চা বানানোর সময় সামান্য চিনির দানা নিচে পড়ে যাওয়া কিংবা মিষ্টির গুঁড়ো টেবিলের কোণে জমতে না জমতেই কোথা থেকে যেন হাজির হয় সারি সারি পিঁপড়ার দল। কোনো জ্যামিতিক নিখুঁত মাপে তারা একদম পৌছে যায় নির্দিষ্ট সেই খাবারের উৎসে। কিন্তু মেঝের অদৃশ্য সেই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র খাবারের কণা পিঁপড়ারা কীভাবে এত দ্রুত ও নিখুঁতভাবে খুঁজে পায়—তা নিয়ে অনেকের মনেই দীর্ঘদিনের কৌতুহল রয়েছে।
গবেষকদের মতে, পিঁপড়ারা তাদের মাথায় থাকা বিশেষ অ্যান্টেনা বা শুঁড়ের সাহায্যে মেঝের স্পর্শ ও বায়ুমণ্ডলের রাসায়নিক পরিবর্তন অনুভব করতে পারে। মানুষের অগোচরে থাকা এসব ঘ্রাণ ও রাসায়নিক সংকেত তারা সহজেই ধরে ফেলে।
অসাধারণ ঘ্রাণশক্তি ও জিনগত ক্ষমতা
রান্নাঘরে যে পিঁপড়ার আগমন ঘটে, তা কোনো একক প্রজাতির নয়। গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রায় সব প্রজাতির পিঁপড়াই খাদ্য অনুসন্ধানে নির্দিষ্ট কিছু ধারাবাহিক ধাপ অনুসরণ করে।
ভারতে পরিচালিত একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশটিতে ৮০০-র বেশি প্রজাতির ও উপপ্রজাতির পিঁপড়া রয়েছে, যার মধ্যে মানববসতিতে অন্তত ৩৪ প্রজাতির পিঁপড়ার উপস্থিতি পাওয়া যায়।
পিঁপড়ার খাদ্য অনুসন্ধানের মূল কারিগর তাদের 'অ্যান্টেনা'। গবেষণায় দেখা গেছে, পিঁপড়ার জিনোমে বিপুল পরিমাণ গন্ধ-সংবেদনশীল জিন রয়েছে।
২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ভ্যান্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটির এক গবেষণা সায়েন্স জার্নাল পিএলওএস জেনেটিক্স-এ প্রকাশিত হয়। সেখানে বলা হয়, অন্যান্য পোকামাকড়ের তুলনায় পিঁপড়ার শরীরে ৪ থেকে ৫ গুণ বেশি ঘ্রাণগ্রাহক বা স্মেল রিসেপ্টর থাকে। মানুষের কাছে যা সাধারণ একটি রান্নাঘর, পিঁপড়ার কাছে তা অগণিত রাসায়নিক তথ্যের এক সমৃদ্ধ ক্ষেত্র।
বিশেষ ‘টেস্ট রিসেপ্টর’ ও সার্চ ইঞ্জিন
২০২১ সালে ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন জার্নালে প্রকাশিত ফায়ার অ্যান্টের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় জানা যায়, পিঁপড়ার খাবারের তালিকায় থাকা মিষ্টি উপাদানের সঙ্গে তাদের অ্যান্টেনায় থাকা স্বাদগ্রাহক (টেস্ট রিসেপ্টর) এবং সামনের পায়ের এক অনন্য সম্পর্ক রয়েছে।
পিঁপড়াদের কলোনিতে টিকে থাকতে এবং শক্তি জোগাতে সুগার বা মিষ্টিজাতীয় উপাদানের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু মিষ্টির গন্ধ বাতাসে খুব বেশি ছড়ায় না। এ জন্য পিঁপড়ার শরীরে থাকা বিশেষ অ্যাটোমিক ব্যবস্থা কাজ শুরু করে। তাদের শুঁড়ে থাকা টেস্ট রিসেপ্টর খাবারে স্পর্শ করা মাত্রই চিনির ক্ষুদ্রতম কণাকেও সনাক্ত করতে পারে। বিজ্ঞানীরা পিঁপড়ার এই টেস্ট রিসেপ্টরকে একটি প্রাকৃতিক ‘সার্চ ইঞ্জিন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
প্রাকৃতিকভাবে তৈরি 'জিপিএস' ও ফেরোমোন সংকেত
খাবারের খোঁজ মেলার পর সেখানে কীভাবে পিঁপড়ার পুরো কলোনি হাজির হয়—তার উত্তর লুকিয়ে আছে ‘ফেরোমোন’ নামক একধরনের রাসায়নিক পদার্থের মধ্যে।
মার্কিন কৃষি গবেষণা পরিসেবা এবং ২০০৯ সালে ফিজিওলজিকাল অনটোলজি জার্নালে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, যখন কোনো দূরদর্শী স্কাউট পিঁপড়া খাবারের সন্ধান পায়, তখন সে কলোনিতে ফিরে যাওয়ার সময় মেঝেতে একটি রাসায়নিক পথের রেখা বা ‘ট্রেইল’ এঁকে দিয়ে যায়।
কীটতত্ত্ববিদদের মতে, এই ফেরোমোন অনেকটা আধুনিক যুগের 'জিপিএস' বা গুগল ম্যাপসের মতো কাজ করে। রাসায়নিকের এই নির্দিষ্ট পথ অনুসরণ করেই সারি বেঁধে অন্যান্য পিঁপড়ারা সঠিক জায়গায় গিয়ে পৌঁছায়।
গোয়ার 'ফরেস্ট ইকোলজি রিসার্চ সেন্টার'-এর বিজ্ঞানীরা জানান, পিঁপড়ার সম্পূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা নির্ভর করে এই রাসায়নিক সংকেত ও স্পর্শের ওপর। অ্যান্টেনা ক্ষতিগ্রস্ত হলে পিঁপড়ার পক্ষে বেঁচে থাকাই অসম্ভব হয়ে পড়ে।
মূলত অসাধারণ ঘ্রাণভিত্তিক জিনগত বৈশিষ্ট্য, প্রাকৃতিক সার্চ ইঞ্জিনসম শুঁড় এবং নিখুঁত রাসায়নিক জিপিএস ব্যবস্থার যৌথ সক্ষমতা ব্যবহার করেই পিঁপড়ারা ঘরের যেকোনো কোণে থাকা মিষ্টির কণা সহজে শনাক্ত করতে পারে।
সূত্র: বিবিসি
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


