স্ট্রোক সচেতনতা ও কর্মযজ্ঞের একসঙ্গে এগিয়ে চলা প্রতিটি মিনিটই মূল্যবান। দ্রুত চিনুন, দ্রুত ব্যবস্থা নিন। বিশ্ব স্ট্রোক সংস্থা ঘোষণা করেছে ২০২৫ সালের এবার বিশ্ব স্ট্রোক দিবসের প্রতিপাদ্য হলো—এই বছরের মূল লক্ষ্য হলো জনগণের মধ্যে স্ট্রোক সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং সরকার ও স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আহ্বান জানানো #StrokeActionNow-এর মাধ্যমে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে।
স্ট্রোক কী
যখন মস্তিষ্কের রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে মস্তিষ্কের রক্ত সঞ্চালন কমে যায় অথবা রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়, ফলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শরীরের এক অংশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়। সেই অবস্থাকে স্ট্রোক বলে। স্ট্রোক মূলত দুই ধরনের হয়ে থাকে। ইস্কেমিক স্ট্রোক এবং হেমোরেজিক স্ট্রোক। ইস্কেমিক স্ট্রোক হয় রক্তনালিতে ব্লকেজ বা রক্ত জমাট বাঁধার কারণে। হেমোরেজিক স্ট্রোক হয় মস্তিষ্কের রক্তনালি ফেটে গেলে। এবার স্ট্রোক সচেতনতার মূল বার্তা—ActFAST প্রচারণার মূল উদ্দেশ্য জনগণকে শেখানো, কীভাবে স্ট্রোকের লক্ষণ দ্রুত চেনা যায় এবং তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা নেওয়া যায়। WSO-এর ActFAST সূত্রটি মনে রাখলেই স্ট্রোক শনাক্ত করা সহজ হবে। যেমনÑ
F (ফেস) : মুখ বেঁকে যাওয়া বা একপাশে ঝুলে পড়া।
A (আর্ম) : এক হাত দুর্বল হয়ে যাওয়া বা নাড়া দিতে না পারা।
S (স্পিচ) : কথা জড়ানো বা স্পষ্টভাবে বলতে না পারা।
T (ট্রিটমেন্ট) : সময় নষ্ট না করে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।
সাধারণ মানুষ যদি ActFAST সূত্রটি জানে এবং প্রয়োগ করে, তাহলে বহু জীবন রক্ষা সম্ভব। স্ট্রোক হলে প্রতিটি মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—এ কারণেই প্রচারণার আরেকটি মূল বার্তা ‘Every Minute Counts’। স্ট্রোক আক্রান্ত হওয়ার পর যত দ্রুত রিহ্যাবিলিটেশন চিকিৎসা শুরু করা যায়, ততই মৃত্যু ও স্থায়ী অক্ষমতার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়। বাংলাদেশে স্ট্রোক সচেতনতার গুরুত্ব এক জাতীয় জনসংখ্যাভিত্তিক সমীক্ষায় দেখা গেছে।
দেশে স্ট্রোকের প্রাদুর্ভাব প্রায় ১১ দশমিক ৩৯ জন প্রতি ১,০০০ জন (অর্থাৎ -১.১৩৯%)। এর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। বাংলাদেশে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার কারণে কথা বলতে না পারা, কথা বলার সময় কথা জড়িয়ে যাওয়া, কথা বুঝতে না পারা, খাবার চিবানো ও গলাধঃকরণ জটিলতায় ভোগা এবং শরীরের যেকোনো একটি অংশ দুর্বল হয়ে যাওয়া। হাঁটাচলা করতে না পারা, পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে নিজের দৈনন্দিন কাজের দক্ষতা হারিয়ে ফেলা। পরিবারের সদস্যদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া।
এজন্য তৈরি হয় বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা। আর এ ধরনের স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীদের প্রতিবন্ধকতা দূর করে তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সহযোগিতা করে ফিজিওথেরাপি। স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি এবং অকুপেশনাল থেরাপি বিশেষজ্ঞরা দিনের পর দিন রিহ্যাবিলেটেশন চিকিৎসাসেবা দিয়ে সুস্থ করে তাদের মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলছেন।
দেশে স্ট্রোকে আক্রান্ত এই রোগীদের জন্য সব সরকারি হাসপাতালে রিহ্যাবিলেটেশন চিকিৎসাসেবা আবশ্যিকভাবে চালু করা হোক। পাশাপাশি, রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল আইন অনুযায়ী ফিজিওথেরাপিস্ট, স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট নিয়োগের মাধ্যমে এই জীবনরক্ষাকারী পুনর্বাসন স্বাস্থ্যসেবা যেন সর্বস্তরের মানুষ সহজে ও বিনামূল্যে পেতে পারে। এটি নিশ্চিত করা এখন জাতীয় স্বাস্থ্যসেবার অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীদের পূর্ণ মর্যাদায় বেঁচে থাকার অধিকার প্রতিষ্ঠাই হোক আমাদের সম্মিলিত লক্ষ্য।
লেখক : ইন্টার্ন স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ
থেরাপিস্ট, সিআরপি, মিরপুর
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

