হালাল অর্থনীতির বিশ্ববাজার : বাংলাদেশের সম্ভাবনা

হালাল অর্থনীতির বিশ্ববাজার : বাংলাদেশের সম্ভাবনা
জেমিনি দিয়ে তৈরি ছবি

বিশ্ব অর্থনীতির মানচিত্রে নীরবে একটি বিপ্লব ঘটতে চলেছে। এ বিপ্লবের নাম হালাল অর্থনীতি (Halal Economy)। একসময় ‘হালাল’ শব্দটি শুধু ধর্মীয় অনুশাসনের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি খাদ্যমান হিসেবে বিবেচিত হলেও আজ এটি একটি পূর্ণাঙ্গ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় রূপ নিয়েছে। বর্তমানে হালাল অর্থনীতি খাদ্যশিল্পের গণ্ডি পেরিয়ে ওষুধ, প্রসাধনী, ফ্যাশন, পর্যটন, লজিস্টিকস, ই-কমার্স, আর্থিক সেবা, শিক্ষা, গবেষণা, এমনকি ডিজিটাল প্রযুক্তিকেও অন্তর্ভুক্ত করে ফেলেছে।

বিশ্বব্যাপী মুসলিম জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রতি চারজন মানুষের একজন মুসলিম হবে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে অমুসলিম ভোক্তারাও নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত, পরিচ্ছন্ন ও নৈতিক উৎপাদনের কারণে হালাল পণ্যের প্রতি ক্রমেই আস্থাবান হয়ে উঠছেন। ফলে হালাল এখন আর শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের বিষয় নয়; এটি একটি গুণগত মান, নিরাপত্তা ও ভোক্তা আস্থার আন্তর্জাতিক প্রতীক হিসেবে পরিগণিত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এ প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক হালাল অর্থনীতির বাজার বর্তমানে প্রায় ৫ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী দশকের শুরুতেই এর আকার ৯ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি হতে পারে। অথচ এই বিশাল বাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ অত্যন্ত সীমিত। দেশের বার্ষিক হালাল পণ্য রপ্তানির পরিমাণ মাত্র ৮৫০ মিলিয়ন ডলার—অর্থাৎ এখনো ১ বিলিয়ন ডলারের সীমাও অতিক্রম করতে পারেনি। এটি শুধু হতাশাজনক নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি বড় ধরনের দুঃসংবাদও বটে।

সম্ভাবনার দিক থেকে বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার কথা নয়

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়া ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পে দেশের উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা রয়েছে। বাংলাদেশের ওষুধ এরই মধ্যে শতাধিক দেশে রপ্তানি হচ্ছে। তৈরি পোশাকশিল্প বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম। কৃষিপণ্য, হিমায়িত মাছ, চিংড়ি, চামড়াজাত পণ্য, সিরামিক, পাটজাত পণ্য এবং প্রসাধনী শিল্পেও ধীরে ধীরে আশানুরূপ সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে।

এসব শিল্প আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হালাল মানদণ্ডে উৎপাদিত ও সনদপ্রাপ্ত হলে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপের মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিশাল বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশ অনেক সহজ হবে। শুধু তাই নয়, অমুসলিম দেশগুলোয়ও নিরাপদ খাদ্য ও নৈতিক উৎপাদনের কারণে হালাল পণ্যের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে।

কেন বাংলাদেশ পিছিয়ে

বাংলাদেশের প্রধান দুর্বলতা উৎপাদনে নয়; দুর্বলতা নীতিগত কাঠামো, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায়।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শক্তিশালী জাতীয় হালাল অ্যাক্রেডিটেশন কর্তৃপক্ষের অভাব। দেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান হালাল সনদ দিলেও সেই সনদের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা সীমিত। ফলে অনেক রপ্তানিকারককে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ভারত কিংবা থাইল্যান্ডের স্বীকৃত সংস্থার কাছ থেকে আবার সার্টিফিকেশন নিতে হয়।

এর ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, রপ্তানির সময় দীর্ঘ হয় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এই অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে না পেরে হালাল বাজারে প্রবেশের আগেই পিছিয়ে যান।

হালাল শুধু খাদ্য নয়

বাংলাদেশে এখনো অনেকের ধারণা, হালাল মানেই মাংস বা খাদ্যপণ্য। বাস্তবে আন্তর্জাতিক বাজারে হালাল অর্থনীতির পরিধি অনেক বিস্তৃত।

বর্তমানে হালাল অর্থনীতির আওতায় রয়েছে, খাদ্য ও পানীয়, ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী, প্রসাধনী ও ব্যক্তিগত পরিচর্যা, টেক্সটাইল ও পোশাক, পর্যটন ও হোটেল শিল্প, লজিস্টিকস ও সাপ্লাই চেইন, ইসলামি আর্থিক সেবা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, শিক্ষা ও গবেষণা, বায়োটেকনোলজি ও উদ্ভাবন ইত্যাদি।

বাংলাদেশের শক্তিশালী টেক্সটাইল শিল্প যদি হালাল সার্টিফাইড উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে, তাহলে মুসলিম বিশ্বের বাজারে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হবে। একইভাবে ওষুধশিল্পেও রয়েছে বিশাল সুযোগ।

মালয়েশিয়া, তুরস্ক ও থাইল্যান্ড থেকে শেখার আছে

মালয়েশিয়া বহু আগেই বুঝেছিল যে হালাল অর্থনীতি শুধু ধর্মীয় বিষয় নয়; এটি একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক খাত। তাই তারা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত JAKIM গড়ে তোলে। আজ বিশ্বের বহু দেশ মালয়েশিয়ার হালাল সার্টিফিকেশনকে নির্ভরযোগ্য হিসেবে গ্রহণ করে।

ইন্দোনেশিয়া BPJPH-এর মাধ্যমে শক্তিশালী জাতীয় কাঠামো তৈরি করেছে। তুরস্ক SMIIC-এর মানদণ্ড অনুসরণ করে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ব্রাজিল। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ না হয়েও আজ ব্রাজিল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ হালাল মাংস রপ্তানিকারক। কারণ তারা আন্তর্জাতিক মান, ট্রেসেবিলিটি, মান নিয়ন্ত্রণ এবং বিপণনের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে।

থাইল্যান্ডও ‘Kitchen of the World’ নীতির অংশ হিসেবে হালাল খাদ্যশিল্পে বিপুল বিনিয়োগ করেছে এবং বর্তমানে মুসলিম বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী।

বাংলাদেশ কী করতে পারে

প্রথমত, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত জাতীয় হালাল অ্যাক্রেডিটেশন অথরিটি প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যার সনদ বিশ্বের প্রধান আমদানিকারক দেশগুলোতে গ্রহণযোগ্য হবে।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (BSTI), ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, শিল্প মন্ত্রণালয় ও বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

তৃতীয়ত, আধুনিক পরীক্ষাগার, ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পরীক্ষার সুবিধা এবং দক্ষ অডিটর তৈরি করতে হবে।

চতুর্থত, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় Halal Science, Halal Supply Chain, Islamic Quality Assurance, Halal Management ইত্যাদি বিষয়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

পঞ্চমত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে হালাল সার্টিফিকেশন প্রদান এবং সরকারি ভর্তুকি নিশ্চিত করতে হবে।

হালাল শিল্পকে জাতীয় রপ্তানি কৌশলের অংশ করতে হবে

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাকনির্ভর রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বিশ্ববাজারে ঝুঁকি কমাতে রপ্তানিকে বহুমুখীকরণ করা এখন সময়ের দাবি।

হালাল শিল্প সেই বহুমুখীকরণের অন্যতম কার্যকর মাধ্যম হতে পারে।

সরকার যদি হালাল শিল্পকে জাতীয় রপ্তানি নীতি, বিনিয়োগ নীতি এবং শিল্পনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে, তাহলে নতুন শিল্প গড়ে উঠবে, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে এবং লাখো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

শুধু রপ্তানি নয়, এটি সফট পাওয়ারও

হালাল অর্থনীতি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উন্নয়নেরও একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে।

যেভাবে জাপান মানসম্মত প্রযুক্তির জন্য পরিচিত, জার্মানি প্রকৌশলের জন্য এবং সুইজারল্যান্ড নির্ভুলতার জন্য পরিচিত, তেমনি বাংলাদেশও নিরাপদ, মানসম্পন্ন ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হালাল পণ্যের নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

এর জন্য প্রয়োজন জাতীয় ব্র্যান্ডিং, আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ, বাণিজ্য কূটনীতি শক্তিশালী করা এবং বিদেশে বাংলাদেশের হালাল পণ্যের ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তোলা।

বিশ্ব যখন হালাল অর্থনীতিকে আগামী দিনের প্রবৃদ্ধির অন্যতম মাধ্যম হিসেবে দেখছে, তখন বাংলাদেশের জন্য এ খাতে পিছিয়ে থাকার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। প্রাকৃতিক সম্পদ, মানবসম্পদ, কৃষি, শিল্প, ভৌগোলিক অবস্থান এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের পরিচয়—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এ বাজারে শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তোলার সক্ষমতা রাখে।

কিন্তু সম্ভাবনা কখনোই নিজে থেকে বাস্তবে রূপ নেয় না। তার জন্য প্রয়োজন দূরদর্শী রাষ্ট্রনীতি, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, দক্ষ মানবসম্পদ, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং বিশ্বমানের হালাল সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা।

আজ যদি বাংলাদেশ এ খাতে সুপরিকল্পিত বিনিয়োগ ও সংস্কার শুরু করতে পারে, তবে আগামী এক দশকের মধ্যে ১ বিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করা কঠিন হবে না; বরং বহু বিলিয়ন ডলারের হালাল রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা সম্ভব হবে বলে বিজ্ঞজনরা মনে করেন। এটি শুধু রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ নয়—এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, শিল্পায়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং একটি টেকসই, বহুমুখী অর্থনীতি গড়ে তোলার ঐতিহাসিক সুযোগ। এ সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করা কোনো ক্রমেই সমীচীন হবে না।

লেখক : ইসলামি অর্থনীতিবিদ, শরিয়াহ বিশেষজ্ঞ, সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন