২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সারা দেশ থেকে যুক্ত হয়েছিলেন অনেক নারী। তাদের কেউ শিক্ষার্থী, কেউ চাকরিজীবী, কেউ উদ্যোক্তা, কেউ আবার গৃহবধূ। এসব নারীর সাহসিকতা আর অংশগ্রহণের ফলে আন্দোলন বেগবান হয়েছিল এবং সফল হওয়ার পথে এগিয়ে গিয়েছিল অনেক ধাপ। জুলাইয়ের এমন এক নির্ভীক নারী মারফিয়া। তার গল্প তুলে ধরেছেন রায়হান আহমেদ তামীম
ঢাকার বনশ্রীতে বসবাসকারী নারী উদ্যোক্তা মারফিয়া। ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনার পর আন্দোলনে যোগ দেন তিনি। প্রথম দিকে কোটা আন্দোলন নিয়ে খুব বেশি আগ্রহী ছিলেন না, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা, বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের রক্তাক্ত করার ঘটনা তাকে আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য গভীরভাবে উদ্বুদ্ধ করে।
মারফিয়া জানান, ‘১৫ জুলাই ঢাবির ছাত্রদের ওপর হামলা হওয়ার পরই মনে হয়েছিল, আমার এই ছোট ভাইবোনদের একা ফেলে দেওয়া যাবে না।’ সেদিন রাতেই তিনি ঢাবিয়ানদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের খাবার ও পানির ব্যবস্থা করেন এবং পরদিন নিজেই খাবার নিয়ে রওনা হন। চানখাঁরপুলে সিএনজি আটকে দিলে তিনি জানিয়ে দেন, তার খাবারের দোকান আছে এবং খাবার সরবরাহ করতে যাচ্ছেন। তারপর ঢাকা মেডিকেলের ভেতর থেকে মসজিদ গেট দিয়ে শহীদ মিনারের দিকে এগিয়ে যান। সে সময় খাবার বিতরণের কাজ ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ একাধিক দলের সদস্যরা সেখানে ঘুরছিলেন।
১৬ ও ১৭ জুলাই তিনি ঢাবি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন এবং তাদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করে ফান্ড পাঠান। তবে পরিস্থিতি আরো সংকটময় হয়ে ওঠে। ছাত্রলীগের এক মেয়ে তাকে আজিমপুর কলোনিতে দেখা করতে বলেন, কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর পুলিশ তাকে তাড়া করে। মারফিয়া তার ভাই ও স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে দ্রুত রিকশায় নীলক্ষেতের দিকে চলে আসেন।
পুলিশের গুলির মধ্যে তিনি জীবন বাঁচানোর চেষ্টা চালান। তিনি জানান, ‘যতক্ষণ গুলি চলছিল, আমি রিকশার পাদানিতে লুকিয়ে ছিলাম। চারদিকে গুলি চলছিল, যদি পুলিশ আমাকে দেখত, তবে আমাকেও হয়তো টার্গেট করত। আমি বুঝতে পারলাম, জীবিত থাকতে হলে এই বুলেটের বিরুদ্ধে দাঁড়াতেই হবে।’
মারফিয়া শুধু রাজপথে নিজের অংশগ্রহণ সীমাবদ্ধ রাখেননি, তিনি ঢাবি ও ঢাকার অন্যান্য এলাকায় আহতদের জন্য খাবার, পানি, স্যালাইন ও ওষুধ সরবরাহ করেছেন। যেখানে তিনি যেতে পারেননি, সেখানে তিনি অর্থ পাঠিয়েছেন। বনশ্রী, রামপুরা ও ধানমন্ডির বিভিন্ন হাসপাতালে আহত ও নিহত মানুষকে নিয়ে গেছেন এবং আন্দোলনকারীদের সুরক্ষায় সাহায্য করেছেন।
রাজপথে থাকা অবস্থায় মারফিয়াকে পরিবার থেকে ব্যাপকভাবে বাধা দেওয়া হয়েছিল। পরিবার, বিশেষ করে তার বাবা তাকে আন্দোলনে যোগ না দিতে এবং ফেসবুকে কিছু না লিখতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছিলেন। তার ছোট সন্তানদের নিয়ে পরিবারের উদ্বেগ ছিল অনেক বেশি। তবে মারফিয়া তাদের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে সন্তানদের নিয়ে আত্মগোপনে চলে গিয়ে আন্দোলনে অংশ নেন।
‘এই সিদ্ধান্তটি সহজ ছিল না। কিন্তু দেশ ও শহীদদের প্রতি ভালোবাসা আমাকে রাজপথে থাকতে বাধ্য করেছিল,’ বলেন তিনি।
দীর্ঘদিন ধরে চ্যারিটি ও সামাজিক কার্যক্রমেও যুক্ত আছেন তিনি। দুস্থদের আর্থিক সহায়তা, অসহায় নারীদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা, পথশিশুদের শিক্ষা এবং মাদরাসায় ফান্ডিং—এসব কাজ তার সামাজিক দায়িত্বের অংশ।
‘আমি বিশ্বাস করি, যে সমাজে আমরা বাস করি, তার জন্য কাজ করাই আমাদের প্রথম কর্তব্য। আমি বাংলাদেশে একটি সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চাই, যাতে ভবিষ্যতে কেউ আর নির্যাতিত না হয়,’ বলেন মারফিয়া।
তিনি আরো বলেন, ‘আমি নতুন বাংলাদেশ চাই, যেখানে কোনো ধরনের স্বৈরাচার, নিপীড়ন ও বৈষম্য থাকবে না। আমি রাজনৈতিক সচেতনতাসহ আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে একটি নতুন রাষ্ট্র গড়তে চাই।’
মারফিয়া শুধু একটি আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেননি, তিনি তার জীবনের লক্ষ্য ঠিক করেছেন দেশের মানুষের মুক্তির জন্য। ‘আমার সন্তানদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখতে এবং শহীদদের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে আমি আমৃত্যু সংগ্রাম চালিয়ে যাব,’ বলেন তিনি।
মারফিয়ার মতো সাহসী নারী উদ্যোক্তা, যারা নিজেদের নিরাপত্তা বিপন্ন করে দেশের মুক্তির জন্য রুখে দাঁড়িয়েছেন, তারা একটি নতুন বাংলাদেশ গড়তে অনুপ্রাণিত। তাদের সংগ্রাম শুধু দেশপ্রেমের পরিচয় নয়, বরং নিবেদিতপ্রাণ নাগরিক হিসেবে দায়িত্ববোধের সাক্ষ্য।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

