আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

বেলালের আনন্দ

শাহনেওয়াজ চৌধুরী

বেলালের আনন্দ

ঘুমটিঘর রেললাইনের পাশের বস্তিতে থাকে বেলালরা। ওর মা বাসায় বাসায় ঠিকা কাজ করেন। বাবা রিকশা চালান। বাবা-মায়ের এত খাটুনির পরও ওদের অভাব যায় না। অভাব ওদের যেন খুবই ভালোবাসে! অভাবের এমনই আসলে স্বভাব। বেলালের দাদি অসুস্থ। প্রতিদিন ম্যালা টাকার ওষুধ কিনতে হয়। ওর বাবা বলে, ‘টাকার আর চিকিৎসার অভাবে বাপে মইরা গেছে। মায়রে হারাইতে চাই না।’ দাদির ওষুধ, বাজার-সদাই, প্রতিদিনের রিকশার জমা টাকা মিটিয়ে বেলালের বাবার হাতে কীই-বা থাকে! ছুটা কাজ করে মা আর কয় টাকা পায়? অভাব তাহলে যাবে কেমন করে?

রোজার মাস। অসুস্থ দাদি রোজা রাখতে চান, কিন্তু পারেন না। রিকশা চালিয়ে বাবার পক্ষেও রোজা রাখা সম্ভব না। ছুটা কাজের পরিশ্রমে কুলিয়ে উঠতে না পেরে মা-ও রোজা রাখেন না। তাই ইফতার হয় না ওদের ঘরে। তাছাড়া ইফতারের সময় দাদি ছাড়া কেউ ঘরেও থাকেন না। কিন্তু বেলালের ইফতার খেতে ইচ্ছে করে। খুব ইচ্ছে করে।

বিজ্ঞাপন

রাস্তার রেস্তোরাঁগুলোর পাশ দিয়ে যেতে যেতে জিলাপি, পেঁয়াজু, আলুর চপ ভাজার সুঘ্রাণ বেলালের নাকে ঝুঁকে পড়ে! লোভ সামলাতে কষ্ট হয় বেলালের। সেদিন বাবার কাছ থেকে কুড়ি টাকা নিয়েছিল। কুড়ি টাকায় দুটো আলুর চপ, দুটো পেঁয়াজু কিনেছে। এতে কি মন ভরে!

ঘুমটিঘর মসজিদে আসরের নামাজের পর ছেপারা পড়ে বেলাল। আগে মাগরিবের আজানের আগে ছুটি দিতেন ইমাম হুজুর। ইফতারের সময় এসে যায় বলে এখন আরো আগে ছুটি দেন। পাঁচজন কোরআন শরিফ সবক নিয়েছে। তাই আজ একটু দেরিতে ছুটি হলো। ইফতারের সময় কাছাকাছি বলে মসজিদের একপাশে ইফতার সাজাচ্ছিল কয়েকজন মুসল্লি। ছুটির পরে সবাই বেরিয়ে যাচ্ছিল, বেলালকে পেছন থেকে ডাকলেন ইমাম হুজুর— ‘বেলাল, তুই একটু পরে যা। ইফতার সাজাইতে সাহায্য কর। ইফতার কইরা মাগরিবের নামাজ পইড়া বাড়ি যাবি।’

বেলাল তো খুব খুশি। বুকে চেপে রাখা ছেপারা মসজিদের কিতাবের তাকে রেখে ইফতার সাজানোর কাজে লেগে গেল। ছোলা, পেঁয়াজু, আলুর চপ ভাজা! মুড়ি। শরবত। কলা। আপেল। খেজুর। কত ধরনের ইফতার!

ইফতার করতে বসে আপেলটা আলাদা করে রাখল বেলাল। আর নামাজের সময় ওটা প্যান্টের পকেটে রাখল। দাদির জন্য নিয়ে যাবে। দাদি অসুস্থ, আপেল খেলে শরীরে বল পাবে!

ইমাম হুজুর মনে হয় বেলালের মনের অবস্থা বুঝতে পারেন! তিনি ইফতার সাজানোর ছুতোয় রোজ বেলালকে থাকতে বলেন। অবশ্য বেলালের সঙ্গে ছেপারা পড়তে আসা অন্য কোনো ছেলে চাইলেও এই মসজিদে ইফতার করতে পারে। মসজিদে হাজির সবাই ইফতার খেতে পায়।

দেখতে দেখতে রমজান শেষ হয়ে এলো। ইমাম হুজুরের বাড়ি যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে।

শেষ তারাবির ইফতার। সন্ধ্যার আগে ইমাম হুজুর বললেন, ‘কাল সকালবেলায় বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেব। তোদের সঙ্গে ঈদের পরে দেখা হবে ইনশাআল্লাহ।’ বলে পকেট থেকে দুটো ১০০ টাকার নোট বের করে বেলালের হাতে দিয়ে বললেন, ‘টাকাটা এখনই খরচ করবি না বেলাল। ঈদের দিন খুশিমতো কিছু খাবি।’ তারপর একটা শাড়ি দিলেন বেলালের হাতে। বললেন, ‘এটা তোর দাদির জন্য।’

শাড়ির ঘিয়ে রংটা মন কেড়ে নিল বেলালের। শাড়িটা পেলে খুব খুশি হবে দাদি! আজ আর ইফতারে মন নেই বেলালের। শাড়িটা নিয়ে ভোঁ-দৌড়! ইমাম হুজুর ডাকলেন— ‘বেলাল ইফতার করে যাস।’

কে শোনে কার কথা! বেলালের মন আজ ইফতারের ছোলা, পেঁয়াজু, আলুর চপ ভাজা, মুড়ি, শরবত, কলা, আপেল, খেজুরে নেই। আজ ওর মনে দারুণ ঈদের আনন্দ। বাড়ি ফিরে বেলাল দেখল মা-ও বাড়িতে আছে। মা বলল, ‘আইছস বাবা? আইজকে ঘরে ইফতার করবি। তোর বাপরেও আইতে কইয়া দিছিলাম।’

দাদিকে ইমাম হুজুরের দেওয়া শাড়িটা দিল বেলাল। খুব খুশি হলেন দাদি। অসুস্থ মানুষটার মুখে হাসি ফুটল। সব শুনে বেলালের বাবা বললেন, ‘ইমাম হুজুর ভালো মানুষ। তোরে বিনা বেতনে পড়ায়। তোর দাদিরে আবার ঈদের শাড়ি কিন্যা দিল! ঈদের পরে ইমাম হুজুর ফিরলে একদিন দাওয়াত কইরা খাওয়াইতে হইব।’

ইমাম হুজুরকে দাওয়াত করে খাওয়ানোর কথা শুনে বেলাল খুব খুশি হলো। আজ অনেক কারণে বেলালের আনন্দ ধরে না। এই আনন্দ ঈদের আনন্দের মতো রঙিন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...