আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

রমজান মাসে আলসারেটিভ কোলাইটিস

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

রমজান মাসে আলসারেটিভ কোলাইটিস

রমজান মাসে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা, খাবারের সময়সূচিতে পরিবর্তন এবং খাদ্যাভ্যাসে হঠাৎ রদবদল শরীরের ওপর স্পষ্ট প্রভাব ফেলে। সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে রোজা সাধারণত উপকার হলেও দীর্ঘমেয়াদি অন্ত্রজনিত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য এটি কিছুটা চ্যালেঞ্জের। বিশেষ করে, আলসারেটিভ কোলাইটিসে ভোগা রোগীদের রমজানে বাড়তি সতর্কতা ও সচেতনতা প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন

আলসারেটিভ কোলাইটিস কী

আলসারেটিভ কোলাইটিস একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত অন্ত্ররোগ। এতে মূলত বৃহদান্ত্র ও মলাশয়ের ভেতরের আবরণে প্রদাহ এবং ক্ষত তৈরি হয়। রোগটি একটানা একই অবস্থায় থাকে না—কখনো নিয়ন্ত্রণে থাকে, আবার কখনো হঠাৎ উপসর্গ বেড়ে যায়। এই ওঠানামার কারণে রোগীর দৈনন্দিন জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাসে প্রভাব পড়ে, যা রমজানে আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

কেন হয় এই রোগ

আলসারেটিভ কোলাইটিসের সুনির্দিষ্ট একটি কারণ এখনো নির্ধারিত হয়নি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলভাবে নিজের অন্ত্রের কোষকে আক্রমণ করলে এই রোগ দেখা দিতে পারে। এছাড়া কয়েকটি বিষয় ঝুঁকি বাড়ায়—

* শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।

* বংশগত প্রবণতা বা পারিবারিক ইতিহাস।

* অন্ত্রের উপকারী জীবাণুর ভারসাম্য নষ্ট হওয়া।

* দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা।

* অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন।

* কিছু ওষুধের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার।

* পরিবেশগত ও আধুনিক জীবনধারার প্রভাব।

* রমজানে হঠাৎ খাবারের সময় ও ধরন পরিবর্তন।

লক্ষণগুলো কীভাবে প্রকাশ পায়

রোগের তীব্রতা অনুযায়ী আলসারেটিভ কোলাইটিসের লক্ষণ হালকা থেকে গুরুতর হতে পারে। সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—

* ঘন ঘন পাতলা পায়খানা।

* পায়খানার সঙ্গে রক্ত বা শ্লেষ্মা যাওয়া

* তলপেটে ব্যথা ও মোচড়।

* হঠাৎ ও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে টয়লেটে যাওয়ার তীব্র চাপ।

* শরীর দুর্বল ও ক্লান্ত লাগা।

ওজন কমে যাওয়া

* দীর্ঘদিন চললে রক্তস্বল্পতার লক্ষণ (মাথা ঘোরা, ফ্যাকাশে ভাব)।

* তীব্র অবস্থায় জ্বর বা অসুস্থতা।

* রোজার সময় পানিশূন্যতা হলে উপসর্গ বেড়ে যাওয়া।

রোগের ধরন

আক্রান্ত অংশের ওপর ভিত্তি করে এই রোগের বিভিন্ন ধরন রয়েছে। কারো ক্ষেত্রে শুধু মলাশয় আক্রান্ত হয়, যা তুলনামূলকভাবে হালকা। আবার কারো ক্ষেত্রে বৃহদান্ত্রের একটি অংশ বা কোলনজুড়ে প্রদাহ ছড়িয়ে পড়ে, যা বেশি জটিল ও কষ্টদায়ক। রোগের ধরন অনুযায়ী চিকিৎসা পদ্ধতি ও রোজা রাখার সিদ্ধান্ত ভিন্ন হতে পারে।

জটিলতা

নিয়মিত চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ না থাকলে আলসারেটিভ কোলাইটিস থেকে গুরুতর জটিলতা তৈরি হতে পারে। অতিরিক্ত রক্তপাত, তীব্র পানিশূন্যতা, পুষ্টিহীনতা এবং দীর্ঘ মেয়াদে কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে। তাই উপসর্গকে অবহেলা না করে সময়মতো চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

রোগ নির্ণয়

রোগ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসক রোগীর উপসর্গ, আগের রোগ ইতিহাস ও শারীরিক পরীক্ষা করেন। প্রয়োজনে রক্ত পরীক্ষা, পায়খানা পরীক্ষা এবং কোলনোস্কপির মতো পরীক্ষা করা হয়। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে রোগের তীব্রতা ও বিস্তার নির্ধারণ করা সম্ভব হয়, যা রমজানে রোজা রাখা নিরাপদ কি না—সে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে।

খাদ্য নির্বাচন

ইফতার ও সাহরিতে সহজপাচ্য খাবার গ্রহণ করা উচিত। অতিরিক্ত ঝাল, ভাজা ও তেলযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা ভালো। নরম ভাত, সেদ্ধ সবজি, কলা ও দই অনেক রোগীর জন্য সহনীয়। তবে অতিরিক্ত আঁশযুক্ত বা কাঁচা খাবার কারো কারো ক্ষেত্রে সমস্যা বাড়াতে পারে।

পানি ও তরল

রোজার সময় পানিশূন্যতা এই রোগের উপসর্গ বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই ইফতার থেকে সাহরি পর্যন্ত পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি। একসঙ্গে বেশি না খেয়ে অল্প অল্প করে পানি ও তরল গ্রহণ করা ভালো।

ওষুধ ও জীবনযাপন

চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়। রোজার সময় অনুযায়ী ইফতার ও সাহরিতে ওষুধের সময় সমন্বয় করা যায়। পাশাপাশি মানসিক চাপ কমানো, পর্যাপ্ত ঘুম এবং হালকা হাঁটার মতো ব্যায়াম রোগ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।

কখন রোজা না রাখাই ভালো

যদি তীব্র পেটব্যথা, অতিরিক্ত রক্তপাত, দিনে বহুবার পাতলা পায়খানা বা প্রচণ্ড দুর্বলতা দেখা দেয়, তাহলে রোজা ভেঙে চিকিৎসা নেওয়াই যুক্তিযুক্ত। অসুস্থ ব্যক্তির জন্য রোজায় ছাড় রয়েছে—এটি মনে রাখা জরুরি।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান

জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...