আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ড. আহমদ হাসান দানি

ঢাকার ইতিহাস রচনার পথিকৃৎ

জাহিদুর রহিম

ঢাকার ইতিহাস রচনার পথিকৃৎ

আহমদ হাসান দানি সম্পর্কে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, ‘প্রফেসর দানি এই অঞ্চলের ইতিহাসের অপরে (ওপরে) যেই জ্ঞান রাহেন, আমি সাত জন্মেও তা জানবার পারুম না।’

ড. আহমদ হাসান দানি ছিলেন একজন প্রত্নতত্ত্ববিদ, ইতিহাসকার ও বহুভাষাবিদ। তিনি ১৯২০ সালের ২০ জুন কাশ্মীরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংস্কৃতে স্নাতক এবং প্রাচীন ভারতের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।

বিজ্ঞাপন

তিনি ১৯৪৭ সালে ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগে যোগদান এবং তক্ষশিলা ও মহেঞ্জোদারোতে খননকাজে অংশগ্রহণ করার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। জীবনের উল্লেখযোগ্য সময় তিনি ঢাকায় কাটিয়েছেন। তিনি গত শতকের পঞ্চাশের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং ঢাকা জাদুঘরের পরিচালক (কিউরেটর) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সর্বপ্রথম ঢাকার ধারাবাহিক ইতিহাস রচনার কৃতিত্ব তার। তার রচিত ‘Dacca : A Record of Its Changing Fortunes’ (কালের সাক্ষী ঢাকা নামে বাংলায় অনূদিত) ঢাকার ইতিহাসের অন্যতম মৌলিক সূত্র।

ঢাকায় তার কৃতিত্বের অন্যতম হলো, বিদ্বৎসমাজের সহায়তায় ১৯৫২ সালে পাকিস্তান এশিয়াটিক সোসাইটি নামে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা। ১৯৬২ সালে পেশোয়ারের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগের আগ পর্যন্ত তিনি পাকিস্তান এশিয়াটিক সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে এশিয়াটিক সোসাইটি অধ্যাপক আহমদ হাসান দানিকে ফেলোশিপ (১৯৬৯) ও স্বর্ণপদক (১৯৮৬) দিয়ে সম্মানিত করে।

তিনি কেবল ইতিহাসবিদ ছিলেন না, প্রাচ্যের অন্যতম ভাষাতাত্ত্বিক ও প্রত্নতত্ত্ববিদ ছিলেন। এশিয়া, মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস নিয়ে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে আজও তাকে সর্বোচ্চ পণ্ডিত ব্যক্তি ধরা হয়।

তিনি প্রায় তিন ডজন ভাষা ও উপভাষা জানতেন। তার বইয়ে সেই সব ভাষার বিবরণ অন্তর্ভুক্ত করেছেন। বাংলাদেশের বিগত হাজার বছরের ইতিহাস নিয়ে যারা কাজ করেছেন এবং আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতমান হয়েছেন, তারা বেশিরভাগই ছিলেন ড. দানির ছাত্র। আমাদের দেশের অধ্যাপক ড. আব্দুর রহিম, অধ্যাপক ড. মঈনউদ্দিন আহমেদ খান, অধ্যাপক ড. আব্দুর করিম প্রমুখ পণ্ডিত তার সরাসরি ছাত্র ছিলেন এবং তার সঙ্গে গবেষণা করেছেন। স্যার যদুনাথ সরকারের মোগল ভারত বা ভারতের মধ্যযুগ নিয়ে করা গবেষণার মান অধ্যাপক দানির ছাত্রদের চেয়ে অন্তত বেশি নয়, বরং কমই বলাও যায়। কারণ অধ্যাপক দানির ছাত্ররা যদুনাথ সরকারের মতো ঐতিহাসিক ব্যক্তি বা ঘটনা বর্ণনায় কোনো ধর্মীয় বিবেচনা করেননি বা সাম্প্রদায়িক মন্তব্য করেননি।

তিনি সারা দুনিয়ায় বহুসংখ্যক প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য ও গবেষণা পরিচালনা করেন। বিশেষ করে উত্তর পাকিস্তানে অবস্থিত প্রাক-সিন্ধু উপত্যকা সভ্যতা ও গান্ধারার ওপরে তার প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণাকর্মের জন্য সুপরিচিত। এই গবেষণার রেশ ধরেই বেলুচিস্তানে দুনিয়ার আদিমতম সভ্যতা আবিষ্কৃত হয়।

ড. দানি একাধারে ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব, নৃবিজ্ঞান, শিল্প ও স্থাপত্য, প্যালিওগ্রাফি এবং বিভিন্ন অঞ্চলের স্থানীয় ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—Dacca : A Record of Its Changing Fortunes (1956), Muslim Architecture in Bengal (1961), Indus Civilization : New Perspectives (1981), Thatta : Islamic Architecture (1982), Human Records on Karakorum Highway (1995), Peshawar : Historic City of the Frontier (1995), New Light on Central Asia (1996), Central Asia Today (1996), Romance of the Khyber Pass (1997), History of Northern Areas of Pakistan up to 2000 AD (2001) ও Historic City of Taxila (2001)।

আহমদ হাসান দানির গবেষণা এবং প্রকাশনা বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছে। তিনি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং প্রফেসর ও ফেলো ছিলেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৫৮-৫৯), অস্ট্রেলীয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ক্যানবেরা (১৯৬৯), পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৭৪) এবং উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিসন (১৯৭৭)।

তিনি জীবদ্দশাতেই তার কাজের যোগ্য স্বীকৃতি ও সম্মান পেয়েছেন। এর মধ্যে প্রত্নতত্ত্ব, ভাষাবিজ্ঞান ও প্রাচীন ইতিহাসের মতো বিষয়গুলোয় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারও রয়েছে। যেমন পাকিস্তান সরকার কর্তৃক প্রদত্ত হিলালে ইমতিয়াজ (ক্রিসেন্ট অব এক্সেলেন্স) পুরস্কার, লেজিওঁ দনর (ফরাসি প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি), অ্যারিস্টটল রৌপ্যপদক (জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা); অর্ডার অব দ্য মেরিট (জার্মানি সরকার), নাইট কমান্ডার (ইতালি সরকার), পালমস আকাডেমিক্স (ফ্রান্স সরকার), এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ স্বর্ণপদক; পাকিস্তান সরকার কর্তৃক সিতারায়ে ইমতিয়াজ (স্টার অব এক্সেলেন্স) পুরস্কার। এসব সম্মান আর পুরস্কার অধ্যাপক আহমেদ হাসান দানির মহাসাগর-সম জ্ঞান আর প্রজ্ঞার সামান্য পরিচয় বহন করেন।

২০০৯ সালের ২৬ জানুয়ারি ইসলামাবাদে অধ্যাপক দানি মৃত্যুবরণ করেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন