এবং বহুবার তারা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও গুমের ঘটনায় অভিযুক্ত হয়েছে।
জাতীয় গুম কমিশনের সুপারিশেও র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করা হয়েছে। চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে বলপূর্বক গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অবসান ঘটাতে বিপুল প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত সংস্কার জরুরি। এর মধ্যে র্যাব বিলুপ্ত করা, সব নিরাপত্তা বাহিনীকে কঠোর আইনি জবাবদিহির আওতায় আনা, সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ বাতিল বা মৌলিকভাবে সংশোধন করতে হবে।
র্যাব বিলুপ্তি বিএনপিরও অন্যতম দাবি
পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংস্কারের প্রস্তাব তুলে ধরে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। ওইদিন রাজধানীর গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি গঠিত পুলিশ প্রশাসন সংস্কার কমিটির প্রধান ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বর্তমান ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি) সুপারিশমালা তুলে ধরেন।
সাংবাদিকদের ওইদিন তিনি বলেছেন, র্যাবের কর্মকাণ্ডের জন্য এই বাহিনীকে বিলুপ্ত করার সুপারিশ করেছে বিএনপি। এটা মেডিকেল বিদ্যাতেও আছে, যখন একেবারে গ্যাংরিন হয়ে নষ্ট হয়ে যায়, তখন কেটে ফেলা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। সে জন্য আমরা মনে করেছি, র্যাব আন্তর্জাতিকভাবেই নিন্দিত হয়েছে। আর দেশে তো র্যাব মানেই একটা দানব তৈরি করা হয়েছে। যত ধরনের খুন-গুম, যত এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিং (বিচারবহির্ভূত হত্যা), অধিকাংশই এই র্যাব বাহিনীর মাধ্যমে হয়েছে। সে জন্য আমরা এটিকে বিলুপ্ত করার সুপারিশ করেছি। র্যাব বিলুপ্ত হলে র্যাবের দায়িত্ব আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন এবং থানা-পুলিশ যেন পালন করতে পারে, সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


