তেলাপোকা ও ফার্মের মুরগির আন্দোলন থেকে শিক্ষা

তেলাপোকা ও ফার্মের মুরগির আন্দোলন থেকে শিক্ষা

তেলাপোকাদের দাবির কাছে আত্মসমর্পণ করে দোর্দণ্ড প্রতাপশালী নরেন্দ্র মোদি সরকারের শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের শুনানির সময় প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্যকে ঘিরে ককরোচ আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল। বিচারপতি তরুণদের উপহাস করে ‘ককরোচ’ বা আরশোলা বলে মন্তব্য করেছিলেন। এর প্রতিক্রিয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশেষজ্ঞ অভিজিৎ দীপক ও অন্য আন্দোলনকারীরা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে একটি প্রতীকী প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলেন। এটি ছিল ভারতে তরুণ ও শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে গড়ে ওঠা একটি ব্যঙ্গাত্মক এবং ডিজিটালভিত্তিক প্রতিবাদ আন্দোলন।

পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস এবং শিক্ষাব্যবস্থার অনিয়ম দূর করার দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টির ডাকে দিল্লিতে পার্লামেন্ট ভবনের কাছে যন্তর মন্তরে হাজার হাজার তরুণ ও শিক্ষার্থী জমায়েত হয়েছিল। পুলিশ লাঠিচার্জ ও টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করে তাদের উঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। বরং আন্দোলন ভারতের নানা প্রদেশে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত আন্দোলনকারীদের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয় সরকার।

বিজ্ঞাপন

এই আন্দোলনের সঙ্গে বাংলাদেশে ২০১৮ সালে স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের অনেক মিল আছে। ঢাকার শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী বাসের চাপায় নিহত হওয়ার ঘটনায় ২৯ জুলাই আন্দোলন শুরু হয়েছিল। সেই আন্দোলন দমনে পুলিশ ও ছাত্রলীগ শিক্ষার্থীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। পরে সরকার চাপের মুখে সড়ক পরিবহন আইন পাস করেছিল। কিন্তু শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ ও ছাত্রলীগের নিপীড়ন গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল। এই শিক্ষার্থীরাই ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়ে হাসিনা সরকারের পতন ঘটিয়েছিল। ছাত্র-জনতার রক্তাক্ত আন্দোলনের মুখে পালিয়ে হাসিনা যে দিল্লিতে অবস্থান করছেন, সেখানে একই ধরনের আরেকটি আন্দোলন হলো। এ ধরনের আন্দোলন এখন যেকোনো দেশের সরকারের জন্য বড় হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে।

প্রথাগত রাজনৈতিক দলের আন্দোলনের চেয়ে এ ধরনের আন্দোলন মোকাবিলা করা কঠিন। দিল্লির এই আন্দোলন যদি মোদি সরকার হাসিনা-স্টাইলে দমন করতে চাইত, তাহলে পরিস্থিতি যে ভয়াবহ রূপ নিত, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ৬ জুন শুরু হওয়া এক মাসের এই আন্দোলনে একটি গুলিও চালায়নি মোদি সরকার। দিল্লির পার্লামেন্ট ভবনের মতো স্পর্শকাতর স্থাপনা ঘিরে আন্দোলনকারীরা অবস্থান নিলেও সব ধরনের রক্তপাত এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। লাঠিচার্জ কিংবা জলকামান ব্যবহারের মধ্যেই সীমিত ছিল পুলিশের পদক্ষেপ। বাংলাদেশ ও নেপালের তরুণদের আন্দোলন থেকে শিক্ষা নিয়ে মোদি সরকার ধৈর্য ও নমনীয় অবস্থান গ্রহণ করেছিল। মেনে নিয়েছিল ছাত্রদের দাবি-দাওয়া। তবে এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা মোদিকে ভারতীয়দের সামনে হাস্যকর এক ব্যক্তিতে পরিণত করেছে, যার কোনো আত্মমর্যাদা নেই।

বাংলাদেশে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন থেকে শুরু করে দিল্লির ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন—উভয় ক্ষেত্র থেকেই আমাদের দেশের নির্বাচিত সরকারের মন্ত্রীদের শিক্ষা নেওয়ার আছে। জনগণের বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছি কিংবা জনগণ আমাদের সঙ্গে আছে, এ কারণে কারো কোনো দাবি মেনে নেব না—এমন মনোভাব যেকোনো সরকারের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে।

এরই মধ্যে এ ধরনের আন্দোলনের মহড়া আমরা বৃষ্টির মধ্যে পরীক্ষা নেওয়াকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ-বিক্ষোভে দেখেছি। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এইচএসসি পরীক্ষার সময় অতিবর্ষণজনিত জলাবদ্ধতার মধ্যে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের একটি ফোনালাপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ‘ফার্মের মুরগি’ মন্তব্যকে কেন্দ্র করে পরীক্ষার্থী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে নজিরবিহীন ও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ফোনালাপে তিনি পরীক্ষার্থীদের বৃষ্টিতে ভিজে অসুস্থ হওয়ার আশঙ্কার কথা বোঝাতে গিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, ‘ওরা তো ফার্মের মুরগি, একটু ভিজলেই জ্বর চলে আসে।’ এর প্রতিবাদে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভে নেমে পড়ে শিক্ষার্থীরা। এমনকি শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ এ মন্তব্যের প্রতিবাদে সংসদ ভবনের সামনেও জমায়েত হয়েছিল। কেউ কেউ ককরোচ পার্টির আদলে ‘ব্রয়লার চিকেন পার্টি’ নামে প্রতীকী ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত সংসদে এমন মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন শিক্ষামন্ত্রী। ফলে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে। এছাড়া বিরোধী রাজনৈতিক দল ও ছাত্রসংগঠনগুলো শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনে সমর্থন না দেওয়ায় শেষ পর্যন্ত তা আর বড় আকার ধারণ করেনি।

বাংলাদেশে ছাত্রদের নেতৃত্বে গণঅভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীদের আন্দোলন গড়ে ওঠা খুব স্বাভাবিক প্রবণতা হিসেবে দেখা দিতে পারে। কারণ, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, ভ্যাটবিরোধী আন্দোলনের পর চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে একজন নিষ্ঠুর স্বৈরশাসককে দেশছাড়া করার সাফল্য ছাত্রদের মধ্যে একধরনের প্রতিবাদী মনোভাবের জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বাংলাদেশের বর্তমান তরুণ শিক্ষার্থীরা অনেক বেশি রাজনৈতিকভাবে সচেতন। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তারা যে তথ্যপ্রবাহের মধ্যে থাকে, তাতে শুধু রাজনৈতিক বয়ান বা প্রচারণার মাধ্যমে তাদের প্রভাবিত করা সহজ নয়। বহু ধরনের তথ্যের পাশাপাশি সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যও তারা হাতের মুঠোয় থাকা ফোনের মাধ্যমে নিশ্চিত হতে পারে।

আগামী দিনে রাজনৈতিক দলগুলোর চেয়ে নানা ইস্যুতে শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে গড়ে ওঠা আন্দোলনই হয়তো সরকারকে বেশি মোকাবিলা করতে হবে। কিন্তু এমন পরিস্থিতি যাতে তৈরি না হয়, সে ব্যাপারে সরকার কতটা সতর্ক, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। আমরা দেখছি, দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, সেই পুরোনো ধারায় চলছে। শিক্ষায় সংস্কারের ব্যাপারে সরকার যথেষ্ট আন্তরিক—এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। শিক্ষা সংস্কার বলতে শুধু পাঠ্যবই পরিবর্তন কিংবা পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তন নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় মেধার বিকাশ ও চর্চার ব্যাপারে দৃশ্যমান পদক্ষেপ আমরা দেখছি না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় উপাচার্য কিংবা দেশের বড় কলেজগুলোর অধ্যক্ষ নিয়োগের ক্ষেত্রে আমরা মেধা ও যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনাকেই প্রাধান্য পেতে দেখছি। অথচ গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে গঠিত সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় মেধাভিত্তিক নিয়োগ শুরু করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আস্থা তৈরি এবং মেধাভিত্তিক শিক্ষার যাত্রা শুরু করতে পারত। এটিই হতে পারত দেশের শিক্ষা সংস্কারের প্রথম ধাপ।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে যেসব তথ্য পাওয়া যায়, তা খুবই উদ্বেগজনক। ক্ষমতাসীন দলের শিক্ষক রাজনীতিকে কেন্দ্র করে নানা দল ও উপদলের চাওয়া-পাওয়াকে প্রাধান্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় পদ-পদবি বণ্টন করা হয়। এসব নিয়োগ-সিন্ডিকেট এতটাই শক্তিশালী যে, শিক্ষামন্ত্রী পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রে অসহায় হয়ে পড়েন।

শিক্ষকদের দলবাজি এখন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে বড় হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতির চেয়ে লেজুড়বৃত্তিক শিক্ষক রাজনীতি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিবেশ আরো কলুষিত করছে। এ অবস্থার পরিবর্তনে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় শিক্ষকদের পাঠদানের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তি এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। বাস্তবতা হচ্ছে, অতিরিক্ত রাজনীতিকরণের কারণে শিক্ষকদের কোনো ধরনের জবাবদিহির মধ্যে আনা সম্ভব হচ্ছে না।

তেলাপোকা কিংবা ফার্মের মুরগি—যে নামেই হোক না কেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক শিক্ষার্থীদের আন্দোলন যেকোনো ইস্যুকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে পারে। তা হতে পারে শিক্ষার্থীদের সমস্যাকেন্দ্রিক কিংবা রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক ইস্যুকেন্দ্রিক। তবে বিপুল বেকার সমস্যায় জর্জরিত বাংলাদেশের মতো দেশগুলোয় মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে না পারলে রাষ্ট্রের নানা সেক্টরে ক্ষোভ-বিক্ষোভ তৈরি হবে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, চব্বিশের গণআন্দোলনের প্রধান স্লোগান ছিল, ‘কোটা না মেধা’।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যে সরকারেই আসুক না কেন—শিক্ষার্থীদের রাজপথের আন্দোলন সবসময়ই অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং বড় ধরনের ঝুঁকি বা রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। শিক্ষার্থীদের দাবি বা ক্ষোভের প্রতি সাধারণ জনগণের সবসময় একধরনের সহমর্মিতা থাকে।

শিক্ষার্থীরা যখন শিক্ষাব্যবস্থা, পরীক্ষা পদ্ধতি কিংবা কোনো রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা নিয়ে রাস্তায় নামে, তখন সরকারের প্রশাসনিক ব্যর্থতা বা উদাসীনতা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রশাসনিক কোনো অসংবেদনশীল মন্তব্য বা পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারের জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত কমিয়ে দিতে পারে।

বর্তমানে গড়ে ওঠা ছাত্র আন্দোলনগুলোর বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এগুলো নির্দিষ্ট কোনো গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে স্থানীয় ইস্যু মুহূর্তের মধ্যে দেশব্যাপী রাজপথের বিক্ষোভে রূপ নেয়। সুনির্দিষ্ট কোনো কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব না থাকায় সরকার বা নীতিনির্ধারকদের পক্ষে আলোচনা বা পরিস্থিতি সামাল দেওয়া তুলনামূলকভাবে জটিল হয়ে পড়ে।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সরকারের সরাসরি পতনের কারণ না হলেও, এটি সরকারের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, নীতিনির্ধারণী সক্ষমতা এবং জনসমর্থনকে বড় ধরনের পরীক্ষার মুখে ফেলে দেয়। ফলে সরকারের উচিত হবে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি না করা, যাতে তরুণরা রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়।

লেখক : সহযোগী সম্পাদক, আমার দেশ

alfaz@dailyamardesh.com

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন