আখাউড়া-সিলেট রেলপথের পাঁচটি স্টেশন দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া রেলস্টেশনগুলো হচ্ছে—লংলা, মনু, টিলাগাঁও, ছকাপন ও ভাটেরা। এতে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন যাত্রীরা। অন্যদিকে অরক্ষিত এই রেলপথের শত কোটি টাকার সম্পদ বেহাত হয়ে যাচ্ছে। চুরি হয়ে যাচ্ছে রেলওয়ের নানা যন্ত্রাংশ। রক্ষণাবেক্ষণের নেই কোনো উদ্যোগ।
জানা গেছে, আখাউড়া-সিলেট নির্মাণের পর থেকেই অবহেলিত ও অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। এই লাইনে পুরোনো রেল ও ইঞ্জিন দিয়ে ট্রেন চলাচলের কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হয়ে বন্ধ হয় ট্রেনযাত্রা। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে বেশ কিছু স্টেশন ও লোকাল চারটি ট্রেন বন্ধ হওয়ার ঘটনা। এতে ভোগান্তিতে সাধারণ যাত্রী ও শিক্ষার্থীরা। সিলেট রেললাইন যেন অভিভাবকহীন। একসময় লংলা, মনু, টিলাগাঁও, ছকাপন ও ভাটেরা স্টেশনগুলো ছিল কর্মমুখর। ব্যবসা-বাণিজ্যও ছিল জমজমাট। এখন সেখানে শুধু সুনসান নীরবতা। সিলেট-আখাউড়া রেললাইনের শুধু মৌলভীবাজার জেলায় বন্ধ রয়েছে চারটি স্টেশন। স্টেশনগুলো হচ্ছে ভাটেরা, ছকাপন, টিলাগাঁও ও মনু। বন্ধ স্টেশনের ঘর ও বাসাবাড়িতে অনেকেই বসবাস করছেন সরকারি বিদ্যুৎ জ্বালিয়ে। আখাউড়া-সিলেট লাইনের সংস্কার, বন্ধ স্টেশন চালু, নতুন দুটি ট্রেন চালু ও বন্ধ লোকাল ট্রেনগুলো চালুর দাবিতে আন্দোলন করেও কোনো সুফল মিলছে না।
কোটি কোটি টাকার ডিজিটাল সিগন্যালিংয়ের মালামাল চুরি হয়ে গেছে। স্টেশন বন্ধ থাকায় হাজার কোটি টাকার জমি বেহাত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে ডিজিটাল সিগন্যালিং সিস্টেম চুরি হওয়ার পেছনে রেলের কিছু অসাধু কর্মকর্তা জড়িত। আর এসব স্টেশন বন্ধ থাকায় হাজার কোটি টাকার ডিজিটাল সিগন্যালিং সিস্টেম চুরি হয়ে গেছে। ঘরগুলোয় সরকারি বিদ্যুৎ ব্যবহার করে বসবাস করছেন সাধারণ জনগণ। আর এজন্য রেল বিভাগের কতিপয় অসৎ কর্মকর্তা জড়িত রয়েছেন বলে দাবি উঠেছে।
লংলা স্টেশন একজন মাস্টার দিয়ে চালু করলেও লোকাল ট্রেন না থাকায় জনগণের কোনো কাজেই আসছে না। এছাড়া হবিগঞ্জের শাহজিবাজার স্টেশনটিও দীর্ঘদিন থেকে বন্ধ রয়েছে।
এদিকে স্টেশনগুলো বন্ধ থাকার কারণে প্রতিটি স্টেশন এলাকার জমি বেহাত হয়ে পড়েছে। শুধু টিলাগাঁও স্টেশন এলাকাতেই কয়েকশ কোটি টাকার জমি বেহাত হয়েছে। এছাড়া প্রতিটি বন্ধ স্টেশনের ঘর ও জায়গা দখল করে গড়ে উঠেছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বসতঘর।
এছাড়া স্টেশনগুলো বন্ধে থাকার কারণে সরকারের কোটি কোটি টাকার স্থাপনাও অযত্নে-অবহেলায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
ভাটেরার স্টেশনের ঘর দখল করে সেখানে গড়ে উঠেছে কারখানা। ছবি তুলতে গেলে তেড়ে আসেন সেখানকার দখলকারী।
টিলাগাঁও ইউনিয়নের বাসিন্দা আলমগীর হোসেন জানান, দীর্ঘদিন স্টেশনটি বন্ধ থাকায় স্টেশনের মূল্যবান ডিজিটাল সিগন্যালিংয়ের কোটি কোটি টাকার সম্পদ চুরি হয়ে গেছে। অপরদিকে স্টেশন এলাকার শত শত কোটি টাকার জমিও দখল করে নিয়েছেন অন্যরা। এ বিষয়ে রেল কর্তৃপক্ষের কোনো নজর নেই।
কুলাউড়া জংশন এলাকার বাসিন্দা ও রেলের আট দফা দাবি আদায়ের নেতা আব্দুল আজিজ ও আতিকুর রহমান বলেন, সিলেট বিভাগের মানুষ বরাবরই ট্রেনের ওপর নির্ভরশীল ও ট্রেন যাত্রায় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এদিকে বন্ধ স্টেশন চালু, আখাউড়া-সিলেট রেললাইন দ্রুত মেরামত ও ডুয়েল গেজে রূপান্তর, ঢাকা-সিলেট ও সিলেট-চট্টগ্রাম লাইনে নতুন দুটি ট্রেন চালু, বন্ধ থাকা সুরমা মেইল, জালালাবাদ মেইল, কুশিয়ারা মেইল ও ডেমু ট্রেন চালুসহ বন্ধ স্টেশনগুলো চালু করার দাবিতে আন্দোলন করছেন জনগণ। ইতোমধ্যে কুলাউড়া, সিলেট, শ্রীমঙ্গল, টিলাগাঁও ও ভাটেরা স্টেশনে আট দফা দাবিতে আন্দোলন হয়েছে। বেহাত হওয়া কোটি কোটি টাকার সম্পদ উদ্ধারের দাবি জানান আন্দোলনকারীরা।
লংলা স্টেশন এলাকার বাসিন্দা মিসবাহ খান মদরিছ ও সাইফুল জানান, লোকাল ট্রেন ও স্টেশনগুলো বন্ধ থাকার কারণে সমস্যায় পড়তে হয়েছে স্থানীয় ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থীসহ অনেককেই। তাদের পরিবহন খরচ ও যাতায়াত খরচ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।
আগে অল্প খরচে সিলেটসহ নানা জায়গায় যাতায়াত করা গেলেও বর্তমানে অনেক বেশি টাকা দিয়ে ও সময় অপচয় করে গন্তব্যে যেতে হচ্ছে। স্টেশন এলাকার ব্যবসায়ী রুবেল আহমেদ, মাসুক আহমদসহ অনেকেই বলেন, একসময় স্টেশনে চায়ের দোকান ও পানের দোকান দিয়ে সংসার চালাতে পারলেও স্টেশনগুলো বন্ধ হওয়ায় তারা অর্থনৈতিকভাবে সমস্যায় পড়েছেন। স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীরাও অভিযোগ করে বলেন, অনেক টাকা খরচ করে যেতে হয়, টাকার জন্য অনেক সময় তারা কলেজে যেতে পারেন না।
একসময় লংলা, টিলাগাঁওসহ বন্ধ অন্য স্টেশন দিয়ে খাসিয়া পান ও চা দেশের বিভিন্ন জায়গায় পরিবহন করা হতো। এ সময় সরকার কোটি কোটি টাকা রাজস্ব পেত। এখন সেটা বন্ধ থাকায় তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। তাছাড়া লোকজন বিভিন্ন জায়গা থেকে অল্প খরচে মালামাল পরিবহন করতে পারত। কিন্তু বর্তমানে সড়কপথে অধিক টাকা খরচ করে পণ্য পরিবহনের কারণে বাজারে এর দাম কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, শিগগিরই বন্ধ থাকা রেলস্টেশন ও ট্রেন চালু না করলে সরকারের অবশিষ্ট শত শত কোটি টাকার সম্পদ একেবারেই বেহাত হয়ে যাবে।
রেলস্টেশন ও লোকাল ট্রেনগুলো চালু করলে রেলওয়ের রাজস্ব আদায় হবে এবং বেহাত হয়ে যাওয়া সম্পত্তি উদ্ধার করা সম্ভব হবে।
লোকবল ও ইঞ্জিন সংকট স্টেশন ও ট্রেন বন্ধের কারণ বলে জানান কুলাউড়া জংশন স্টেশনের স্টেশন মাস্টার মো. রুমান আহমদ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

