গত সোমবার (২৭ জুলাই) ছিল বিশ্ব হেড-নেক ক্যানসার দিবস। দিবসটিতে ক্যানসার সম্পর্কে সচেতনতা, কী কী কারণে বা অভ্যাসে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে? কীভাবে এ অভ্যাস থামানো যায়? ক্যানসারের উন্মত্ততা কীভাবে বন্ধ করা যায়? এ রোগের প্রতিরোধের জন্য কী কী করা যেতে পারে? গণমানুষের ক্যানসার বিষয়ে সাধারণ ধারণার প্রসার, একেবারে শুরুতেই রোগ নির্ণয় করা, এ রোগের যথাযথ চিকিৎসা সম্পর্কে ধারণা এবং চিকিৎসার ফল ইত্যাদির ব্যাপারে আলোকপাত করা হয়েছে দিবসটিতে।
কোন ক্যানসারে কতজন আক্রান্ত হচ্ছেন, সেদিকে আমরা একটু আলোকপাত করব। বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো ক্যানসার রেজিস্ট্রি নেই। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার রিসার্চ অ্যান্ড হসপিটালের সর্বশেষ প্রকাশিত (২০১৫-১৭) প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, পুরুষদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ফুসফুসের ক্যানসার এবং নারীদের মধ্যে স্তন ক্যানসার। এ প্রতিবেদনে হেড-নেক ক্যানসারের বিভিন্ন অংশ আলাদাভাবে হিসাব করা হয়েছে।
হেড-নেক ক্যানসার বলতে শরীরের যেসব অংশের ক্যানসার বোঝায়, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে মুখ ও মুখগহ্বরের ক্যানসার, থাইরয়েড ক্যানসার, নাকের ক্যানসার, সাইনাসের ক্যানসার, কণ্ঠনালির ক্যানসার, গলনালির ক্যানসার, শ্বাসনালির ক্যানসার, খাদ্যনালির ক্যানসার, বিভিন্ন ধরনের লালাগ্রন্থির ক্যানসার, হেড-নেকের ত্বকের ক্যানসার এবং হেড-নেকের লসিকাগ্রন্থির ক্যানসার।
আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রথম ১০টি ক্যানসারের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে দুটি এবং আংশিকভাবে আরো দুটি হেড-নেক ক্যানসার রয়েছে। নারীদের ক্ষেত্রেও প্রথম ১০টি ক্যানসারের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে একটি এবং আংশিকভাবে আরো দুটি হেড-নেক ক্যানসার রয়েছে। অর্থাৎ, হেড-নেক অঞ্চলের সব ধরনের ক্যানসারের মোট সংখ্যা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার রিসার্চ অ্যান্ড হসপিটালের সর্বশেষ প্রকাশিত সারণি অনুযায়ী সর্বাধিক আক্রান্ত ক্যানসারগুলোর কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে।
এর বাইরে রয়েছে থাইরয়েড ক্যানসার। আন্তর্জাতিক এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী বিভিন্ন ধরনের থাইরয়েড রোগে আক্রান্ত এবং তাদের প্রায় ১০ শতাংশ থাইরয়েড ক্যানসারে আক্রান্ত। থাইরয়েড ক্যানসারের প্রাথমিক পর্যায়ের চিকিৎসা প্রধানত সার্জারি বা অপারেশন। আর আরো জটিল (অ্যাডভান্সড) থাইরয়েড ক্যানসারের ক্ষেত্রে সার্জারির পাশাপাশি রেডিওঅ্যাকটিভ আয়োডিন থেরাপি নিতে হয়। এ থেরাপি নিউক্লিয়ার মেডিসিন বিভাগে দেওয়া হয়।
বিপুলসংখ্যক এ রোগী স্বাভাবিকভাবেই প্রচলিত ক্যানসার হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যান না। এ কারণেই এসব রোগীর তথ্য ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার রিসার্চ অ্যান্ড হসপিটালের সর্বশেষ প্রকাশিত (২০১৫-১৭) প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
নিউক্লিয়ার মেডিসিন বিভাগের থাইরয়েড ডিভিশনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের নিউক্লিয়ার মেডিসিন বিভাগের সব সেন্টারে বছরে আনুমানিক ২২০০-২৫০০ রোগী থাইরয়েড ক্যানসারের চিকিৎসা নিতে আসেন। থাইরয়েড ক্যানসারের সব রোগী কিন্তু এখানে আসেন না। বিশেষত প্রাথমিক পর্যায়ের থাইরয়েড ক্যানসারের রোগীরা। কারণ তাদের এই থেরাপির দরকার হয় না। তা ছাড়া গভীরতর থাইরয়েড ক্যানসারের রোগীদের কেউ কেউ অপারেশনের পর এখানে রিপোর্ট করতে বললেও আসেন না। অবহেলা করেন। সব মিলিয়ে আমি মনে করি, যদি সঠিকভাবে হিসাব করা হয়, সব হেড-নেক ক্যানসারের সম্মিলিত সংখ্যা সর্বাধিক হবে আমাদের দেশে।
সরকারি ও বেসরকারি পরিষেবা
হেড-নেক ক্যানসারে আক্রান্ত হলে মানুষের কী নিদারুণ কষ্ট হয় এবং এর চিকিৎসা নিতে গিয়ে মানুষকে কী পরিমাণ ভোগান্তি পোহাতে হয়, তা আমরা সবাই পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারি না। একমাত্র ভুক্তভোগীরাই তা সত্যিকার অর্থে উপলব্ধি করতে পারেন। দেশে এ রোগে আক্রান্তদের যথাযথ চিকিৎসার সুযোগ খুবই অপ্রতুল। রোগাক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসাসেবা পাওয়া অনেকটাই দুঃসাধ্য।
অধিকাংশ সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে এ রোগের চিকিৎসাসুবিধা নেই। সরকারি হাসপাতালগুলোয় রোগীর অত্যধিক চাপ ও ভিড় রয়েছে। প্রয়োজনীয় জনবল এবং অবকাঠামোর অভাবও প্রকট। একটি বড় হেড-নেক সার্জারিতে ৮-১০ ঘণ্টা সময় লাগে। সারা দেশে এ রোগের বিশেষায়িত অপারেশন করেন আনুমানিক মাত্র ২৫ জন চিকিৎসক। বিভিন্ন কারণে রোগীরা দেরিতে এবং জটিল অবস্থায় চিকিৎসকের কাছে আসেন। ফলে চিকিৎসার মাধ্যমে তাদের সুস্থ করে তোলা অনেক ক্ষেত্রেই প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
বেসরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটিতে মাত্র এ ধরনের অপারেশন হয়। খরচও অত্যধিক। অপারেশনের পর রেডিওথেরাপির অবস্থা আরো ভয়াবহ। রোগীর তুলনায় রেডিওথেরাপি সেন্টারের সংখ্যা অনেক কম। ফলে রেডিওথেরাপি শুরু করতে অনেক দেরি হয়। এতে রোগ আবার ফিরে আসতে পারে অথবা রোগীকে কেমোথেরাপির কষ্ট সহ্য করতে হয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই রোগী আর পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেন না।
হেড-নেক ক্যানসারের সবচেয়ে বড় কষ্ট ও ভোগান্তি হলো, এটি শরীরের এমন একটি অংশে হয়, যা দৃশ্যমান। গভীর পর্যায়ের ক্যানসার দ্রুতই মানুষের চেহারায় বিকৃতি আনে, তীব্র যন্ত্রণা দেয় এবং কষ্টদায়ক দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে। এটি সুমধুর কণ্ঠস্বর নষ্ট করে দেয় এবং খাদ্যগ্রহণ ব্যাহত করে। ফলে সমাজ ও পরিবারও অনেক সময় রোগীকে স্বাভাবিক জীবনে গ্রহণ করতে পারে না।
অন্যদিকে, একটু সতর্ক থাকলে এ রোগ একেবারে প্রাথমিক পর্যায়েই ধরা পড়ে। প্রাথমিক পর্যায়ের হেড-নেক ক্যানসারের চিকিৎসা তুলনামূলকভাবে সহজ, ব্যয়ও কম এবং ফল অত্যন্ত ভালো। এ কারণেই দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
প্রতিরোধে করণীয় কী
আন্তর্জাতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতিবছর বিশ্বে এক কোটির বেশি মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন। প্রতি পাঁচজনের মধ্যে তিনজন প্রাথমিক উপসর্গগুলো উপেক্ষা করেন। অথচ তা না করলে তাদের সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা ছিল। যতই চিকিৎসাসুবিধা থাকুক, ক্যানসার একবার হলে এর ভোগান্তি ও কষ্ট অনেক। তাই প্রতিরোধই সর্বোত্তম উপায়।
সাধারণ খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনতে হবে। চর্বি ও মিষ্টিজাতীয় খাবার কম খেতে হবে। খাদ্যতালিকায় ফলমূল ও সবজির পরিমাণ বাড়াতে হবে। ধূমপান সম্পূর্ণ ত্যাগ করতে হবে। মদপান পরিহার করতে হবে। পরিবেশ দূষণ যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে। পান-তামাক বর্জন করতে হবে এবং পরিশীলিত যৌন জীবনযাপন করতে হবে।
লেখক : হেড অ্যান্ড নেক সার্জারি বিভাগ
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



