অতি দরিদ্রদের স্বাস্থ্যসেবা রক্ষায় ৭ দফা দাবি

অতি দরিদ্রদের স্বাস্থ্যসেবা রক্ষায় ৭ দফা দাবি
স্বাস্থ্য অধিকারকর্মীদের সংবাদ সম্মেলন। ছবি: আমার দেশ

স্বাস্থ্য সেবার সাথে অর্থনৈতিক, সামাজিক, স্বাস্থ্যগত, জীবন-জীবিকা জড়িত। কিন্তু সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা এলাকায় ২১২ নগর মাতৃসদন ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর কার্যক্রমগুলো বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। একইসঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে স্বল্পমূল্য ও বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশু টিকাদান, পরিবার পরিকল্পনাসহ নানা জরুরি সেবার ওপর নির্ভরশীল লাখো মানুষ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আবার এসব কেন্দ্রে কর্মরত ৩ হাজার ৪৭২ জন দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর চাকরি অনিশ্চয়তায় পড়ায় তাদের পরিবারও অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে নগর স্বাস্থ্যসেবা অব্যাহত রাখা স্বাস্থ্যসেবা বিকেন্দ্রীকরণ এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ৭ দফা দাবি জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিকারকর্মী ও নগর দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা।

বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) কনফারেন্স হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন একথা বলেন তারা। কোয়ালিশন ফর দ্য আরবান পূওর’র (কাপ) সহযোগিতায় এর আয়োজন করে নগর দরিদ্র বস্তিবাসীদের কেন্দ্রীয় ফেডারেশন (বিওএসসি) ও সেফ হেল্প গ্রুপ নেটওয়াক (পথবাসী ও ঝুঁপড়িবাসীদের ফেডারেশন)।

বিজ্ঞাপন

সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নগর দরিদ্র বস্তিবাসীদের ফেডারেশন ইয়ুথ গ্রুপের ফোকাল পারসন হেনা আক্তার রুপা। বিওএসসি সভাপতি হোসনে আরা বেগম রাফেজার সভাপতিত্বে কাপের নির্বাহী পরিচালক খোন্দকার রেবেকা সান ইয়াতের সঞ্চালনায় এ সময় আরো বক্তব্য দেন- ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলাম আজাদ, বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি প্রতীক ইজাজ, বাংলাদেশ মানবাধিকার সাংবাদিক ফোরামের উপদেষ্টা খায়রুজ্জামান কামালসহ অনেকেই।

মূল প্রবন্ধে জানানো হয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহায়তায় পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে এনজিওগুলোর সহযোগিতায় নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্প চালু হয়। পরবর্তীতে ইউএনএফপিএর সহযোগিতায় মাতৃস্বাস্থ্যসেবাও যুক্ত হয়।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, নগরবাসীর জীবন-জীবিকা এবং সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অবলম্বন হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা। রাষ্ট্রের জনগণের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব কিন্তু দেশ স্বাধীনের ৫৫ বছর পার হয়েছে বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫ (ক) অনুযায়ী জনগণের চিকিৎসা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব, এখনও পর্যন্ত মূল স্রোতধারার অধীনে নগর স্বাস্থ্য সেবা কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে নগরবাসীরা স্বাস্থ্য সেবা অধিকার থেকে বঞ্চিত বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠী। ১৯৯০ সাল থেকে নগর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দাবিতে কাপসহ বিভিন্ন এক্টিভিস্ট, সিবিও প্রতিনিধি সরকার প্রধান ও নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে এ্যাডভোকেসি করে।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বর্তমানে দেশে ১২টি সিটি কর্পোরেশন এবং ৩৩১টি পৌরসভা থাকলেও প্রকল্পের মাধ্যমে মাত্র ১২টি সিটি কর্পোরেশন এবং ২১টি পৌরসভায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় উল্লিখিত সিটি কর্পোরেশন ও পৌরভায় ৪৫টি পার্টনারশিপ এলাকায় ৪৫টি নগর মাতৃসদন (সিএইচআরসিসি) ও ১৬৭টি নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্র (পিএইচসিসি) স্থাপনের মাধ্যমে ১৫টি অংশীদারিত্ব এনজিওর সহযোগিতায় ৩ হাজার ৪৭২ জন দক্ষ জনবল দ্বারা ১৭ মিলিয়নের বেশি নাগরিককে নিয়মিত দক্ষতার সাথে মানসম্মত সেবা দিয়ে যাচ্ছে। ২১২টির মধ্যে ৯৭টি ভাড়াকৃত সেবা কেন্দ্র তার মধ্যে ১৯টি নগর মাতৃসদন এবং ৭৮ নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্র। নগর মাতৃসদন ও নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্রের মাধ্যমে ১৬টির বেশি স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করা হয় এবং সেবা মূল্য নগর দরিদ্রদের নাগালের মধ্যে প্রদান করা হত, যা বর্তমানে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় নগর অতি দরিদ্র জনগণের জন্য রেড কার্ডের মাধ্যমে ৩০% সেবা গ্রহীতাকে বিনামূল্যে সেবা প্রদান করা হয়, যা বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ১৬টি সেবার মধ্যে এক বছরে গুরুত্বপূর্ণ সেবা গ্রহীতাদের সংখ্যা তুলে ধরা হয়।

বক্তারা বলেন, প্রায় ৫ লাখ প্রসব পূর্ববর্তী ও এক লক্ষ ২৫ হাজার প্রসব পরবর্তী সেবা গ্রহণ, নরমাল ডেলিভারি ও সিজারিয়ান সেকশনের মাধ্যমে ৩০ হাজার শিশুর জন্মগ্রহণ, প্রায় ৪ লাখ আধুনিক পরিবার পরিকল্পনা সেবা গ্রহণ, শিশুদের বিভিন্ন রোগের প্রতিষেধক হিসাবে প্রায় ১২ লক্ষ টিকা গ্রহণ, প্রায় দুই লাখ কিশোর-কিশোরীকে অ্যাডোলেসেন্ট রিপ্রোডাক্টিভ হেলথ কেয়ার প্রদান, প্রায় ১২ লাখ শিশুকে শিশু স্বাস্থ্য সেবা প্রদান, প্রায় এক লাখ মা ও শিশুকে পুষ্টি সেবা নিশ্চিতকরণ, লাল কার্ডের মাধ্যমে এক কোটি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বিনামূল্যে সেবা প্রদান এবং জাতীয় গুরুত্ব বিবেচনায় প্রায় ৭০ লক্ষ কোভিড ১৯ টিকা সম্পাদন।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গত ২২ এপ্রিল সরকারের ক্যাবিনেট ডিভিশনের মিটিয়ে নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে স্থানান্তরিত হবে বলে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। স্থানীয় সরকারের অধীনে সিটি কর্পোরেশন ও মিউনিসিপালিটির সাথে অংশীদার এনজিওদের প্রকল্পের মেয়াদ ছিল গত ৩০ জুন। সরকারের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে সিটি কর্পোরেশন এবং মিউনিসিপালিটির অর্থাৎ স্থানীয় সরকারের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য সেবা প্রদান বন্ধ করা হয়েছে। গত ১ জুলাইয়ের পর পার্টনার এনজিওরা মানবিক কারণে এই সেবা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে এবং এত ব্যাপকসংখ্যক মানুষ সেবা পাচ্ছে। কিন্তু পিএ পার্টনার এনজিওরা চলতি মাসের পর এই স্বাস্থ্য সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না। কারণ স্থানীয় সরকার বা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সেবা পরিচালনাকারী এনজিওদেরকে কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠিপত্র, নির্দেশনা অথবা চুক্তিপত্র সম্পাদন করা হয়নি। সুতরাং তাদের পক্ষে এই সেবা কার্যক্রমে বাড়ি ভাড়া, কর্মী বেতন, ওষুধপত্র ক্রয়সহ বৃহৎ ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়।

তারা জানান, হাজার হাজার শিশু রোগ প্রতিরোধক টিকা ও সেবা পাবে না, যার ফলে হামের চেয়েও অধিক দুর্যোগ দেখা দিতে পারে, গর্ভবতী মা ও কিশোরীর রোগ প্রতিরোধক টিকা ও সেবা অনিশ্চয়তায় পড়বে। এ ছাড়া সক্ষম দম্পতিরা জন্ম নিয়ন্ত্রণ সেবা পাবে না ফলে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাবে, দরিদ্র গর্ভবতী নারীরা ডেলিভারি সেবা না পাওয়ায় হোম ডেলিভারিসহ মা ও শিশু মৃত্যুহার বাড়বে, নগর দরিদ্ররা প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং স্যাটেলাইট ক্লিনিকের মাধ্যমে দোরগোড়ায় সেবা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হবে, অতি দরিদ্র রেড কার্ড অন্তর্ভুক্ত পরিবারগুলো বিনামূল্যে স্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হবে। পাশাপাশি দরিদ্র নারীরা জরায়ু মুখের ক্যান্স্যার স্ক্রিনিং পরীক্ষা করা থেকে বঞ্চিত হবে, যার কারণে মৃত্যু ঝুঁকি বাড়বে এবং ৩ হাজার ৪৭২ জন দক্ষ কর্মী চাকরি হারাবে, যাদের মধ্যে বেশির ভাগই নারী। পরিবারের উপার্জন এসব নারী বেকারত্বে পড়বে এবং পরিবারে আর্থিক দুর্যোগ সৃষ্টি হবে।

এ অবস্থায় সংবাদ সম্মেলনে সাত দফা প্রস্তাবনা ও দাবি তুলে ধরেন তারা। এগুলো হলো-নগর স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম কোনোভাবেই বন্ধ করা যাবে না, অব্যাহত রাখার জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ ও জরুরি ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। সেক্ষেত্রে বর্তমান কর্মরত এনজিওদের সাথে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা মন্ত্রণালয় থেকে নির্ধারিত সময়ের জন্য অংশীদারিত্ব চুক্তি সম্পাদন করে এই সেবা অব্যাহত রাখা। পূর্বের ন্যায় নগর অতি দরিদ্র পরিবারের জন্য ফ্রি লাল কার্ড বরাদ্দ ও বিনামূল্যে সেবা প্রদান এবং নগর দরিদ্র বস্তিবাসীদের জন্য স্বল্প মূল্যে সেবা প্রদান ও ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ, পর্যালোচনা ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করে নগর স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনা ও স্থায়িত্বশীল এবং অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করে পর্যায়ক্রমে স্থানান্তর করা। সমন্বিত, গুণগত মান বজায় রেখে স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের জন্য প্রকল্পে কর্মরত অভিজ্ঞ, দক্ষ ও প্রকল্পের অর্থে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত দক্ষ জনবল ধরে রাখার ব্যবস্থা গ্রহণ।মহানগর ও পৌরসভা এলাকার ১০০ ভাগ জণগোষ্টীর দোরগোড়ায় কেন্দ্রভিত্তিক স্বল্পব্যয়ী সেবা প্রদান অব্যাহত রাখা এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষমাত্রা অর্জনে সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নগরবাসীর স্বাস্থ্য অধিকার নিশ্চিত করা।মহানগরের ওয়ার্ড পর্যায়ে ও পৌরসভায় এখনো পর্যন্ত যেখানে নগর স্বাস্থ্য সেবা কার্যক্রম নেই, সেগুলোতে মা ও শিশু সেবাসহ প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা সেক্ষেত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নতুন মডেল অনুযায়ী কার্যক্রম শুরু করা ও সকল নগরবাসীর স্বাস্থ্য অধিকার নিশ্চিত করা এবং সকল নগরবাসীকে ‘হেলথ স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড’ বিশেষ করে নগর দরিদ্রদের জন্য নিশ্চিত করা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন