ঘুম থেকে ওঠার জন্য অ্যালার্ম সেট করা অনেকের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। তবে নিয়মিত কিছু অভ্যাস গড়ে তুললে অ্যালার্ম ছাড়াও নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে ওঠা সম্ভব। এর জন্য পর্যাপ্ত ঘুমের পাশাপাশি নির্দিষ্ট রুটিন মেনে চলা, আলো নিয়ন্ত্রণ এবং ঘুমের আগে শরীর ও মনকে প্রস্তুত করা গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যালার্ম ছাড়াই ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস শরীরের স্বাভাবিক জৈবঘড়ির সঙ্গে সামঞ্জস্য তৈরি করতে পারে। এতে সকালে ঘুমঘুম ভাব কমার পাশাপাশি মেজাজও ভালো থাকতে পারে।
নিজের ঘুমের ছন্দ বুঝুন
শরীর ও মস্তিষ্ক ঠিকভাবে কাজ করার জন্য পর্যাপ্ত ঘুম প্রয়োজন। সাধারণভাবে একজন প্রাপ্তবয়স্কের প্রতি রাতে সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমানো উচিত। তবে সবার ঘুমের প্রয়োজন এক নয়।
ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস ডালাসের সেন্টার ফর ব্রেইন হেলথের সহকারী অধ্যাপক ও স্লিপ ইনোভেশন ল্যাবসের সহযোগী পরিচালক ইটি বেন সাইমন বলেন, আট ঘণ্টা ঘুমকে মাঝামাঝি মান হিসেবে ধরা যায়। কেউ সাত ঘণ্টা ঘুমিয়েও ভালো থাকতে পারেন, আবার কারো ৯ ঘণ্টা প্রয়োজন হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যালার্ম ছাড়া ঘুম থেকে ওঠার জন্য ছুটির সময়টি কাজে লাগানো যেতে পারে। এমন এক সপ্তাহ বেছে নেওয়া যায়, যখন সকালে নির্দিষ্ট সময়ে ওঠার তাড়া নেই। এতে নিজের স্বাভাবিক ঘুম ও জাগরণের সময় সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।
তবে শুধু পর্যাপ্ত ঘুমই নয়, প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুম থেকে ওঠাও গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের স্লিপ অ্যান্ড সার্কাডিয়ান রিসার্চ ল্যাবের সহপরিচালক হেলেন বার্গেস বলেন, এমন সময়ে ঘুমাতে যেতে হবে, যাতে প্রয়োজনীয় সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুম পূরণ করা যায়। নিয়মিত এই রুটিন শরীরকে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত করে তোলে।
আলো গুরুত্বপূর্ণ
ঘুম ও জাগরণের সময় ঠিক করতে আলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রাকৃতিক আলো শরীরকে ঘুম ও জেগে ওঠার সংকেত দেয়।
রিজেন্ট ইউনিভার্সিটি লন্ডনের মনোবিজ্ঞানী ও ঘুমবিষয়ক গবেষক আনা জয়েস বলেন, সার্কাডিয়ান ঘড়ির সবচেয়ে বড় নিয়ন্ত্রক হলো আলো। আলো মেলাটোনিনের নিঃসরণ কমিয়ে শরীরকে জানায় যে জেগে ওঠার সময় হয়েছে।
সকালের উজ্জ্বল আলো শরীরে সেরোটোনিনের মাত্রা বাড়াতেও সহায়তা করতে পারে। এর ফলে মেজাজ ভালো থাকতে পারে।
রাতে ঘুমের পরিবেশ অন্ধকার রাখা ভালো। ব্ল্যাকআউট পর্দা বা আই মাস্ক ব্যবহার করা যেতে পারে। সকালে ঘুম থেকে উঠে পর্দা সরিয়ে আলো ঘরে ঢুকতে দিলে শরীরে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বাড়ে। এতে শরীর সজাগ ও কর্মপ্রস্তুত হতে শুরু করে।
বেন সাইমনের ভাষায়, সকালের আলো শরীরের জৈবঘড়িকে জানিয়ে দেয়, ‘এটাই আমার দিনের শুরু।’
ঘুমের আগে শান্ত হওয়ার রুটিন
যে সময়ে ঘুমাতে চান, তার প্রায় দুই ঘণ্টা আগে থেকে শরীর ও মনকে ঘুমের জন্য প্রস্তুত করা ভালো। এ সময় একটি নির্দিষ্ট শান্ত হওয়ার রুটিন তৈরি করা যেতে পারে।
এটি হতে পারে ত্বকের যত্ন নেওয়া, দাঁত ব্রাশ করা কিংবা আরামদায়ক পোশাক পরা। প্রতিদিন একই ধরনের রুটিন অনুসরণ করলে শরীর ধীরে ধীরে বুঝতে পারে যে ঘুমানোর সময় ঘনিয়ে এসেছে।
এ সময় ঘরের আলোও কমিয়ে দেওয়া উচিত। কম আলো শরীরকে মেলাটোনিন তৈরির সংকেত দেয় এবং ঘুমের জন্য প্রস্তুত করে।
তাপমাত্রার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। রাতে শরীরের মূল তাপমাত্রা কিছুটা কমে যায়। অতিরিক্ত গরম থাকলে ঘুমাতে বা ঘুম ধরে রাখতে সমস্যা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ফ্যান বা এসি আরামদায়ক তাপমাত্রায় রাখা এবং পাতলা পোশাক বা চাদর ব্যবহার করা যেতে পারে।
স্মার্টফোনে লাগাম
ঘুমের ক্ষেত্রে বড় বাধাগুলোর একটি স্মার্টফোন। ফোনের নীল আলো রাতের বেলায় মস্তিষ্কে বিভ্রান্তিকর সংকেত পাঠাতে পারে। তবে এর চেয়েও বড় সমস্যা হতে পারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ সময় ধরে স্ক্রল করা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীকে দীর্ঘ সময় ধরে প্ল্যাটফর্মে রাখতে তৈরি করা হয়। ফলে ঘুমানোর সময়ও অনেকে ফোন ব্যবহার করতে থাকেন।
২০২৫ সালের এক বিশ্লেষণে ৪৫ হাজার নরওয়েজীয় শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত জরিপে অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহারের সঙ্গে খারাপ ঘুমের সম্পর্ক পাওয়া যায়।
বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তাদের বিকাশমান শরীর ও মস্তিষ্কের জন্য অন্য বয়সিদের তুলনায় বেশি ঘুম প্রয়োজন।
বেন সাইমন বলেন, তরুণদের মধ্যে ঘুমের সমস্যার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যার একটি শক্তিশালী সম্পর্ক দেখা যায়।
তার মতে, কিশোর-কিশোরীদের অন্তত ৯ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। কিন্তু প্রায় ৭০ শতাংশ কিশোর-কিশোরী সাত ঘণ্টাও ঘুমায় না।
ঘুমের আগে ফোন ব্যবহার কমাতে অ্যাপ-ব্লকিং ব্যবস্থা ব্যবহার করা যেতে পারে। ফোনের গ্রেস্কেল মোড চালু করলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছবি কম আকর্ষণীয় মনে হতে পারে।
খাবার ও ক্যাফেইনের দিকেও নজর
শরীরের বিপাকক্রিয়াও সার্কাডিয়ান ছন্দকে প্রভাবিত করে। তাই ক্যাফেইন গ্রহণ সীমিত করা এবং নির্দিষ্ট সময়ে খাবার খাওয়ার অভ্যাস করা ভালো।
ঘুমানোর অন্তত তিন ঘণ্টা আগে রাতের খাবার শেষ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। অ্যালকোহলও যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন হেলেন বার্গেস।
তিনি বলেন, অ্যালকোহল দ্রুত ঘুমিয়ে পড়তে সহায়তা করতে পারে। তবে পরে ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায়। এটি এমন একটি ঘুমের পর্যায় কমিয়ে দেয়, যা শেখার প্রক্রিয়া, স্মৃতি সংরক্ষণ ও মস্তিষ্কের কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সময়সূচি বদলাতে হবে ধীরে
জীবনের নানা ঘটনা ও ব্যস্ততার কারণে নিয়মিত ঘুমের রুটিন ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। মানসিক চাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা দৈনন্দিন কাজের সময়সূচিও ঘুমের ওপর প্রভাব ফেলে।
তাই ঘুমের সময়সূচি পরিবর্তন করতে হলে ধীরে ধীরে তা করা উচিত। হেলেন বার্গেসের পরামর্শ, ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার সময় প্রতিদিন প্রায় ৩০ মিনিট করে পরিবর্তন করা যেতে পারে। কাঙ্ক্ষিত সময়ে পৌঁছানো পর্যন্ত এভাবে সময় এগিয়ে নিতে হবে। এরপর সেই সময়সূচি ধরে রাখার চেষ্টা করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যালার্ম ছাড়া ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস এক দিনে তৈরি হয় না। শরীরের সার্কাডিয়ান ব্যবস্থা ধীরে পরিবর্তিত হয়। তাই নিজের স্বাভাবিক ঘুমের ছন্দ বুঝে ধৈর্য ধরে রুটিন তৈরি করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বার্গেসের ভাষায়, ঘুম কোনো অন-অফ সুইচের মতো কাজ করে না। এটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা একটি প্রক্রিয়া।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

