ব্যস্ত নগরজীবনে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ একে অপরের পাশ দিয়ে চলে যায়। কেউ জীবনের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার চিন্তায় ব্যস্ত, কেউ আবার নিজের ছোট্ট গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এই ব্যস্ততার মাঝেও কিছু মানুষ আছেন, যারা অন্যের জীবনে পরিবর্তনের আলো জ্বালানোর স্বপ্ন দেখেন। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মুখে হাসি ফোটানো, তাদের শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা এবং মানবিক মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেওয়ার এমনই একটি প্রচেষ্টার নাম ‘একলা চলো রে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়’।
অলাভজনক এই সংগঠনটির যাত্রা শুরু হয় ঢাকায়। পরবর্তী সময়ে ২০১৮ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এর কার্যক্রম শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংগঠনটি শুধু একটি উদ্যোগ হিসেবে নয়, বরং একটি মানবিক আন্দোলনের রূপ নিতে শুরু করেছে। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়াই এই সংগঠনের মূল লক্ষ্য।
বর্তমানে সংগঠনটি একটি নির্বাচিত কমিটির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। সম্প্রতি ‘একলা চলো রে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়’-এর জন্য ৯ সদস্যবিশিষ্ট একটি কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়েছে, যারা সংগঠনের বিভিন্ন কার্যক্রম সমন্বয় এবং পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছেন।
শুধু শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করাই নয়, শিশুদের সামগ্রিক বিকাশের বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছে সংগঠনটি। বর্তমানে সপ্তাহে দুদিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল স্টেশন প্ল্যাটফর্মে নিয়মিত ক্লাস নেওয়া হয়। সেখানে প্রায় ৬০ জন শিক্ষার্থী এবং ২৫ জন নিয়মিত শিক্ষক যুক্ত রয়েছেন। এসব শিক্ষার্থীর অনেকেই সমাজের বিভিন্ন সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের সন্তান। তাদের অনেকের জন্য নিয়মিত শিক্ষার সুযোগ পাওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাজ করছে ‘একলা চলো রে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়’।
সংগঠনটির শিক্ষাদান পদ্ধতি কেবল বইয়ের পাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীদের সামাজিক আচরণ, স্বাস্থ্যবিধি, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা এবং নৈতিক শিক্ষার বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে শেখানো হয়। কারণ শিক্ষার প্রকৃত অর্থ কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করা নয়, বরং একজন সচেতন ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠা।
বিশেষভাবে নারী শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সচেতনতার বিষয়েও কাজ করছে সংগঠনটি। নারী শিক্ষকদের মাধ্যমে ছাত্রীদের জন্য স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা-বিষয়ক সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। সমাজে এখনো অনেক বিষয়ে সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে। তাই শিশুদের ছোটবেলা থেকেই এসব বিষয়ে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
শিশুদের সৃজনশীল বিকাশেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রতি মাসে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। পাশাপাশি প্রতি সপ্তাহে চিত্রাঙ্কন, গান এবং নৃত্যের মতো বিষয় নিয়ে বিশেষ ক্লাস নেওয়া হয়। এর মাধ্যমে শিশুদের লুকিয়ে থাকা প্রতিভা বিকাশের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
শুধু শিক্ষার মধ্যেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখেনি সংগঠনটি। পড়াশোনা চালিয়ে যেতে কারো আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন হলে সহযোগিতা করা হয়। এছাড়া শিক্ষা উপকরণ, ঈদে পোশাক ও খাদ্যসামগ্রী এবং শীতকালে শীতবস্ত্র বিতরণের মতো কার্যক্রমও পরিচালিত হয়।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকার একটি নির্দিষ্ট এলাকায় সংগঠনটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তবে তাদের স্বপ্ন আরো বড়, তারা চায় এই কার্যক্রম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দিতে, যাতে আরো বেশি সুবিধাবঞ্চিত শিশু শিক্ষা ও মানবিক সহায়তার আওতায় আসতে পারে।
সংগঠনটির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে ‘একলা চলো রে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়’-এর সভাপতি রিদওয়ানউল্লাহ কাফী তানভীর বলেন, ‘একলা চলো রে’ প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই মানবিকতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে সমাজের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে। অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পাশে দাঁড়ানো, তাদের শিক্ষা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমরা সর্বদা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ও বিভিন্ন মানবিক উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমরা ইতিবাচক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করে চলেছি। আমরা বিশ্বাস করি, সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও আন্তরিকতার মাধ্যমে সমাজে টেকসই প্রভাব সৃষ্টি করা সম্ভব। ভবিষ্যতেও আমরা মানুষের কল্যাণে আমাদের কার্যক্রম আরো বিস্তৃত ও কার্যকর করার লক্ষ্যে কাজ করে যাব।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

