আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

উদ্যোক্তা গড়ার কারিগর জান্নাত

ফিয়াদ নওশাদ ইয়ামিন

উদ্যোক্তা গড়ার কারিগর জান্নাত

স্বপ্ন দেখতে শেখান, সাহস জোগান, গড়েন নতুন পথ—তার উদ্যোগে অসংখ্য তরুণ ও নারী আজ নিজের পরিচয়ে দাঁড়িয়ে, নতুন করে বাঁচতে শিখেছেন।

বিজ্ঞাপন

পথচলা শুরু : জন্ম ঢাকার খিলক্ষেত এলাকায়। জান্নাতুল ফেরদৌস জান্নাতের জীবনের গল্পটা শুরু হয়েছিল একেবারে সাধারণভাবে। তবে আজ সেটা অনুপ্রেরণার নতুন এক অধ্যায়। নিজের সংগ্রাম থেকেই শিখেছেন—উন্নতির জন্য শুধু ডিগ্রি নয়, দরকার স্বপ্ন, সাহস আর একটি সহায় হাত। আজ সেই সহায় হাত তিনি বাড়িয়ে দিচ্ছেন অন্য নারীদের দিকে। তার জীবনের শুরুটা খুব সহজ ছিল না। জন্ম থেকেই হার্টের জটিলতা তার চলার পথ কঠিন করে তোলে। চাকরি করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে বেশিদিন করা হয়নি। তবে জীবন থেমে থাকেনি। নিজের চারপাশে মানুষজনের উৎসাহ, ভালোবাসা আর সহানুভূতি তাকে সাহস দিয়েছে, অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। একসময় অনলাইনে বসে দেখতে পান, কেউ একজন অন্যকে কাজ শেখাচ্ছেন—ঠিক তখনই তার মনে হয়, ‘আমি কেন পারব না?’ সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয় তার নতুন পথচলা।

পরিবার নয়, নিজের শক্তিই ভরসা : প্রতিটি সফল মানুষ জানেন, সব পরিবার এক রকম হয় না। জান্নাত জানতেন—সবাই পরিবারের সাপোর্ট পায় না, বিশেষ করে নারীরা। তাই তিনি নিজের অর্থ ও শ্রম দিয়ে একেকজন নারীর ভেতরের আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলছেন। তিনি বলেন, ‘আমি এমন নারীদের নিয়ে কাজ করি, যারা নিজের চেষ্টায় কিছু করতে চান, যাদের পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই, কিন্তু নিজেই দাঁড়াতে চান।’

আত্মশিক্ষায় এগিয়ে চলা : কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই জান্নাত নিজেই শিখতে শুরু করেন বিভিন্ন কাজ। ইউটিউব, ফেসবুক এবং বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যম ঘেঁটে কীভাবে উদ্যোক্তা হওয়া যায়, তা নিজেই রপ্ত করেন।

তিনি বিশ্বাস করেন, কোনো কিছুই সহজ নয়। কিন্তু কঠিনকে একবার করলে, সহজের রাস্তা আর লাগবে না। নিজের গন্তব্য খুঁজে নিতে তিনি কখনো কারো মুখাপেক্ষী হননি। বরং নিজের চেষ্টাতেই এগিয়ে গেছেন। তার লক্ষ্য ছিল একটাই—একটা পরিচয়, যেটা হবে শুধু তার নিজের।

নিজের পরিচয়ে চিনে নেওয়ার লড়াই: জান্নাত বলেন, “আমি চাই, আমার নাম জান্নাত—এ নামেই মানুষ আমাকে চিনুক। আমি চাই না শুধু উদ্যোক্তা হিসেবে, আমি চাই আমার নামে কেউ বলুক, ‘ও তো ব্যবসার মেয়েটা’।”

নিজে নিজে দাঁড়িয়ে যাওয়ার মতো শক্তি তিনি পেয়েছেন আত্মবিশ্বাস থেকে। এখন চান, তার পাশে যারা আছে, তারা নিজের পরিচয়ে দাঁড়াক। সে জন্য তিনি এমন এক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করলেন, যেখানে মেয়েরা নিজের মতো করে বড় হওয়ার সাহস পাবে।

বিএইচ বিজনেস ক্লাবের জন্ম

জান্নাতের হাত ধরে গড়ে ওঠে বিএইচ বিজনেস ক্লাব। এটি শুধু একটি সংগঠন নয়—এটি এমন একটি জায়গা, যেখানে নারী ও তরুণরা নিজেদের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার পথ খুঁজে পান।

ক্লাবের মূল লক্ষ্য : নারী ও তরুণদের মধ্যে উদ্যোক্তা ভাবনা তৈরি করা এবং তাদের সেই পথ পাড়ি দিতে সহায়ক হওয়া। এই ক্লাবের প্রতিটি কোর্স, প্রতিটি ওয়ার্কশপ শুধুই পণ্যের ওপর ভিত্তি করে নয়; বরং শেখানো হয় আত্মবিশ্বাস, আত্মমর্যাদা এবং নিজের পরিচয় কীভাবে গড়ে তুলতে হয়। অনলাইনে ব্যবসা শুরু করা, হ্যান্ডমেড পণ্য, কেক বেকিং, ফ্যাশন, সেলাই, ডিজিটাল মার্কেটিং, প্রোডাক্ট ফটোগ্রাফি—সবকিছু শেখানো হয় বাস্তবমুখী পদ্ধতিতে। এই ক্লাবকে ঘিরেই এখন তৈরি হয়েছে এক নতুন সমাজ। এখানে তরুণ-তরুণীরা বিশ্বাস করেন, ‘নিজের পায়ে দাঁড়ানো মানে শুধু উপার্জন নয়, এটা এক ধরনের সম্মান, আত্মবিশ্বাস আর সমাজে নিজের জায়গা খুঁজে নেওয়ার সংগ্রাম।’ ক্লাবের প্রতিটি উদ্যোক্তার পেছনে জান্নাত যেন একজন নীরব চালিকা শক্তি। তিনি নিজে থাকেন নেপথ্যে। আর প্রতিটি মানুষকে সামনে দাঁড় করিয়ে দেন, যেন তারা নিজের নামে পরিচিত হয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন