তিস্তা মহাপরিকল্পনা কেন অপরিহার্য

তিস্তা মহাপরিকল্পনা কেন অপরিহার্য
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের নদীভিত্তিক জীবনব্যবস্থায় তিস্তা একটি ব্যতিক্রমী আন্তর্জাতিক নদী। গত প্রায় ৫০ বছরে এই নদীর প্রবাহ, ভাঙন, পানিবণ্টন এবং মৌসুমি আচরণে যে পরিবর্তন ঘটেছে, তা শুধু উত্তরাঞ্চলের নয়, পুরো বাংলাদেশের কৃষি, অর্থনীতি ও পরিবেশ ব্যবস্থার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। তাই ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ এখন আর শুধু আঞ্চলিক উন্নয়নের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। এটি আমাদের আঞ্চলিক উন্নয়নের গণ্ডি পেরিয়ে এখন জাতীয় অস্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।

গত পাঁচ দশকের তথ্য ও বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, তিস্তা নদীর সংকট ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া পরিবেশগত ও রাজনৈতিক ব্যর্থতার ফল, যার সমাধানও হতে হবে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি। তিস্তা নদী বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জন্য যেমন জীবনরেখা, তেমনি এটি জাতীয় পর্যায়ে খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক। কিন্তু গত প্রায় ৫০ বছরে এই নদীর প্রবাহে যে পরিবর্তন এসেছে এবং বিশেষ করে ভারত-বাংলাদেশ পানিবণ্টন সমস্যার কারণে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা আজ তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে একটি জাতীয় কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কারণ এই নদীর অনিয়ন্ত্রিত প্রবাহ আজ বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৬ সালে এসে কেন এই মহাপরিকল্পনা শুধু তিস্তা অববাহিকার জন্য নয়, পুরো দেশের জন্যই অপরিহার্য বলা হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের দেখতে হবে পুরো দেশের পানি, কৃষি, অর্থনীতি, জলবায়ু ও রাষ্ট্রীয় ভারসাম্যের এক জটিল আন্তঃসম্পর্ক।

বিজ্ঞাপন

তিস্তা মহাপরিকল্পনা মূলত একটি সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা উদ্যোগ, যেখানে নদীর পানি নিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণ, সেচব্যবস্থা উন্নয়ন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদী খনন এবং পরিবেশ পুনরুদ্ধারের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এটি শুধু একটি বাঁধ বা খাল খননের প্রকল্প না হয়ে একটি সামগ্রিক জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা কৌশল হিসেবে গণ্য করা হবে।

এই প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য থাকবে : শুকনো মৌসুমে পানি ধরে রেখে কৃষিতে সেচ নিশ্চিত করা; বর্ষায় অতিরিক্ত পানি নিয়ন্ত্রণ করে বন্যা কমানো; নদীভাঙন রোধ করা; ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানো এবং নদীভিত্তিক জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা। এই লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি নতুনভাবে প্রাণ ফিরে পাবে।

তিস্তা নদী বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রায় পাঁচটি জেলা যেমন : রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা এবং পরোক্ষভাবে দেশের খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে। এ অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ কৃষিনির্ভর। কিন্তু নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় শুকনো মৌসুমে পানিসংকট এবং বর্ষায় অতিরিক্ত পানির কারণে বন্যা, এই দুই বিপরীত সংকটে তারা প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, উত্তরাঞ্চলে সেচনির্ভর কৃষি উৎপাদন পানিসংকটের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভাবনার তুলনায় কম।

তিস্তা নদীর গত ৫০ বছরের প্রবাহ পরিবর্তন একটি সংকুচিত নদীর ইতিহাস মাত্র। ১৯৭০-এর দশকে তিস্তা ছিল তুলনামূলকভাবে একটি প্রবল এবং গতিশীল নদী। বর্ষাকালে এটি বিস্তীর্ণ প্লাবনভূমি তৈরি করত এবং শুকনো মৌসুমেও একটি স্থিতিশীল প্রবাহ বজায় রাখত। কৃষি উৎপাদন ছিল অনেকাংশে প্রাকৃতিক পানির ওপর নির্ভরশীল।

কিন্তু ১৯৭৫ সালের পর থেকে উজানে (ভারত অংশে) তিস্তা নদীর ওপর একাধিক পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো নির্মাণের ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে পরিবর্তন শুরু হয়। বিশেষ করে, গজলডোবা ব্যারাজ (তিস্তা ব্যারাজ প্রজেক্ট) চালুর পর বাংলাদেশ অংশে পানিপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ও বিভিন্ন গবেষণা পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, শুকনো মৌসুমে অনেক সময় নদীর প্রবাহ স্বাভাবিক চাহিদার তুলনায় ১০-২০ শতাংশ বা তারও নিচে নেমে যায়। বর্ষায় অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেওয়ায় হঠাৎ বন্যা দেখা দেয়। এতে নদীর নাব্য কমে চর বৃদ্ধি পায়। ফলে তিস্তা একটি স্থিতিশীল নদী থেকে ‘অস্থির ও অনিশ্চিত নদীতে’ পরিণত হয়েছে।

১৯৮০-২০০০ পর্যন্ত পানিবিহীন মৌসুমের শুরু ও কৃষির সংকোচন বাংলাদেশে অঞ্চলের মানুষকে বিপদের মুখে ঠেলে দেয়। ১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে তিস্তা অববাহিকায় পানির সংকট স্পষ্ট হতে শুরু করে। এ সময় সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বাড়ে। খাল ও ছোট নদীগুলো শুকিয়ে যেতে থাকে এবং কৃষিজমির উৎপাদনশীলতা কমে যায়। বিশেষজ্ঞরা এ সময়কে তিস্তা সংকটের ‘প্রথম দৃশ্যমান পর্যায়’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। কৃষকরা বুঝতে শুরু করেন যে নদীর পানি আর আগের মতো নির্ভরযোগ্য নয়।

২০০০-২০১০ সময়ে ছিল বন্যা ও খরার দ্বৈত সংকট। ২০০০ সালের পর তিস্তা নদী এক অদ্ভুত দ্বৈত সংকটে পড়ে—একদিকে শুকনো মৌসুমে পানি নেই, অন্যদিকে বর্ষায় অতিরিক্ত পানি। এই দশকে দেখা যায়, ২০০৪, ২০০৭ ও ২০০৮ সালের বন্যায় উত্তরাঞ্চলে ব্যাপক ক্ষতি, নদীভাঙনের হার বৃদ্ধি এবং সেচব্যবস্থার ব্যয় বৃদ্ধি। এ সময়ই পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভিন্ন মূল্যায়নে বলা হয়, তিস্তা অববাহিকায় ‘ওয়াটার স্ট্রেস কন্ডিশন’ তৈরি হয়েছে। এটি কৃষির সমস্যা থেকে ক্রমান্বয়ে একটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটে পরিণত হয়।

২০১০ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত জলবায়ু পরিবর্তন ও পানিবণ্টন অনিশ্চয়তার চূড়ান্ত রূপ দৃশ্যমান রয়েছে। ২০১০ সালের পর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তিস্তা নদীর অনিশ্চয়তাকে আরো বাড়িয়ে তোলে। বরফ গলার হার, বৃষ্টিপাতের ধরন এবং মৌসুমি জলপ্রবাহে পরিবর্তন আসে।

এ সময় শুকনো মৌসুমে প্রায় সম্পূর্ণ পানি শূন্যতা দেখা যায়, বর্ষায় হঠাৎ করে বিপুল পানি ছাড়ায় আকস্মিক বন্যা হয় এবং নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে চরাঞ্চল বৃদ্ধি পায়। এটি একটি ‘এক্সট্রিম ভেরিয়াবিলিটি রিভার সিস্টেম’-এ পরিণত হয়, যা কৃষি ও মানব বসতির জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

তিস্তা নদী উজানে ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ফলে উজানের পানি ব্যবস্থাপনা সরাসরি বাংলাদেশের প্রবাহকে প্রভাবিত করে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গজলডোবা ব্যারাজ চালুর পর শুকনো মৌসুমে পানির বড় অংশ উজানেই ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ফলে বাংলাদেশ অংশে পানিপ্রবাহ কমে যায়। ২০১১ সালে ভারত ও বাংলাদেশ একটি খসড়া তিস্তা চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছালেও তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ফলে, পানিবণ্টন অনিশ্চিত রয়ে গেছে। শুকনো মৌসুমে বাংলাদেশ নির্দিষ্ট অংশের পানি পাচ্ছে না এবং কৃষি পরিকল্পনা দীর্ঘ মেয়াদে ঝুঁকিতে পড়ে গেছে।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা কেন অপরিহার্য তা গত ৫০ বছরের তথ্য ও বাস্তবতা বিশ্লেষণ করে তিস্তা মহাপরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হবে। তিস্তা একটি আন্তঃসীমান্ত নদী হওয়ায় এর সমাধান শুধু অভ্যন্তরীণভাবে সম্ভব নয়। কিন্তু বাংলাদেশের একটি শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ পানি ব্যবস্থাপনা থাকলে আন্তর্জাতিক আলোচনায় অবস্থান শক্ত হবে, নির্ভরতা কমে কৌশলগত সক্ষমতা বাড়বে। বাংলাদেশ নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ী অন্তত বর্ষার পানি ধরে রেখে প্রয়োজনীয় সেচকাজ পরিচালনা করতে পারবে।

তাই তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাংলাদেশের জন্য একটি সময়ের অপরিহার্য দাবি। এটি বাস্তবায়িত হলে শুধু উত্তরাঞ্চল নয়, পুরো দেশই লাভবান হবে। কৃষি উৎপাদন বাড়বে, বন্যা ও নদীভাঙন কমবে, পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা পাবে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে।

অন্যদিকে, এই পরিকল্পনা উপেক্ষিত থাকলে এর খেসারত শুধু তিস্তা অববাহিকা নয়, সমগ্র বাংলাদেশকেই বহন করতে হবে। তাই এখনই প্রয়োজন একটি সমন্বিত, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল সিদ্ধান্ত, যার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে তিস্তা মহাপরিকল্পনা।

তাই তিস্তা মহাপরিকল্পনা কোনো বিকল্প নয়, এটি অপরিহার্য জাতীয় প্রয়োজন। সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই প্রকল্প শুধু একটি নদীকে পুনর্জীবিত করবে না, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নকেও নিরাপদ ও টেকসই পথে এগিয়ে নেবে।

লেখক : প্রফেসর, সমাজকর্ম বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন