আধুনিক গণতন্ত্রগুলো প্রায়ই ধরে নেয়, জনসাধারণের মনোযোগ সমস্যার মাত্রা অনুসরণ করে। আমরা আশা করি, ক্ষতি যত বেশি, জনচিন্তা তত বেশি হবে। কিন্তু সমাজতত্ত্ব আমাদের বলে, বাস্তবে প্রায়ই এর উল্টোটা ঘটে। মানবসমাজ খুব কমই মনোযোগকে বস্তুনিষ্ঠ ক্ষতির অনুপাতে বণ্টন করে। বরং তারা প্রতিক্রিয়া জানায় প্রতীক, আবেগ, পরিচয়, বর্ণনা এবং গণমাধ্যমের প্রণোদনার প্রতি। ফলে তুলনামূলকভাবে ছোট ঘটনাগুলো জনআলোচনায় প্রাধান্য পেতে পারে, আর অনেক বড় কাঠামোগত অবিচার প্রান্তিক হয়ে থাকে বা ধীরে ধীরে সমষ্টিগত চেতনা থেকে হারিয়ে যায়।
এই বৈপরীত্য শুধু বাংলাদেশের জন্য অনন্য নয়। বিশ্বজুড়ে সেলিব্রিটি কেলেঙ্কারি নিয়মিতভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের চেয়ে বেশি মিডিয়া কাভারেজ পায়; বিচ্ছিন্ন অপরাধ শিরোনাম দখল করে, অথচ দীর্ঘস্থায়ী দারিদ্র্য সীমিত মনোযোগ পায়; প্রতীকী বিতর্কগুলো প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিকে ছাপিয়ে যায়। এই ঘটনাটি ব্যক্তিগত অযৌক্তিকতার প্রতিফলন নয়, বরং মনোযোগের সামাজিক সংগঠনের ফল।
কিছু সমসাময়িক উদাহরণ এই ধরনটি স্পষ্ট করে। অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ উত্সা পাটনায়েকের মতো গবেষকদের অনুমান অনুযায়ী, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন ভারতে অন্তত ৪৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্পদ আহরণ করেছিল (যদিও সঠিক পরিমাণ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে)। তবুও বাংলাদেশে জনআলোচনায় প্রায়ই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক ধ্বংসের ওপর (যার পরিমাণ ২ বিলিয়ন ডলারের মতো) অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। একইভাবে হাসিনা আমলে দুর্নীতির মাধ্যমে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার হারানোর অভিযোগগুলো প্রমাণিত, কিন্তু তুলনামূলকভাবে ছোট ব্যক্তিগত বিতর্কগুলো (যেমন হোটেলে গিয়ে সজীব ভুইয়ার হাঁসের গোশত খাওয়া) প্রায়ই টক শো এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রাধান্য পায়। একইভাবে পর্যবেক্ষকরা প্রায়ই বলেন, জামায়াতকে ঘিরে বিচ্ছিন্ন অভিযোগ বিএনপির বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগের তুলনায় অসমভাবে বেশি নজরদারি পায়। সব তথ্যগত দাবি গ্রহণ করা হোক বা না হোক, সমাজতাত্ত্বিক ধাঁধাটি একই থাকে—
‘কখন ছোটগল্প বড় ক্ষতিকে ঢেকে দেয়?’
‘কীভাবে ঠিক হয় বড় ইস্যু?’
‘কেন আমরা বড় সংকটের চেয়ে ছোট বিতর্কে বেশি ব্যস্ত?’
প্রথম ব্যাখ্যাটি আসে এজেন্ডা-সেটিং তত্ত্ব থেকে। গণমাধ্যম খুব কমই মানুষকে কী ভাবতে হবে তা বলে, কিন্তু তারা গভীরভাবে প্রভাবিত করে মানুষ কী নিয়ে ভাববে। জনমনোযোগ সীমিত। সংবাদমাধ্যম, রাজনীতিবিদ, প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এই সীমিত সম্পদের জন্য প্রতিযোগিতা করে। যে বিষয়গুলো বারবার দৃশ্যমান হয়, সেগুলো তাদের প্রকৃত গুরুত্ব যা-ই হোক না কেন, সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত ফ্রেমিং তত্ত্ব। তথ্য কখনো একা আসে না; তা বর্ণনার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়। একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে ঘিরে কেলেঙ্কারি ব্যাখ্যা করা সহজ, কিন্তু দশকের পর দশক ধরে চলা জটিল প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি বোঝানো কঠিন। উদাহরণস্বরূপ, ঔপনিবেশিক শোষণ প্রায় দুই শতাব্দী ধরে করব্যবস্থা, বাণিজ্য একচেটিয়া করা, শিল্পহীনতা এবং সাম্রাজ্যবাদী শাসনের মাধ্যমে ঘটেছে। এর প্রভাব বিস্তৃত এবং ঐতিহাসিকভাবে দূরবর্তী। বিপরীতে, মুক্তিযুদ্ধ একটি কেন্দ্রীভূত ঐতিহাসিক মুহূর্ত, যা জাতীয় পরিচয়, ত্যাগ এবং রাষ্ট্রগঠনের সঙ্গে যুক্ত। সমাজতাত্ত্বিকভাবে আবেগপূর্ণ সুসংহত গল্পগুলো সবসময় বিমূর্ত কাঠামোগত ব্যাখ্যার চেয়ে বেশি প্রভাবশালী।
এটি মনোবিজ্ঞানীরা যাকে অ্যাভেইলেবিলিটি হিউরিস্টিক বলেন তারই উদাহরণ। মানুষ গুরুত্ব নির্ধারণ করে তারা কী সহজে মনে করতে পারে তার ভিত্তিতে। নাটকীয় ঘটনা, যার সঙ্গে জীবন্ত চিত্র থাকে, সহজে মনে আসে; কিন্তু ধীরগতির কাঠামোগত প্রক্রিয়াগুলো তেমন স্মরণীয় মানসিক ছবি তৈরি করে না। একটি ভাইরাল ভিডিও বোঝা অনেক সহজ; কিন্তু আন্তর্জাতিক অর্থপ্রবাহ, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি বা ঔপনিবেশিক রাজনৈতিক অর্থনীতি বোঝা অনেক কঠিন।
গণমাধ্যমের যুক্তি এই প্রবণতাকে আরো বাড়িয়ে তোলে। আধুনিক সাংবাদিকতা ক্রমেই মনোযোগ অর্থনীতির মধ্যে পরিচালিত হয়, যেখানে দর্শকের সম্পৃক্ততা দৃশ্যমানতা নির্ধারণ করে। অ্যালগরিদম ক্ষোভ, সংঘাত, নতুনত্ব এবং আবেগকে পুরস্কৃত করে। কাঠামোগত বিষয়গুলো ধৈর্য ও ব্যাখ্যা দাবি করে; ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ফলে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো এমন গল্পকে অগ্রাধিকার দেয়, যা দ্রুত আবেগীয় প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
সমাজতাত্ত্বিক স্ট্যানলি কোহেন এই ধরনের একটি ঘটনাকে নৈতিক আতঙ্ক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সমাজ মাঝে মাঝে কিছু প্রতীকী ব্যক্তি বা ঘটনাকে চিহ্নিত করে, যা বৃহত্তর নৈতিক উদ্বেগের প্রতীক হয়ে ওঠে। এই ‘ফোক ডেভিল’ বা প্রতীকী শত্রুরা বৃহত্তর ভয়ের বাহক হয়ে ওঠে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই নৈতিক আতঙ্ক বাস্তব ক্ষতির সঙ্গে অনুপাতে নাও হতে পারে। বরং এগুলো জটিল উদ্বেগকে সহজ আবেগপূর্ণ গল্পে রূপ দেয়।
পিয়ের বুর্দিয়োর প্রতীকী ক্ষমতার ধারণা ব্যাখ্যা করে কেন কিছু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অন্যদের তুলনায় বেশি নজরদারির মুখে পড়ে। সমাজে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও গোষ্ঠীর প্রতীকী অবস্থান ভিন্ন। তাদের প্রতি প্রত্যাশাও ভিন্ন। যারা নিজেদের নৈতিকভাবে আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে প্রতিক্রিয়া বেশি তীব্র হয়। বিপরীতে, যাদের সম্পর্কে আগে থেকেই নেতিবাচক ধারণা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে একই ধরনের আচরণ কম বিস্ময় সৃষ্টি করে এবং কম মনোযোগ পায়।
অ্যান্টোনিও গ্রামশির আধিপত্যের ধারণা আরেকটি মাত্রা যোগ করে। জনআলোচনা কখনো রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ নয়। বিভিন্ন গোষ্ঠী নির্ধারণ করতে চায় কোন বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হবে এবং কোনটি প্রান্তিক থাকবে। ফলে কোন বিষয় ‘বড় ইস্যু’ হয়ে ওঠে তা প্রায়ই বর্ণনাগত আধিপত্যের লড়াইয়ের ফল।
মিশেল ফুকো আমাদের মনে করিয়ে দেন যে ক্ষমতা ভাষ্য বা ডিসকোর্সের মাধ্যমে কাজ করে। প্রতিটি সমাজ নির্ধারণ করে কোন প্রশ্ন বৈধ, কোন প্রমাণ গ্রহণযোগ্য এবং কোন বর্ণনা স্বাভাবিক। ফলে কিছু কাঠামোগত অবিচার নিয়ে নীরবতা শুধু অজ্ঞতার ফল নয়, বরং জ্ঞান উৎপাদনের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ফল।
রাজনৈতিক মেরূকরণ এই প্রক্রিয়াগুলোকে আরো তীব্র করে। মানুষ ক্রমেই এমন তথ্য গ্রহণ করে, যা তাদের বিদ্যমান পরিচয়ের সঙ্গে মেলে। ফলে একই ঘটনা ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। জনআলোচনা বাস্তব তুলনার চেয়ে পরিচয় রক্ষার দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে।
সামাজিক পরিচয় তত্ত্ব আরো ব্যাখ্যা দেয়। মানুষ তাদের গোষ্ঠী থেকে মানসিক নিরাপত্তা পায়। নিজের গোষ্ঠীকে রক্ষা করা এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের সমালোচনা করা গোষ্ঠীগত সংহতি বাড়ায়। ফলে জনপ্রতিক্রিয়া প্রায়ই নৈতিক মূল্যায়নের চেয়ে পরিচয় রক্ষার প্রতিফলন হয়।
সমষ্টিগত স্মৃতিও গুরুত্বপূর্ণ। সমাজ সব ঘটনা সমানভাবে মনে রাখে না। শিক্ষা, স্মৃতিস্তম্ভ, চলচ্চিত্র এবং আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে কিছু স্মৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়। মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের কেন্দ্রে, কারণ এটি রাষ্ট্রের জন্মের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু ঔপনিবেশিক শোষণের জন্য একই ধরনের স্মৃতিচর্চা নেই।
সংঘাত তত্ত্ব মনে করিয়ে দেয় যে, কাঠামোগত ক্ষতি প্রায়ই অদৃশ্য থাকে, কারণ তা স্বাভাবিক হয়ে যায়। অর্থনৈতিক বৈষম্য, দুর্নীতি এবং পরিবেশগত ক্ষতি ধীরে ধীরে জমা হয়। এগুলো নাটকীয় সংবাদ তৈরি করে না। সমাজতাত্ত্বিকরা একে ধীর সহিংসতা বলেন।
ডিজিটাল যুগ এই বৈষম্য বাড়িয়েছে। অ্যালগরিদম গুরুত্ব নয়, সম্পৃক্ততাকে অগ্রাধিকার দেয়। ক্ষোভ দ্রুত ছড়ায়, সূক্ষ্মতা নয়। ফলে মনোযোগ বাস্তবতার সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
এর মানে এই নয় যে ছোট বিতর্ক গুরুত্বহীন। বরং সমাজতত্ত্ব আমাদের শেখায় যে জনমনোযোগ নিজেই সামাজিকভাবে নির্মিত। গণতন্ত্রের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। কোন বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—এই প্রশ্নের সঙ্গে কেন তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, সেটা জানা নাগরিকদের জন্য আবশ্যকীয়। একইসঙ্গে কারা এর থেকে লাভবান? কোন বড় সমস্যা আড়ালে চলে যাচ্ছে? এই প্রশ্নগুলোও জরুরি।
শেষ পর্যন্ত, গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য নির্ভর করে শুধু মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর নয়, বরং সমষ্টিগত মনোযোগের মানের ওপর। সমাজ যদি ক্ষণস্থায়ী ক্ষোভে আটকে যায়, তবে গভীর কাঠামোগত সমস্যাগুলো উপেক্ষিত হয়। সমাজতত্ত্ব আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সবচেয়ে বড় বিপদ প্রায়ই সেইগুলো, যা নীরবে স্বাভাবিক হয়ে যায়।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান, নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটি, সিঙ্গাপুর
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



