কাল নতুন সরকারের প্রথম বাজেট ঘোষণা করা হবে। বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবার স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে, এছাড়া স্বাস্থ্যের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আজ আমরা কথা বলেছি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত-এর সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এন আই মানিক
এন আই মানিক : স্যার, আপনার কাছে আমার প্রথম প্রশ্ন, স্বাস্থ্য বাজেট জিডিপির মাত্র ২.৩ শতাংশ—এই স্বল্প বরাদ্দের প্রধান প্রভাব কী কী?
ড. এম এ মুহিত : ধন্যবাদ। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, কারণ স্বাস্থ্য বাজেট নিয়ে আমরা দীর্ঘদিন ধরে কথা বলছি। স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য যেকোনো কর্মসূচি নিলেই আমাদের বাজেটের প্রয়োজন এবং বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। এখানে আমাদের স্বাস্থ্য সমস্যা, জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব—সেগুলো রয়েছে। সেই তুলনায় আমাদের স্বাস্থ্যের বাজেট অপ্রতুল। আপনারা জানেন, আমাদের নির্বাচনি ইশতেহারে আমরা অগ্রাধিকার হিসেবে স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার এবং উন্নয়নের কথা ঘোষণা করেছি। আমরা একটা সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই এবং সেই ইশতেহারে পরিষ্কার বলেছি, স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বিপুলভাবে বৃদ্ধি করা হবে, প্রতি বছর ক্রমাগত এটা বৃদ্ধি করে শতকরা পাঁচ ভাগে নিয়ে যাওয়া হবে। এরই মধ্যে আপনারা জানেন, আগামী ১১ তারিখে আমাদের নতুন সরকারের—নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের প্রথম বাজেট ঘোষণা করা হবে। আমরা বিভিন্ন প্রকল্প প্রণয়ন করেছি স্বাস্থ্য খাতে এবং সেখানে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বিগত বছরগুলোর তুলনায় স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে। তবে এই প্রসঙ্গে আরেকটি কথা না বললেই নয়, বিগত বছরগুলোয় দেখা গেছে, আমাদের সক্ষমতা, আমাদের যে বাজেটটা আসে, সেই বাজেটকে ব্যবহার করে প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। প্রতি বছরই দেখা যেত, শেষ পর্যন্ত বছর শেষে যে বাজেটটুকু দেওয়া হতো, তারও প্রায় শতকরা ২০-২৫ ভাগ আমরা ব্যয় করতে পারতাম না যথাসময়ে। এবার বছরের শুরু থেকেই একদিকে যেমন বাজেট বাড়ানো হয়েছে, পাশাপাশি এরই মধ্যে সেই বাজেটকে ব্যবহার করে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড যথাসময়ে পরিচালনার জন্য সক্ষমতা বৃদ্ধি করছি এবং বছরের শুরু থেকে আমরা মনিটর করব যেন যথাযথ সময়ে এই বাজেটগুলো নিয়ে যে পরিকল্পনা যে প্রকল্পগুলোর জন্য, সেগুলো বাস্তবায়িত হয়। সুতরাং বাস্তবায়নটা বাজেটের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।
এন আই মানিক : ডাক্তার-নার্স অনুপাত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মান অনুযায়ী এখনো অপ্রতুল। এটি সমাধানের কার্যকর পদক্ষেপ সরকার কী নিয়েছে?
ড. এম এ মুহিত : স্বাস্থ্য খাতে সেবা প্রদান করার ক্ষেত্রে সারা বিশ্বেই দেখা যায়, যে বাজেটের প্রয়োজন হয়, সেই বাজেটের অর্ধেকটাই যায় কিন্তু জনবলে। কারণ স্বাস্থ্যসেবা দক্ষ জনবল ছাড়া সম্ভব নয়। সেই জনবলে চিকিৎসকদের বিশাল ভূমিকা রয়েছে, এটি সত্যি; কিন্তু সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যব্যবস্থার অগ্রগতি সাধন শুধু চিকিৎসকের ওপর নির্ভর করে হবে না। একই সঙ্গে নার্সদের ভূমিকা রয়েছে, তারা দিনরাত সেবা দেন। মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, প্যারামেডিক এবং হেলথ ওয়ার্কার, প্যাথলজিস্ট, টেকনিশিয়ান—এসব হেলথ ক্যাডারের মানুষদের নিয়ে আমাদের হেলথ ক্যাডারে কী ধরনের জনগোষ্ঠী, কী ধরনের ক্যাডার আমাদের লাগবে, কী রেশিওতে লাগবে আমাদের জনগোষ্ঠীর তুলনায়, সেগুলো নিয়ে আমরা কিছু স্টাডি করেছি। আমাদের যে সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশের পরিকল্পনা, সেটার ভিত্তিই হবে প্রাইমারি হেলথ কেয়ার এবং সেই লক্ষ্যে আমরা প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে জোরদার করার জন্য এক লাখ নতুন জনবল নিয়োগ দেব। বর্তমানে প্রায় ৪০ হাজার মাঠকর্মী আমাদের আছে। এই জনস্বাস্থ্যকর্মীরা একবারে তৃণমূল প্রান্তিক পর্যায়ে জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে যাবে। ডাক্তার ও নার্সের রেশিও ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যারা স্বাস্থ্য নিয়ে গবেষণা ও পলিসি নির্ধারণ করে, তাদের রিকোমেনডেশন অনুযায়ী ডাক্তারের তুলনায় তিন থেকে পাঁচ গুণ নার্স থাকার কথা। আমাদের দেশে আমরা সেই অনুপাতে নার্স দিতে পারিনি। সরকারি-বেসরকারি দুই ক্ষেত্রেই দেখা যায়, নার্স এবং ডাক্তারের অনুপাত মোটামুটি ১:১। অর্থাৎ আমাদের নার্সিং পেশায় ব্যাপক প্রসারের প্রয়োজন রয়েছে। আমাদের বর্তমানে যে নার্সের সংখ্যা আছে, অন্তত তার তিনগুণ নার্স প্রয়োজন। সরকারিভাবেও নতুন ডাক্তার ও নার্সদের নিয়োগের জন্য আমরা পরিকল্পনা করছি। বেসরকারি পর্যায়েও লাগবে। সবচেয়ে বড় কথা, নার্সিং এডুকেশন ও নার্সিং স্কুলগুলোকে সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে আরো জোরদার করতে হবে, যাতে আরো অধিক সংখ্যক নার্স আমরা তৈরি করতে পারি এবং অধিক দক্ষতা নিয়ে যেন তারা বের হতে পারে, যাতে আমাদের এই পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে তারা এগিয়ে নিতে পারে।
এন আই মানিক : নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ (NCD) এখন মৃত্যুর ৭০ শতাংশ কারণ। প্রাইমারি লেভেলে ডায়াবেটিস ও হাই প্রেশার স্ক্রিনিং কতটুকু হয়?
ড. এম এ মুহিত : নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ ও অসংক্রামক ব্যাধি সারা বিশ্বেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নন-কমিউনিকেবল ডিজিজকেই সারা পৃথিবীতে আমাদের স্বাস্থ্য সংকটের একটা প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই রোগগুলোর ভেতরে হাইপারটেনশন ও ডায়াবেটিস—এই দুটো অত্যন্ত কমন এবং নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ। কমিউনিকেবল ডিজিজ, যেমন ইনফেকশাস ডিজিজ, সেগুলার ক্ষেত্রে আমরা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করি; আমরা রোগ প্রতিরোধের চেষ্টা করি যাতে জীবাণুর সংক্রমণ না হয়। নন-কমিউনিকেবল ডিজিজগুলো জীবাণু দিয়ে সাধারণত ঘটে না। এগুলোর প্রতিরোধের ক্ষেত্রে আমাদের লাইফস্টাইল মডিফিকেশন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ডায়াবেটিস ও হাইপারটেনশনের মতো সব রোগেই আমরা চাই, আমাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার যে কর্মসূচি আমরা গ্রহণ করতে যাচ্ছি, সেটার অংশ হিসেবে স্বাস্থ্যকর্মীরা ঘরে ঘরে গিয়ে এই ডায়াবেটিস ও হাইপারটেনশনের বিষয়ে মানুষকে সচেতন করবে। যাদের এই অসুখটা হয়েছে, তাদের যথাযথ চিকিৎসা দেবে এবং সার্বিকভাবে জাতীয়ভাবে আমরা চাচ্ছি, এই অসংক্রামক ব্যাধির ব্যাপারে জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি হোক। আমাদের যে লাইফস্টাইল মডিফিকেশন দরকার, যেমন খাবারের ক্ষেত্রে কিছু জিনিস খেয়াল করা, কায়িক শ্রম করা, প্রতিদিন অন্তত ৪০ মিনিট হাঁটা ও ধূমপান না করা—এই বিষয়গুলোয় জোর দিলে নন-কমিউনিকেবল ডিজিজের কারণে মৃত্যুর হার অনেক কমবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।
এন আই মানিক : ডেঙ্গু প্রতি বছরই মহামারি হয়, এটা আমাদের দেশে হয়েই আসছে। আপনাকে দেখছি ডেঙ্গু নিয়ে অনেক প্রোগ্রাম করেছেন । আমরা কি এবার আশা করতে পারি ডেঙ্গু মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে?
ড. এম এ মুহিত : ডেঙ্গু নিয়ে এরই মধ্যে আমরা কাজ শুরু করে দিয়েছি। বিগত বছরগুলোয় আমরা দেখেছি ডেঙ্গুর যখন সিজন আসে, হাজার হাজার মানুষ এতে আক্রান্ত হয়। তাদের হসপিটালাইজ করা, যথাসময়ে চিকিৎসা দেওয়া এবং তাদের মধ্যে যারা হেমোরেজিক ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়, তাদের জীবনের ঝুঁকি থাকে। আমরা এবার সে কারণেই জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিষয়টাকে দেখেছি এবং আমরা কিন্তু একটু আগে থেকেই এবার কাজ শুরু করেছি। এখনো সেভাবে ডেঙ্গুর প্রকোপ হয়নি, কিন্তু এরই মধ্যে আপনারা দেখেছেন, আমরা মন্ত্রণালয়ে বেশ কয়েকটি সমন্বয় সভা করেছি, সিটি করপোরেশন ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ—তাদের সঙ্গে আমরা সভা করেছি। আমরা সোসাইটি অব মেডিসিন, যারা মেডিসিন ডাক্তারদের সংগঠন, তাদের সঙ্গে কাজ করছি। তারা কিছু গাইডলাইন তৈরি করেছেন এবং সেই গাইডলাইনগুলোর ভিত্তিতে এরই মধ্যে আমরা ছয়টি বিভাগে ও ঢাকায় চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছি। আমাদের এবারের ডেঙ্গু প্রতিরোধের লক্ষ্য হচ্ছে, একদিকে ডেঙ্গু-আক্রান্ত হয় যে মানুষগুলো, তাদের সংখ্যা কমানোর চেষ্টা করা। তবে ডেঙ্গু আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা কমাতে চিকিৎসকদের ভূমিকা খুব কম। এই জায়গায় আমাদের কাজ করতে হবে, যেন চারপাশের জায়গাগুলো আমরা পরিচ্ছন্ন রাখি এবং জনগণকে সম্পৃক্ত করতে পারি। জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হলে তারা নিজেদের বাসা ও কর্মস্থল পরিষ্কার রাখবে, তাহলেই কিন্তু আমরা ডেঙ্গুর সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারব। পাশাপাশি যারা আক্রান্ত হবে তারা যেন সঠিক চিকিৎসা পায়, দ্রুত চিকিৎসা পায়, যাতে তাদের দ্রুত শনাক্ত করা যায়, সে ব্যাপারেই আমরা চিকিৎসকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছি। আমরা আশা করছি, এবার সবাই মিলে যদি আমরা চেষ্টা করি, তবে সামাজিক সচেতনতা এবং চিকিৎসকদের যথাসময়ে চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা—এ দুটির সমন্বয়ের মাধ্যমে আমরা ডেঙ্গুকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারব।
এন আই মানিক : জি স্যার। এ সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হচ্ছে হেলথ কার্ড, যা কিনা আমাদের জন্য অভূতপূর্ব। এটাকে কীভাবে বাস্তবায়ন করবেন এবং এটা হেলথ সিস্টেমের ওপরে কী রকম প্রভাব ফেলবে?
ড. এম এ মুহিত : আমরা আমাদের নির্বাচনি ইশতেহারে হেলথ কার্ডের কথা বলেছি—‘ই-হেলথ কার্ড’। প্রথমেই বুঝতে হবে আমরা আরো বেশ কিছু কার্ড দিচ্ছি; যেমন আমরা ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলেছি, আমরা কৃষি কার্ডের কথা বলেছি। অন্য কার্ডগুলো থেকে এই হেলথ কার্ড একটু ভিন্ন রকমের। আমি যে কথাটা বলি, হেলথ কার্ডকে আপনাদের চিন্তা করতে হবে এটা কোনো সাধারণ কার্ডই নয়—এটা হচ্ছে একটি ‘ই-হেলথ সিস্টেম’। এই হেলথ কার্ডের মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে একবারে বিশেষায়িত যে চিকিৎসা, সেই চিকিৎসা পর্যন্ত দেশের যে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা—সেখানে একটা রেফারেল নেটওয়ার্ক তৈরি করতে চাই। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে এবং কিছু কিছু মধ্যম আয়ের দেশগুলোতেও আমরা দেখি যে একটা রেফারেল সিস্টেম আছে। আমাদের দেশে কিন্তু কার্যকর কোনো রেফারেল পদ্ধতি নেই। অর্থাৎ আপনার জ্বর হলে আপনি আপনার এলাকার সরকারি হাসপাতালটায় যেতে পারেন, আবার ঢাকা মেডিকেল কলেজেও চলে আসতে পারেন। এর ফলে যেটা হয়, বড় হাসপাতালগুলোয় সক্ষমতার তুলনায় চারগুণ বা পাঁচগুণ বেশি রোগী চলে আসে। সেখানে ডাক্তাররা হিমশিম খাচ্ছেন এবং সব ধরনের সংকট দেখা দিচ্ছে। আমরা এই ই-হেলথ কার্ডের মাধ্যমে প্রত্যেক নাগরিকের জন্য একটা কার্ড বা আইডি নিশ্চিত করব। এবং আমাদের প্রাইমারি হেলথ সেন্টার যেগুলো থাকবে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা পর্যায়ের যে হাসপাতালগুলো—এগুলো সবকিছুকে আমরা ডিজিটালাইজ করব। ফলে রোগী যখন এই হেলথ কার্ড নিয়ে হাসপাতালগুলোতে যাবে, সঙ্গে সঙ্গে তার মেডিকেল রেকর্ডসসহ সবকিছু এই সিস্টেমে চলে আসবে।
এতে সুবিধা কী হবে? অনেকগুলো সুবিধা। একটা হচ্ছে রোগী জানবে তার অতীতের এবং বর্তমানের সব চিকিৎসার রেকর্ডগুলো ওখানে থাকবে। পাশাপাশি এই কার্ডের মাধ্যমে আমরা যে রেফারেল দেব—মনে করেন আপনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়েছেন, আপনার এমন একটা অসুখ হয়েছে যে আপনাকে জেলা হাসপাতালে পাঠাতে হবে, সেটা আমরা ই-হেলথ কার্ডের মাধ্যমে সিস্টেমে ইন্ডিকেট করতে পারব। ফলে রেফারেল নেটওয়ার্কটা কাজ করবে। আরেকটা বড় সুবিধা—অনেক সময় বলা হয় মাঝে মাঝে অপ্রয়োজনীয় ওষুধ লেখা হয় প্রেসক্রিপশনে। এই ই-হেলথ কার্ড সিস্টেমের মাধ্যমে কিন্তু ইলেকট্রনিক মেডিকেল রেকর্ডে সব রোগীর যে ওষুধগুলো লেখা হচ্ছে, সেই প্রেসক্রিপশনগুলো ওখানে সংরক্ষিত থেকে যাবে। ফলে আমরা আশা করছি, একটা স্বচ্ছতা বা ট্রান্সপারেন্সি তৈরি হবে, ডাক্তাররা এবং রোগীরা জানতে পারবেন তারা কী চিকিৎসা পাচ্ছেন এবং সেখানে অপ্রয়োজনীয় ওষুধ লেখার হারটা কমে যাবে বলে আমাদের বিশ্বাস। এই ই-হেলথ কার্ডের মাধ্যমে আমরা চাচ্ছি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজ করতে, যাতে এই স্বাস্থ্যব্যবস্থায় রোগীর এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাতায়াত থেকে শুরু করে তার ওষুধের বৃত্তান্ত, তার অসুখের বৃত্তান্ত—এ সবকিছুর আধুনিকায়ন আমরা করতে পারি।
এন আই মানিক : সম্প্রতি ৭৯তম ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলি জেনেভাতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আপনি বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এ সম্পর্কে একটু জানতে চাই।
ড. এম এ মুহিত : ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশন—বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রতি বছর যে সবচেয়ে বড় সম্মেলনটি আয়োজন করে, সেটি হচ্ছে ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলি। এবার ছিল এই ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলির ৭৯তম সম্মেলন। সেখানে আমি বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতা হিসেবে ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে অংশগ্রহণ করি এবং বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করি। সেখানে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে যে অর্জনগুলো, সেগুলোকে তুলে ধরেছি। আমাদের একজন চিকিৎসক সেখানে পুরস্কৃত হয়েছেন। পাশাপাশি বর্তমানে স্বাস্থ্য খাতে বৈশ্বিক যে আলোচনাগুলো হচ্ছে, সেখানে আমরা আমাদের মতামতগুলো তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছি। আমার সঙ্গে সেখানে প্রায় আটজন বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছে। সেখানে আমরা এই দেশগুলোর সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে—বিশেষ করে রোগী, ওষুধ ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা এবং মতবিনিময় হয়েছে। পাশাপাশি বেশ কয়েকটি মাল্টিল্যাটারাল এজেন্সি, আন্তর্জাতিক যে স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো কাজ করে, যেমন গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন (GAVI), তারপর ইউনিসেফ (UNICEF)—এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। তারা আমাদের এখানে কাজ করে, তাদের ওখানকার হেডকোয়ার্টার্সে তাদের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমাদের বৈঠক হয়েছে। সেখানে আমরা আমাদের টিকাদান কর্মসূচিতে ‘গ্যাভি’ যে সহায়তা করে, সেটা সম্পর্কে আলোচনা করেছি। আগামীতেও এই সহায়তাগুলো যেন অব্যাহত থাকে, সে ব্যাপারে আমরা অ্যাডভোকেসি করেছি। এর পাশাপাশি ওখানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম একটি হেলথ কনফারেন্সের আয়োজন করে, যেখানে আমন্ত্রিত বক্তা হিসেবে তারা আমাকে দুটো সেশনে বক্তব্য রাখার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। আমি সেখানে বক্তব্য রেখেছি; পাশাপাশি আরেকটি সেশনে আন্তর্জাতিক যে প্যানেল ছিল, সেই প্যানেলের অন্যতম প্যানেলিস্ট হিসেবে আমি ডিসকাশনে অংশ নিয়েছি। আর এ বছর আমাদের প্রতিনিধিদল যে কাজটি করেছে—এই ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলির পাশাপাশি ওই একই সময়ে সেখানে বেশ কিছু বিষয়ভিত্তিক সাইডলাইন বৈঠক, মিটিং এবং ওয়ার্কশপের আয়োজন করা হয়। প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আমরা এই ধরনের একটি ওয়ার্কশপের হোস্ট করি, যার মূল বিষয় ছিল ‘ডিজ্যাবিলিটি ইনক্লুসিভ হেলথ সিস্টেম’ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আমাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করা। বিভিন্ন দেশের এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা সেই ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণ করেন এবং আমাদের কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেন। এই কাজগুলোর মাধ্যমে, যাকে ‘হেলথ ডিপ্লোম্যাসি’ বা স্বাস্থ্য কূটনীতি বলা হয়—আমরা বৈশ্বিক স্বাস্থ্য প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থানটাকে জোরালো করেছি এবং আগামী দিনেও এই বৈশ্বিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে অনেকের কাছ থেকেই আশ্বাস পেয়েছি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

