নারীর সুস্থতা ও মানসিক ভারসাম্য

ডা. মাহতাব হোসাইন মাজেদ

নারীর সুস্থতা ও মানসিক ভারসাম্য

বর্তমান সময়ে নারীদের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো মানসিক চাপ। একজন নারীকে একই সঙ্গে পরিবার, সন্তান, আত্মীয়স্বজন এবং কর্মজীবনের দায়িত্ব সামলাতে হয়। অনেক সময় নিজের মানসিক কষ্ট প্রকাশের সুযোগও থাকে না। এই বহুমুখী চাপের ফলে নারীদের মধ্যে দেখা দেয়—

* দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা।

বিজ্ঞাপন

* অনিদ্রা ও ঘুমের সমস্যা।

* হতাশা ও বিষণ্ণতা।

* আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া।

* অতিরিক্ত আবেগপ্রবণতা বা রাগ।

অনেক নারী নীরবে কষ্ট সহ্য করেন। সমাজে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতার অভাব থাকায় সমস্যাগুলো আরো জটিল আকার ধারণ করে।

হরমোনজনিত জটিলতা

নারীদের শরীর স্বাভাবিকভাবেই হরমোন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়।

এই পরিবর্তন অনেক সময় বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি করে। বর্তমানে অনেক নারী ভুগছেন—

* অনিয়মিত মাসিক।

* অতিরিক্ত বা কম রক্তক্ষরণ।

* থাইরয়েড সমস্যা।

* PCOS (পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম)।

* স্থূলতা ও ওজন বৃদ্ধি।

* ডায়াবেটিস ও বিপাকজনিত সমস্যা। অনেক নারী লজ্জা, ভয় বা অবহেলার কারণে সময়মতো চিকিৎসা নেন না।

ফলে ছোট সমস্যা ধীরে ধীরে বড় জটিল রোগে পরিণত হয়।

পুষ্টিহীনতা ও রক্তস্বল্পতা

নারীদের মধ্যে রক্তস্বল্পতা একটি ব্যাপক সমস্যা। বিশেষ করে, কিশোরী, গর্ভবতী এবং সদ্য মা হওয়া নারীরা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।

পুষ্টিহীনতার কারণে দেখা দেয়—

* শরীর দুর্বল হয়ে যাওয়া।

* মাথা ঘোরা।

* দ্রুত ক্লান্তি।

* কাজের শক্তি কমে যাওয়া।

* রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস। গ্রামীণ ও নিম্ন আয়ের পরিবারে নারীরা অনেক সময় পরিবারের সবাই খাওয়ার পর নিজের খাবার গ্রহণ করেন, যা অপুষ্টির অন্যতম কারণ।

পারিবারিক অশান্তি ও নির্যাতন

পরিবার নারীর নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে নারীরা পরিবারেই মানসিক বা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন।

সমস্যাগুলো হলো—

* স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতবিরোধ ও অশান্তি।

* কটুকথা ও অবমূল্যায়ন।

* সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাধীনতার অভাব।

* অর্থনৈতিক নির্ভরতার কারণে নির্যাতন সহ্য করা। অনেক নারী সামাজিক লজ্জা ও সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে এসব নির্যাতন সহ্য করেন, যা তাদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যকে ধ্বংস করে দেয়।

কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য ও চাপ

নারীরা কর্মক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করলেও এখনো বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। যেমন—

* একই কাজের জন্য কম বেতন।

* পদোন্নতিতে বাধা।

* কর্মস্থলে মানসিক চাপ।

* সহকর্মী বা কর্তৃপক্ষের হয়রানি।

অনেক নারীকে অফিসের পাশাপাশি ঘরের সব দায়িত্বও পালন করতে হয়। এই দ্বৈত চাপ তাদের জীবনে অতিরিক্ত মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তি সৃষ্টি করে।

অনলাইন হয়রানি

ডিজিটাল যুগে প্রযুক্তির সুবিধার পাশাপাশি নতুন ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। বর্তমানে নারীরা অনলাইনে বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছেন—

* ভুয়া আইডি দিয়ে বিরক্ত করা।

* ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্য চুরি।

* ব্ল্যাকমেইল ও হুমকি।

* অপমানজনক মন্তব্য। এর ফলে নারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারেও ভয় পান। অনেক ক্ষেত্রে আত্মসম্মানহানির কারণে মানসিক বিপর্যয় ঘটে।

নিরাপত্তাহীনতা ও সামাজিক ভয়

নারীদের জন্য নিরাপত্তাহীনতা একটি বড় সমস্যা। রাস্তা, গণপরিবহন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে অনেক নারী অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হন।

ইভটিজিং, কটূক্তি ও অশোভন আচরণ নারীদের স্বাধীন চলাফেরাকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে অনেক পরিবার মেয়েদের বাইরে যেতে বাধা দেয়, যা তাদের স্বাধীনতা ও আত্মনির্ভরশীলতা কমিয়ে দেয়।

বাল্যবিয়ে যৌতুক ও কুসংস্কার

এখনো সমাজে বাল্যবিয়ে একটি গুরুতর সমস্যা। অল্প বয়সে বিয়ে হলে মেয়েদের—

* শিক্ষা বন্ধ হয়ে যায়।

* শারীরিক ঝুঁকি বাড়ে।

* মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। এছাড়া যৌতুকপ্রথা, ছেলেমেয়ের বৈষম্য এবং নারীর মতামতকে গুরুত্ব না দেওয়ার সংস্কৃতি নারীর উন্নয়নের পথে বড় বাধা।

মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্যঝুঁকি

গর্ভাবস্থা নারীর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়। কিন্তু সঠিক যত্নের অভাবে অনেক সময় মা ও শিশুর জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।

ঝুঁকির কারণ—

* অপর্যাপ্ত পুষ্টি।

* নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার অভাব।

* শারীরিক বিশ্রামের ঘাটতি।

* অজ্ঞতা ও সচেতনতার অভাব।

* নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে চিকিৎসা, পুষ্টি ও পারিবারিক সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সমাধানের দিকনির্দেশনা

নারীর সমস্যা সমাধানে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

ক. স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি

নারীদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পুষ্টিকর খাদ্যগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

খ. মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়া

নারীদের মানসিক কষ্টকে গুরুত্ব দিয়ে শুনতে ও সমাধান করতে হবে।

গ. নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়ন

শিক্ষার মাধ্যমে নারীরা আত্মনির্ভরশীল ও সচেতন হয়ে উঠবে।

ঘ. নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা

রাস্তা, কর্মস্থল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

ঙ. অনলাইন নিরাপত্তাব্যবস্থা

সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর আইনপ্রয়োগ ও সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি।

চ. পারিবারিক সহযোগিতা

পরিবারে নারীদের প্রতি সম্মান, সমান অধিকার এবং সহযোগিতামূলক আচরণ নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...