রাজধানীর বারডেম জেনারেল হাসপাতালে মা ও শিশু বিভাগের সামনে সাবিনা বেগমের কোলে তার এক বছরের সন্তান মৌমিতা জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছিল। একই সঙ্গে চিৎকার করে কাঁদছিল শিশুটি। কারণ জিজ্ঞেস করতেই জানা যায়, শিশুটি জন্মগতভাবে থাইরয়েড সমস্যায় ভুগছিল। এ কারণে ধীরে ধীরে দীর্ঘস্থায়ী জণ্ডিসে আক্রান্ত হয় সে।
সাবিনার মতো প্রতিদিন অন্তত আট থেকে ১০ জন অভিভাবক থাইরয়েডে আক্রান্ত শিশু-কিশোরদের চিকিৎসা করাতে এই চিকিৎসা কেন্দ্রে আসেন। সরেজমিনে সেগুনবাগিচার বারডেম হাসপাতালে অপেক্ষমাণ অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, থাইরয়েড সমস্যার কারণে তাদের শিশুরা নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছে।
চিকিৎসকরা জানান, সাধারণত জন্মের পর প্রথম তিন বছরে একটি শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ সম্পন্ন হয়। এর অধিকাংশই আবার প্রথম বছরেই ঘটে। শিশুর স্বাভাবিক শারীরিক বেড়ে ওঠা আর মানসিক বিকাশে থাইরয়েড হরমোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই এ সময় কোনো কারণে গুরুত্বপূর্ণ এ হরমোনের ঘাটতি হলে শিশুরা শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রতিবন্ধী হিসেবে বেড়ে ওঠে। এটাকে কনজেনিটাল হাইপোথাইরয়েডিজম বলে। শিশুর থাইরয়েড গ্রন্থি পুরোপুরি গঠিত না হলে বা হরমোন তৈরিতে সমস্যা হলে এমন সমস্যা দেখা দেয়।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস বিভাগের এক গবেষণায় বলা হয়, থাইরয়েড সংক্রামক নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটা বংশানুক্রমিক। জিনগতভাবে প্রতি ২ হাজার ৩০০ জনে ১ জন থাইরয়েড সমস্যা নিয়ে জন্ম নেয়। প্রতি ১০ নারীর ১ জন এ রোগে ভুগছেন। বাবা-মা এই সমস্যায় ভুগলে তাদের সন্তানদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৭০ শতাংশ।
চিকিৎসকরা বলেন, অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের শরীরে আয়োডিনের অভাব থাকলেও থাইরয়েডের সমস্যা দেখা দিতে পারে। আয়োডিন থাইরয়েড হরমোন উৎপাদনে সাহায্য করে। আবার অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে থাইরয়েড হরমোন নিঃসরণ কমে যেতে পারে বা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এমন ঘটনা নবজাতকের মধ্যে দেখা না গেলেও, পরবর্তী সময়ে ঘটে থাকে। মাতৃগর্ভে থাকতেই শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য এই হরমোন দরকার, তাই সব অন্তঃসত্ত্বা নারীর থাইরয়েড সমস্যা আছে কি না, তা জানা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসা করা আবশ্যক।
বিএমইউর ডায়াবেটিস ও হরমোন বিভাগের উদ্যোগে পরিচালিত সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের অধিকাংশ স্কুলগামী শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা নারীদের শরীরে আয়োডিনের অভাব পাওয়া যায়। এটি শরীরে অতিপ্রয়োজনীয় থাইরয়েড হরমোন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কয়েক চিকিৎসক জানান, থাইরয়েড হরমোনের সব ধরনের চিকিৎসা দেশেই হয়। ৩০ বছর ধরে বিএমইউর থাইরয়েড ক্লিনিকের মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষ সুচিকিৎসা পেয়েছে। ক্লিনিকটি দেশের একমাত্র সমন্বিত থাইরয়েড ক্লিনিক, যা নিউক্লিয়ার মেডিসিন এবং সার্জারি বিভাগের মাধ্যমে সেবা দিচ্ছে। এ ছাড়া বারডেম হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ দেশের প্রায় সব মেডিকেল কলেজের হরমোন বিভাগ ও পরমাণু চিকিৎসাকেন্দ্রে থাইরয়েডের চিকিৎসা দেওয়া হয়।
থাইরয়েড রোগ প্রতিরোধে চিকিৎসকরা পরামর্শ দিয়ে বলেন, আয়োডিনযুক্ত লবণ খাওয়া ও রেডিয়েশন থেকে মুক্ত থাকা উচিত, বিশেষ করে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের। হাইপার, হাইপো বা থাইরয়েড প্রদাহজনিত কোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসা নেওয়া উচিত। কোনো কারণে থাইরয়েড বড় হয়ে গেলে বা ক্যানসার হলে সার্জারির মাধ্যমে কেটে ফেলা উচিত। যাদের বংশগত থাইরয়েড সমস্যার ইতিহাস আছে, তাদের চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকা উচিত। কোনো শিশুর বা বয়স্ক ব্যক্তির অবর্ধন শারীরিক ও মানসিক, ঠান্ডা বা গরম সহ্য করতে না পারা, বুক ধড়ফড় করা, খাওয়া ও রুচির সঙ্গে ওজন কমা ইত্যাদি হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক শাহজাদা সেলিম বলেন, শিশুদের থাইরয়েডের সমস্যা হলে থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে সংশ্লিষ্ট হরমোন নিঃসৃত হয় না, অর্থাৎ থাইরয়েড গ্রন্থি কাজ করতে পারে না। এতে শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বুদ্ধির বিকাশ, উচ্চতা ও মস্তিষ্কের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। এর প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত ঘুম, খাওয়ায় অনীহা, ওজন হঠাৎ বৃদ্ধি, জন্মের পর দীর্ঘস্থায়ী জন্ডিস ইত্যাদি।
ডা. শাহজাদা বলেন, থাইরয়েডের সমস্যা দুই রকমের হয়। হাইপোথাইরয়েডিজম বা থাইরয়েড হরমোন কম ক্ষরণজনিত সমস্যা ও হাইপারথাইরয়েডিজম অর্থাৎ এই হরমোন বেশি ক্ষরণের সমস্যা। শিশুদের ক্ষেত্রে প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি হাইপোথাইরয়েডিজমই বেশি দেখা যায়। হাইপোথাইরয়েডিজমে আক্রান্ত ছোট শিশুদের উচ্চতা ও ওজন ঠিকমতো বাড়ে না, সাধারণত খুব দুর্বল প্রকৃতির হয়ে থাকে, কোষ্ঠকাঠিন্য, ত্বকের সমস্যা দেখা যায়, পেট ফুলে যায়, চেহারায়ও অস্বাভাবিকতা দেখা যায়।
তিনি বলেন, আরেকটু বড় শিশুদের হাইপোথাইরয়েডিজমের সমস্যা হলে বৃদ্ধি ঠিকমতো হয় না, বয়োসন্ধি আসতে দেরি হয়। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি হয়ে যাওয়ার পর থাইরয়েড সমস্যা হলে স্থায়ী কোনো ক্ষতি হয় না। হাইপার বা হাইপোথাইরয়েডিজমে আক্রান্ত শিশুদের সঠিক চিকিৎসা করলে সুস্থ অন্য সবার মতোই শারীরিক, মানসিক বৃদ্ধি অর্জন ও পরিপূর্ণ সুস্থ, স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব। তাই সমস্যা শুরু হওয়ার পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চিকিৎসা জরুরি।
ডা. সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হরমোন ও ডায়াবেটিক বিশেষজ্ঞ মাজহারুল হক তানিম বলেন, থাইরয়েড আক্রান্তদের মধ্যে প্রতি ১০ জনের ৯ জনই নারী। ৮ শতাংশ রোগী সাব-ক্লিনিক্যাল হাইপোথাইরোডিজমে ভুগছে, যার অধিকাংশই জানে না তারা থাইরয়েড সমস্যায় আক্রান্ত।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

