পর্ব-১: বাংলায় পাঁচ শতাব্দীর দীর্ঘ ও অবিচ্ছিন্ন মুসলিম শাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল ছিল এই অঞ্চলে বৃহৎ একটি মুসলিম জনগোষ্ঠীর উদ্ভব ও গঠন। এই বিপুল জনগোষ্ঠী বিদেশি মুসলমানদের অভিবাসন ও বসতির ফলে সৃষ্টি হয়েছিল, নাকি স্থানীয় জনগণের ইসলামে ধর্মান্তরের মাধ্যমে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে সমসাময়িক বা নিকট-সমসাময়িক সূত্রে পাওয়া অভিবাসন ও ধর্মান্তরের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করতে হবে। তবে তার আগে এ বিষয়ে এ পর্যন্ত যেসব প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব উপস্থাপিত হয়েছে, সংক্ষেপে সেগুলো পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
১৮ শতকের মধ্যভাগে বাংলায় মুসলিমদের রাজনৈতিক ক্ষমতা হারানো এবং ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার কারণে এই অঞ্চলের বিপুল মুসলিম জনসংখ্যার অস্তিত্ব মূলত অগোচরেই থেকে গিয়েছিল।
মুসলিম অভিজাতদের একটি অবক্ষয়গ্রস্ত ও বিচ্ছিন্ন অংশ, যাদের বিরুদ্ধে প্রভাবশালী হিন্দু বণিকগোষ্ঠীও সোচ্চার ছিল, তাদের কাছ থেকে ক্ষমতা দখলের কারণে ব্রিটিশ শাসকরা স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করেছিল, তাদের মতোই মুসলিম শাসকরাও ছিল অল্পসংখ্যক বহিরাগত এবং তাদের পরাজয় ও ছত্রভঙ্গের পর দেশে উল্লেখযোগ্য আর কেউ অবশিষ্ট নেই। বাস্তবে ক্ষমতাচ্যুত ক্ষুদ্র অভিজাত শ্রেণির বাইরে এবং তারও আগে যে দেশে বিশাল মুসলিম জনসমষ্টি বিদ্যমান ছিল, সে বিষয়টি ব্রিটিশদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়। প্রকৃতপক্ষে উনিশ শতকের শেষভাগ পর্যন্ত বাংলায় ব্রিটিশ শাসকদের নীতি অনেকাংশেই এই ভ্রান্ত ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।
এমনকি উনিশ শতকের চল্লিশের দশকেও বাংলার ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ হিন্দুদের প্রতি দ্বিধাহীন আহ্বান জানিয়েছিল—নতুন শাসকদের প্রতি তারা কৃতজ্ঞ থাকুক। কারণ হিন্দুদের তারা মুসলমানদের তথাকথিত ‘অত্যাচার’ থেকে মুক্তি দিয়েছে।
উনিশ শতকের পরবর্তী সময়ে কয়েকটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটিশদের মন থেকে এই ধারণা দূর হতে শুরু করে। ১৮৫৭ সালের ‘বিদ্রোহ ও গণঅভ্যুত্থানে’র পরপরই ১৮৫৯-৬০ সালের ‘নীল বিদ্রোহ’ ঘটে। এর ফলে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি বাংলার গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দিকে শাসকরা দৃষ্টিপাত করে। এই জনগোষ্ঠীর অনেকেই ছিল মুসলমান। বিশেষত নীলচাষপ্রধান জেলায় মুসলমানদের সংখ্যা বেশি ছিল। এরপর ষাটের দশকের শেষ দিকে শুরু হয় তথাকথিত ‘জিহাদ ইনভেস্টিগেশন’। এর মাধ্যমে জানা যায়, বাংলার মুসলমানদের মধ্যে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে একটি বিস্তৃত, বিন্যস্ত ও গোপন আন্দোলন চলছে। ১৮৭১ সালে ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টারের ‘Indian Musalmans’ বইটি প্রকাশিত হয়। এই বইয়ে স্পষ্টভাবে ভারতীয় প্রেক্ষাপটে বাংলার মুসলমানদের মনোভাব ও অবস্থান নিয়ে আলোচনা করা হয়। এই ঘটনাবলির ধারাবাহিকতায় ১৮৭২ সালে পরিচালিত হয় প্রথম আদমশুমারি।
এটি ছিল আদমশুমারির প্রথম উদ্যোগ। ফলে নানা দিক থেকে এটি ত্রুটিপূর্ণ থেকে যায়। বিশেষ করে সাধারণ মানুষ এর উদ্দেশ্য ও উপযোগিতা সম্পর্কে সচেতন ছিল না। অনেকেই ভুল ধারণা করেছিল, এটি হয়তো নতুন কোনো কর আরোপ করার জন্য, অথবা তথাকথিত ‘জিহাদি আন্দোলনে’ অংশগ্রহণের অভিযোগে তাদের প্রতি প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে। এই ভ্রান্ত ধারণার কারণে অনেক লোক গণনাকারীদের কাছ থেকে নিজেদের প্রকৃত সংখ্যা ও অন্যান্য তথ্য গোপন করেছিল। এছাড়া বহু আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও প্রাণবাদী ধর্মবিশ্বাসী (animists) মানুষকে ভুলবশত হিন্দু হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করে গণনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।
তবুও আদমশুমারির ফলাফলে দেখা যায়, বাংলার মোট নিবন্ধিত জনসংখ্যা ৩ কোটি ৬৭ লাখ ৬৯ হাজার ৭৩৫ জন। এর মধ্যে ১ কোটি ৬৩ লাখ ৭০ হাজার ৯৬৭ জন মুসলমান। এই ফলাফল ব্রিটিশ সরকারের কাছে নানা মহলে যেমন অপ্রত্যাশিত ছিল, তেমনি তা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
নিম্নবর্ণের হিন্দুদের থেকে বাংলার মুসলমানদের উৎসতত্ত্ব
আদমশুমারি প্রতিবেদনের রচয়িতা এইচ বেভারলি মন্তব্য করেন, ‘এই প্রদেশগুলোর (বাংলা, বিহার ও ওড়িশা) জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ যে মুহাম্মাদান (ইসলাম) ধর্ম অনুসরণ করে—এই আবিষ্কার নিজেই যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি এটি জনগণের চরিত্রকে সম্পূর্ণ নতুন আলোয় উদ্ভাসিত করে।’ (Report of the Census of Bengal 1872, para-525)
তিনি এই অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে বলেন, “দেশে বসবাসকারী ‘অসংখ্য নিম্নবর্ণের মানুষের ইসলামে ধর্মান্তর’-এর ফলেই এমন ঘটনা ঘটেছে।” তার মতে, “হিন্দুধর্মের একচেটিয়া বর্ণব্যবস্থা বাংলার ‘আধা-জলচর আদিবাসীদের’ এমন অবস্থায় নামিয়ে এনেছিল যে, তারা কেবল প্রভু শ্রেণির একদল লোকের জন্য কাঠ কাটা বা পানি টানার শ্রমিক ও ভৃত্যে পরিণত হয়েছিল। সেইসব প্রভুর চোখে তারা ছিল অপবিত্র ‘জন্তু’ ও সম্পূর্ণভাবে ঘৃণিত। ফলে এই মানুষগুলো স্বাভাবিকভাবেই ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়। কারণ ইসলাম সকল মানুষকে সমান বলে স্বীকৃতি দেয়।” (Report of the Census of Bengal 1872, para 348)
বেভারলি তার এই ধারণার পক্ষে কোনো সুস্পষ্ট ঐতিহাসিক প্রমাণ উল্লেখ করেননি। তিনি এই প্রশ্নেরও সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি—‘যদি বর্ণব্যবস্থার কঠোরতাই বাংলায় নিম্নবর্ণের হিন্দুদের ইসলাম গ্রহণের প্রধান কারণ হয়ে থাকে, তবে ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলে কেন একই ঘটনা ঘটল না—যেখানে মুসলমানরা দীর্ঘকাল শাসন করেছে, যেখানে বর্ণব্যবস্থা বাংলা অঞ্চলের মতোই কিংবা আরো কঠোর ছিল এবং যেখানে নিম্নবর্ণের হিন্দুর সংখ্যা আরো বেশি ছিল!’ তিনি নিজেই এই ব্যাখ্যার দুর্বলতা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। তবুও তিনি তত্ত্বটি পাঠকদের সামনে এভাবে উপস্থাপন করেছেন—‘নিম্নবর্ণের মানুষের এই ধর্মান্তর দেশের অন্য অংশের তুলনায় আমাদের আলোচ্য অঞ্চলে ব্যাপক ও বিস্তৃত ছিল কি না, সে বিষয়টি স্পষ্ট নয়। তবে গৌড় (মালদা) এবং ঘোড়াঘাটের (রংপুর) মধ্যবর্তী অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক মুসলমানের বসবাস এই ধারণাকে কিছুটা সম্ভাবনাময় ও বাস্তবসম্মত করে তোলে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ধর্মান্তরের এই বিষয় সম্পর্কে ইতিহাস নীরব।’ (Report of the Census of Bengal 1872, para 348)
নিজের বক্তব্যের পক্ষে ঐতিহাসিক প্রমাণের ঘাটতি পূরণের জন্য শেষ পর্যন্ত বেভারলি যে যুক্তি উপস্থাপন করেছেন তা হলো—‘বাংলার মুসলমানদের সামাজিক অবস্থান, দেহগঠন, আচার-আচরণ ও রীতিনীতির সঙ্গে এই অঞ্চলের নিম্নবর্ণ হিন্দুদের সাদৃশ্য রয়েছে।’ (Report of the Census of Bengal 1872, para 352-354)
এভাবেই প্রথমবারের মতো নিম্নবর্ণের হিন্দুদের থেকে বাংলার মুসলমানদের উৎসতত্ত্ব উপস্থাপিত হয়।
বেভারলির নিজের ভাষায় এটি ছিল শুধু একটি সম্ভাবনা (probability) ও অনুমান (supposition) এবং ইতিহাসের কোনো নির্দিষ্ট উদাহরণ দিয়ে এই তত্ত্ব প্রমাণ করা হয়নি। এই তত্ত্বের সবচেয়ে বড় ত্রুটি হলো, এতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সত্য সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। আর সেটি হলো, প্রায় ছয় শতাব্দী ধরে বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুলসংখ্যক অনুসারীসহ বিভিন্ন মুসলিম গোষ্ঠী ধারাবাহিকভাবে এই দেশে এসে শাসন করেছে। ব্রিটিশদের মতো তারা কেবল শাসন করেই চলে যায়নি; বরং এই দেশকে নিজেদের আবাসভূমি হিসেবে গ্রহণ করে স্থায়ীভাবে বসবাস করেছে।
বাংলায় আগত বিপুলসংখ্যক অভিবাসী মুসলিমদের বংশধারা বৃদ্ধি পায়নি বা তাদের সবাই বিলুপ্ত হয়ে গেছে, এটা ভাবা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। মুসলমানদের সঙ্গে নিম্নবর্ণের হিন্দুদের শারীরিক গঠন ও আচরণগত সাদৃশ্য সম্পর্কে বেভারলির পর্যবেক্ষণও ছিল গভীরতাহীন ও অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ। বাস্তবে বাংলার মুসলমানদের অনেকের শারীরিক গঠন ও বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে নিম্নবর্ণের হিন্দুদের সাধারণ বৈশিষ্ট্যের উল্লেখযোগ্য পার্থক্য ছিল, আজও রয়েছে। তাছাড়া জলবায়ু, পরিবেশ, পেশা, দারিদ্র্য এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জনজীবনের নানা চাপ ও কষ্ট মানুষের স্বাস্থ্য এবং শারীরিক বৈশিষ্ট্যের ওপর অনিবার্য প্রভাব ফেলে—এ কথাও বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
তবুও এই তত্ত্ব—বা বলা উচিত অনুমান অন্যান্য ব্রিটিশ লেখক ও গবেষকদের কাছে দ্রুত গ্রহণযোগ্যতা পায়। এর প্রধানত তিনটি কারণ ছিল।
প্রথম কারণ : যেসব শাসকদের অপসারিত করে ব্রিটিশরা বাংলায় শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল, তারা ছিল শুধু বিদেশ থেকে আগত মুসলিম। এই ধারণা তাদের মনে আগে থেকেই ছিল। কারণ যদি সত্যিই তাদের বিদেশি ধরে নেওয়া হয়, তবে এ দেশে যে বিপুলসংখ্যক মুসলমানের অস্তিত্ব দেখা যায়, তাদের অবশ্যই স্থানীয় জনগণের মধ্য থেকে ধর্মান্তরিত হয়েছে বলে ধরে নিতে হয়।
দ্বিতীয় কারণ : ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পর প্রায় এক শতাব্দী ধরে সংগঠিত ও আন্তরিক ধর্মপ্রচার সত্ত্বেও খ্রিষ্টান ধর্ম মূলত বাংলার নিম্নবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে বিস্তার লাভ করেছিল। আর এটা অনেকাংশে বর্ণপ্রথার ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে সম্ভব হয়েছিল। (ফলে তাদের ধারণা হয়েছিল, ইসলাম ধর্মও একইভাবে এই অঞ্চলে নিম্নবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে বিস্তার লাভ করেছিল।) ব্রিটিশ গবেষকদের এই অনুমান বাংলায় খ্রিষ্টান মিশনারিদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যায়। (The Bengali Reaction to Christian Missionary Activities, 1833-1857, M.M. Ali, অধ্যায় : ৫ ও ৯)
তৃতীয় কারণ : রাজনৈতিক ক্ষমতা হারানো এবং তার পরপরই সংঘটিত নানা ধরনের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ফলে বহু মুসলমান, যাদের মধ্যে একসময়কার বহু প্রভাবশালী পরিবারও ছিল—চরম দারিদ্র্য ও জীবনের নিতান্ত সাধারণ অবস্থায় পতিত হয়। ফলে অগভীর ও তরল দৃষ্টিতে গ্রামীণ হিন্দু সমাজের দরিদ্র অংশ থেকে তাদের আলাদা করে চেনা কঠিন হয়ে পড়েছিল।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

