যুক্তরাষ্ট্র-ইরান দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও অমীমাংসিত প্রশ্ন

ওরহান সালি

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও অমীমাংসিত প্রশ্ন

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যখন দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন তাদের লক্ষ্য ও কৌশল নিয়ে নতুন কিছু প্রশ্ন সামনে আসছে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের ঘটনাবলির কথা মনে করিয়ে দেয়। ১৯৩৮ সালের শরৎকালে ইউরোপ নতুন করে আর কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে চায়নি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত তখনো তাজা ছিল। ইউরোপের রাজনৈতিক নেতারা বিশ্বাস করতেন, কূটনীতির মাধ্যমেই আরেকটি বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব। পাশাপাশি জনমতও ছিল ‘যেকোনো মূল্যে শান্তি’র পক্ষে। মিউনিখ চুক্তি স্বাক্ষরের সময় অনেকেই ভেবেছিলেন, ইউরোপ একটি ধ্বংসাত্মক সংঘাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।

তবে সবার মধ্যে সেই আশাবাদ ছিল না। ব্রিটিশ রাষ্ট্রনায়ক উইনস্টন চার্চিল সেসময় এমন এক সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন, যা ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় রাজনৈতিক উক্তি হয়ে ওঠে। তিনি বলেছিলেন, ‘আপনাদের সামনে যুদ্ধ ও অসম্মানের মধ্যে একটিকে বেছে নেওয়ার সুযোগ ছিল। আপনারা অসম্মানকেই বেছে নিলেন, আর তাই এখন আপনাদের যুদ্ধই করতে হবে।’ এর ঠিক এক বছর পরেই ইউরোপ মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক যুদ্ধে, অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।

বিজ্ঞাপন

আজ বিশ্ব আবারও এক সংকটপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা, পরাশক্তিগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা, জ্বালানি করিডোর নিয়ে প্রতিযোগিতা এবং সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর ঘটনাগুলো অনিবার্যভাবেই গত শতকের তিরিশের দশকের শেষের দিকের আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কথা মনে করিয়ে দেয়। ইতিহাস হুবহু পুনরাবৃত্তি হয় না ঠিকই, কিন্তু পরাশক্তিগুলোর কৌশলগত হিসাব-নিকাশ প্রায়ই পরিচিত ধাঁচেই চলে।

ইরানকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকালে স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন জাগে—যুদ্ধবিরতির জন্য ওয়াশিংটনের বারবার আহ্বান কি সত্যিই যুদ্ধ থামানোর উদ্দেশ্যে ছিল, নাকি এটি ছিল দীর্ঘস্থায়ী ও আরো ব্যাপক কোনো সংঘাতের প্রস্তুতির প্রাথমিক পদক্ষেপ মাত্র? সংঘাতের শুরুর দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য বলে মনে হয়েছিল দ্রুত লড়াই থামানো, হরমুজ প্রণালি সচল রাখা এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটা রোধ করা।

তবে আজ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয় পক্ষের বক্তব্যেই এখন একটি সাধারণ সুর লক্ষ করা যাচ্ছে। উভয় পক্ষই জোর দিয়ে বলছে, তারা দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের জন্য প্রস্তুত। তাহলে কী পরিবর্তন হলো? পরিবর্তিত বক্তব্য কি এই ইঙ্গিত দেয় যে, যুদ্ধের উদ্দেশ্যও বদলে গেছে, নাকি একেবারে শুরু থেকেই যুদ্ধবিরতির আহ্বান ছিল সময়ক্ষেপণের একটি কৌশলগত চেষ্টা?

এই প্রশ্নগুলোর কোনো চূড়ান্ত উত্তর নেই আজ। তথাপি বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনার যোগ্য কয়েকটি সম্ভাবনা তুলে ধরে। একটি সম্ভাবনা হলো, ওয়াশিংটন প্রথমে একটি দ্রুত ফলাফলের আশা করেছিল, কিন্তু ইরান যুক্তরাষ্ট্রের ধারণার চেয়েও নিজেকে অনেক বেশি শক্তিশালী প্রমাণ করায় ট্রাম্প প্রশাসন তাদের কৌশল পরিবর্তন করে। ইরান দেখিয়েছে, তার সামরিক সক্ষমতা, বিশাল ভৌগোলিক এলাকা, পার্বত্য অঞ্চল, বিপুল জনসংখ্যা এবং কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞার অধীনে গড়ে ওঠা প্রতিরক্ষা পরিকাঠামো তাকে এমন একটি দেশে পরিণত করেছে, যার বিরুদ্ধে প্রচলিত সামরিক অভিযান দ্রুত ফল দেবে না।

ইরাক ও আফগানিস্তানের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত নতুন করে বড় আকারের স্থল অভিযান চালাতে ক্রমেই অনিচ্ছুক হয়ে পড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে এটা ধারণা করা যায় যে, ওয়াশিংটন দীর্ঘ সময় ধরে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামরিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে ইরানকে ক্রমেই ক্ষয়িষ্ণু অবস্থার দিকে ঠেলে দেওয়ার একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের দিকে ঝুঁকেছে। যদি তাই হয়, তবে ওয়াশিংটনের যুদ্ধবিরতির উদ্যোগটি একটি ভিন্ন অর্থ বহন করে।

অন্যদিকে ইরান হয়তো এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র প্রথম থেকেই শান্তি চায়নি এবং যুদ্ধবিরতির এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়াটি শুধু সংঘাতের পরবর্তী পর্যায়ের জন্য সামরিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরির উদ্দেশ্যেই পরিকল্পিত ছিল। তাছাড়া ইরানের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি কেবল যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সামরিক হামলা নয়, বরং ইরানকে দুর্বল বা খণ্ড-বিখণ্ড করার লক্ষ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশও হতে পারে।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে। যুদ্ধের শুরুর দিকে তেলের দাম সামান্য বৃদ্ধি পেলেও তা ওয়াশিংটনে ব্যাপক উদ্বেগের সৃষ্টি করেছিল। ট্রাম্প প্রশাসন বারবার জোর দিয়ে বলেছিল যে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌপরিবহনে দীর্ঘস্থায়ী ব্যাঘাত বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অগ্রহণযোগ্য হবে। কিন্তু আজ সেই জরুরি সতর্কতাগুলো অনেক কম প্রকট বলেই মনে হচ্ছে, যা অনিবার্যভাবে নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়। সেই প্রশ্নটি হচ্ছে—ওয়াশিংটন কি হরমুজ প্রণালির জন্য একটি দীর্ঘস্থায়ী ঝুঁকি সহ্য করতে ইচ্ছুক হয়ে উঠেছে? যদি তাই হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র এই আত্মবিশ্বাস কোথা থেকে পাচ্ছে?

বর্তমানে এমন কোনো বিকল্প জ্বালানি করিডোর নেই, যা হরমুজ প্রণালির সম্পূর্ণ বিকল্প হতে পারে। উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল রপ্তানির একটি বড় অংশ এখনো এই সরু নৌপথ দিয়েই পরিবাহিত হয়, অথচ বিদ্যমান বিকল্প পাইপলাইনগুলোর সক্ষমতা সীমিত। তাই ওয়াশিংটন যে কেবল বর্তমান বিকল্পগুলোর ওপরই নির্ভর করবে, তা মনে করা কঠিন।

হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত হিসাব-নিকাশ বদলে গেছে। এমনও হতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হয়তো এখন আর সামগ্রিকভাবে ইরানকে নিয়ন্ত্রণ করা নয়, বরং হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশের এলাকায় আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে একটি নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা। এমন পরিস্থিতি বিশ্ব জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের অবস্থানকে উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী করতে পারে।

তবে ইসরাইলের ক্ষেত্রে সমীকরণটি ভিন্ন। হরমুজ প্রণালি নিরাপদ হলেও ইরান একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে টিকে থাকবে। ইসরাইলের দৃষ্টিতে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকেই যাবে। এ কারণেই সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় ইসরাইলের তুলনামূলক নীরবতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

যেসব রাজনীতিবিদ ও নিরাপত্তা কর্মকর্তা আগে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে কথা বলতেন, তারা এখন লক্ষণীয়ভাবে অনেক বেশি সংযত। এই নীরবতা কি এটাই ইঙ্গিত দেয় যে, ওয়াশিংটন ও তেল আবিব পর্দার আড়ালে কোনো গোপন সমঝোতায় পৌঁছেছে, নাকি ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের এমন কোনো কৌশলের পরবর্তী ধাপের জন্য অপেক্ষা করছে, যা এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে?

এর পাশাপাশি আরেকটি মৌলিক প্রশ্নও সামনে আসে। যুক্তরাষ্ট্র কাদের সঙ্গে নিয়ে এমন দীর্ঘমেয়াদি অভিযান পরিচালনা করবে?

এক্ষেত্রে শুধু উপসাগরীয় দেশগুলোর আর্থিক সহায়তা নিশ্চিতভাবেই অপর্যাপ্ত হবে। এর জন্য প্রয়োজন হবে ধারাবাহিক গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান, সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, লজিস্টিক সহায়তা, নৌ-ক্ষমতা এবং আঞ্চলিক সামরিক ঘাঁটিগুলোয় অবাধ প্রবেশাধিকার।

উপসাগরীয় দেশগুলোর অনেক সম্পদ থাকলেও ইরানের মতো বিশাল ও সক্ষম একটি দেশের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী অভিযানের বোঝা বহন করা হবে তাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন একটি চ্যালেঞ্জ। এ অবস্থায় ওয়াশিংটন যে ব্রিটেন, ইউরোপীয় মিত্র এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা অংশীদারদের নিয়ে একটি বহুমাত্রিক জোট গঠনের চেষ্টা করবে, সেই সম্ভাবনাই বেশি জোরালো বলে মনে হয়। তবে এসব পরিস্থিতির বাইরেও একটি মৌলিক বিষয় উপেক্ষা করা উচিত নয়। আর সে বিষয়টি হলো ইরাক বা আফগানিস্তান কোনোটির মতোই নয় ইরান।

প্রায় ৯ কোটি জনসংখ্যা, বিশাল ভৌগোলিক আয়তন, বিপুল ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার এবং আঞ্চলিক অংশীদার ও প্রক্সি বাহিনীর বিস্তৃত নেটওয়ার্কের কারণে ইরান এমন কোনো দেশ নয়, যেখানে দ্রুত সামরিক বিজয় অর্জন করা সম্ভব বা আশা করা যায়। এ কারণেই যুদ্ধের শুরুর দিকের তুলনায় এখন দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের সম্ভাবনাই বেশি প্রবল বলে মনে হচ্ছে। ইতিহাস আমাদের এও মনে করিয়ে দেয়, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই ক্ষতিসাধন করে না, বরং তা অর্থনীতি, কূটনীতি, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং সমাজব্যবস্থাকেও আমূল বদলে দেয়।

আর ঠিক এ কারণেই তুরস্কের অবস্থান বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে। শুরু থেকেই আঙ্কারা এই অঞ্চলে নতুন কোনো যুদ্ধক্ষেত্র খোলার বিরোধিতার পাশাপাশি কূটনৈতিক আলোচনার পথ খোলা রাখার পক্ষে ধারাবাহিকভাবে মত দিয়েছে এবং বিশ্ব স্থিতিশীলতার জন্য জ্বালানি নিরাপত্তার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছে। তুরস্কের মূল যুক্তি হলো—সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্যে পরিচালিত সামরিক পদক্ষেপগুলো এর আগেও ইরাক, লিবিয়া ও সিরিয়ায় দীর্ঘ মেয়াদে ধ্বংসাত্মক পরিণতি ডেকে এনেছে। আজ এই অঞ্চলের জন্য নতুন কোনো দখলদারিত্ব বা ভূ-রাজনৈতিক বিভাজনের পরিকল্পনার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন এমন একটি টেকসই কূটনৈতিক কাঠামো, যা এই অঞ্চলের সব পক্ষের যৌক্তিক নিরাপত্তা উদ্বেগের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেবে।

কিন্তু তারপরও একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। এই যুদ্ধের প্রকৃত উদ্দেশ্য কি কেবল ইরানের সামরিক সক্ষমতা সীমিত করা, নাকি এমন এক বৃহত্তর কৌশলের শুরু, যার লক্ষ্য আগামী কয়েক দশকের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও জ্বালানি-সংক্রান্ত প্রেক্ষাপটকে নতুন করে সাজানো?

ডেইলি সাবাহ অবলম্বনে মোতালেব জামালী

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন