গবেষণা

শিশুর বিকাশে বাধা স্ক্রিন টাইম

আমার দেশ অনলাইন
আমার দেশ অনলাইন

শিশুর বিকাশে বাধা স্ক্রিন টাইম
প্রতীকী ছবি

দুই বছরের কম বয়সি শিশু ও টডলার বা হাঁটি হাঁটি পা পা করা শিশুদের মোবাইল-ট্যাবলেটের পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকার বিষয়টি তাদের স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার মানের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এক যুগান্তকারী গবেষণায় এই সময়ে স্ক্রিন টাইম পুরোপুরি এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

গবেষণায় সতর্ক করে বলা হয়েছে, এই বয়সে স্ক্রিন ব্যবহার শিশুর সামগ্রিক বিকাশে নানা উদ্বেগের সৃষ্টি করতে পারে।

একই সাথে গবেষণায় শিশু ও নবজাতকদের ওপর স্মার্টফোন, ট্যাবলেট এবং অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসের ঝুঁকি নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে আরো তদন্তের আহ্বান জানানো হয়েছে।

বর্তমানে কিশোর-কিশোরীদের ডিজিটাল অভ্যাস এবং ১৬ বছরের কম বয়সিদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার সরকারি পরিকল্পনা নিয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে। এই সময়ে গবেষকরা নীতিনির্ধারণে শিশুদের প্রতি উপেক্ষার বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। কারণ বর্তমান যুগে প্রতিদিনের সন্তান লালন-পালনের সাথে স্ক্রিন ব্যবহার গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে।

গবেষণার সহপ্রধান এবং ইউনিভার্সিটি অব লিডসের মিডিয়া ও কমিউনিকেশন বিভাগের সিনিয়র লেকচারার রেফ ক্লেটন বলেন, মা-বাবারা নিজেদের স্ক্রিন ব্যবহারের বিষয়ে সঠিক নির্দেশনার অভাবে ‘অজান্তেই শিশুদের স্ক্রিন ডিভাইসের সাথে অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস ও সম্পর্ক তৈরি করতে শেখাচ্ছেন। ’

তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হওয়া দরকার।’

এই বিষয়টির ওপর বিশ্বজুড়ে হওয়া এ যাবৎকালের সবচেয়ে ব্যাপক ও পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনাভিত্তিক গবেষণা এটি। এতে পাঁচ বছরের কম বয়সিদের স্ক্রিন টাইমের বিষয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত সরকারি নির্দেশনা পুনর্বিবেচনা করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। সরকারের সেই নির্দেশনায় দুই বছরের কম বয়সিদের জন্য স্ক্রিন টাইম এড়িয়ে চলার সুপারিশ করা হলেও একটি শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, ‘একে অপরের সাথে বন্ধন, মিথস্ক্রিয়া এবং কথোপকথনকে উৎসাহিত করে এমন যৌথ ক্রিয়াকলাপ ছাড়া’ স্ক্রিন এড়ানো উচিত।

তবে নতুন এই গবেষণাটি শিশুদের স্ক্রিন টাইমের সাথে জড়িত ব্যাপক সম্ভাব্য ক্ষতির চিত্র তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে মা-বাবা ও যত্নশীলদের সাথে বন্ধন তৈরির সুযোগ কমে যাওয়া, অন্য শিশুদের সাথে শারীরিক খেলাধুলার সময় কমে যাওয়া এবং ভাষার সীমিত বিকাশ।

গবেষণায় বলা হয়েছে, এত অল্প বয়সে স্ক্রিনের ব্যবহার অতিরিক্ত মানসিক উত্তেজনা ও ঘুমের সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে এবং চোখের স্বাস্থ্য ও শৈশবকালীন ওজন বৃদ্ধি ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়া শিশুরা বাবা-মার কাছ থেকে সান্ত্বনা বা শান্ত হওয়ার পরিবর্তে ডিজিটাল ডিভাইসের দিকে ঝুঁকছে বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সমন্বয়ে গঠিত ‘অ্যাকশন অন ডিজিটাল ডিভাইস ইমারসিভ কন্ডিশনস টিম’ এই পর্যালোচনাটি করেছে। যদিও তারা স্ক্রিন ব্যবহার এবং সুনির্দিষ্ট কোনো বিকাশজনিত সমস্যার মধ্যে সরাসরি কার্যকারণ সম্পর্ক স্থাপন করেনি।

তবে তারা জোরালোভাবে বলেছে, ‘দুই বছরের কম বয়সি কোনো শিশুর নিয়মিত ইচ্ছাকৃত স্ক্রিন টাইম পাওয়া উচিত নয়। সামাজিকভাবে নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষভাবে স্ক্রিনের সংস্পর্শে আসা এড়ানো অসম্ভব, তাই এর সাথে জেনেশুনে বাড়তি ব্যবহার যুক্ত করলে কোনো অর্থবহ সুবিধা ছাড়াই ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।’

গবেষণায় সুপারিশ করা হয়েছে, দুই বছরের কম বয়সিদের নিয়মিত ‘যৌথ স্ক্রিন টাইম, শিক্ষার জন্য স্ক্রিন টাইম, যোগাযোগের জন্য স্ক্রিন টাইম এবং প্রতিবন্ধী বা শেখার সমস্যায় থাকা শিশুদের জন্য স্ক্রিন টাইম’-এর নির্দেশক যেকোনো অফিসিয়াল বা সরকারি গাইডলাইন পুনর্বিবেচনা করা উচিত। কারণ মা-বাবা এবং যত্নশীলরা একে নিরাপদ বা স্ক্রিন ব্যবহারে উৎসাহী করার বার্তা হিসেবে ভুল ব্যাখ্যা করতে পারেন। এর ফলে তারা বিশ্বাস করতে পারেন যে দুই বছরের কম বয়সিদের স্ক্রিন টাইম কোনো বিকাশজনিত ক্ষতি করে না। এর ফলে যারা ইতোমধ্যে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, তাদের বিকাশজনিত বিলম্ব এবং একাকী থাকার আচরণ আরো বেড়ে যেতে পারে।

নিজেদের প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে লিডস, লিডস ট্রিনিটি, লাফবোরো এবং অ্যাস্টন ইউনিভার্সিটির এই গবেষণা দল শিশুদের স্ক্রিন টাইম ঝুঁকি মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়েছে। এটি যেসব পরিবারে শিশুদের বিকাশজনিত দুর্বলতা দেখা দিচ্ছে, তাদের সুনির্দিষ্ট সহায়তা দিতে বিভিন্ন সেবামূলক সংস্থাকে সাহায্য করবে।

লিডস ট্রিনিটি ইউনিভার্সিটির ফ্যামিলি অ্যান্ড কালচারাল ডাইনামিকস বিভাগের অধ্যাপক এবং গবেষণার সহপ্রধান কারমেন ক্লেটন বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ স্ক্রিন ব্যবহারের বিষয়ে সরকার কীভাবে পরিবারগুলোর সাথে আরো ভালোভাবে যুক্ত হতে পারে তা বিবেচনা করা উচিত। তবে এই ধরনের সমস্যা নিয়ে কথা বলার সময় মা-বাবারা যাতে সমাজ বা অন্যের দ্বারা বিচার্য হওয়ার বা সমালোচিত হওয়ার ভয়ে না থাকেন, সেদিকেও সংবেদনশীল হতে হবে।’

কনজারভেটিভ পার্টির সাবেক মন্ত্রী এবং ‘১,০০১ ক্রিটিক্যাল ডেইজ ফাউন্ডেশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা অ্যান্ড্রিয়া লিডসম বলেন, ‘এই যুগান্তকারী পর্যালোচনাটি একটি সতর্কবার্তা। প্রমাণ দিন দিন স্পষ্ট করছে যে স্ক্রিন শিশুদের জন্য সীমিত সুবিধা দেয় এবং মানুষের বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়, প্রথম ১ হাজার ১ দিনে এটি উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।’

তিনি আরো বলেন, মা-বাবাদের এমন একটি সমস্যার জন্য দোষারোপ করা উচিত নয়, যা তারা তৈরি করেননি। এই দায়িত্ব কেবল তাদের কাঁধেই ছেড়ে দেওয়া যায় না। এ কারণেই প্রতিটি পরিবারের জন্য ‘বেস্ট স্টার্ট ফ্যামিলি হাব’ ব্যবহারের সুযোগ থাকা উচিত, যেখান থেকে তারা শিশুর প্রাথমিক বছরগুলোতে বিশ্বস্ত পরামর্শ ও ব্যবহারিক সাহায্য পেতে পারে।

লিডসম প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকেও তাদের ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘প্রমাণ যখন বিপরীত কথা বলছে, তখন মা-বাবাদের সামনে এমন কোনো কনটেন্ট প্রদর্শন বা প্রচার করা উচিত নয়, যা শিশুদের জন্য উপযুক্ত বলে লেবেল করা হয়েছে।’

ইংল্যান্ডের চিলড্রেনস কমিশনার রাচেল দে সওজা, যিনি সরকারি নির্দেশনা তৈরিতে সহায়তা করেছিলেন, তিনি বলেন, এটি মা-বাবার নিজস্ব সিদ্ধান্তকে প্রতিস্থাপন করার জন্য নয়, বরং সমর্থন করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘দুই বছরের কম বয়সি শিশুদের জন্য স্ক্রিন টাইম এড়িয়ে চলার সুপারিশটি স্পষ্ট। তবে এটি আজকের বিশ্বের বাস্তবতাকে স্বীকার করে এবং এটিও মেনে নেয় যে সীমিত কিছু ক্ষেত্রে যৌথ স্ক্রিন ব্যবহার, যেমন আত্মীয়দের সাথে ভিডিও কল করা বা সহায়তামূলক শিক্ষা নেওয়া সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।’

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেছেন, ‘পাঁচ বছরের কম বয়সিদের মা-বাবার জন্য তৈরি করা আমাদের প্রথম ধরনের স্ক্রিন টাইম নির্দেশিকা নিয়ে আমরা গর্বিত। এটি এমন একটি বিষয়ে স্পষ্ট ও বিশ্বস্ত সহায়তা প্রদান করে যা পরিবারের জন্য চ্যালেঞ্জিং হতে পারে বলে আমরা জানি।’

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন