প্রযুক্তির অপব্যবহারে বাড়ছে মানবপাচার

প্রযুক্তির অপব্যবহারে বাড়ছে মানবপাচার

একসময় মানবপাচারের সঙ্গে সীমান্ত, দালালচক্র কিংবা অবৈধ পথে বিদেশে পাঠানোর বিষয়টি বেশি জড়িত ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে অপরাধের কৌশলও পাল্টেছে। এখন পাচারকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এনক্রিপটেড মেসেজিং অ্যাপ, ভুয়া ওয়েবসাইট, অনলাইন চাকরির বিজ্ঞাপন, এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষের বিশ্বাস অর্জন করছে। বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরি, উন্নত জীবনের স্বপ্ন, প্রেম কিংবা বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে বিদেশে নিয়ে গিয়ে জোরপূর্বক সাইবার প্রতারণা, অনলাইন স্ক্যাম, নির্যাতন এবং আধুনিক দাসত্বে বাধ্য করার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। ফলে মানব পাচার এখন আর শুধু সীমান্তঘেঁষা কোনো অপরাধ নয়; এটি প্রযুক্তিনির্ভর, আন্তঃদেশীয় ও সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের বৈশ্বিক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশও এই ঝুঁকির বাইরে নয়। তাই প্রযুক্তির সুফল ভোগের পাশাপাশি এর নিরাপদ ও দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করাও এখন সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

বিজ্ঞাপন

ভুয়া চাকরির ফাঁদে তরুণরা

বর্তমানে প্রযুক্তিনির্ভর মানব পাচারের সবচেয়ে প্রচলিত কৌশল হলো বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন নিয়োগ প্ল্যাটফর্ম, ওয়েবসাইট কিংবা মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে আকর্ষণীয় চাকরির বিজ্ঞাপন দিয়ে তরুণ-তরুণীদের টার্গেট করা হচ্ছে। বিদেশে পৌঁছানোর পর প্রতিশ্রুত চাকরি তো মিলছেই না, বরং অনেকের পাসপোর্ট জব্দ করে জোরপূর্বক অনলাইন প্রতারণা, বিনিয়োগ জালিয়াতি কিংবা সাইবার স্ক্যাম পরিচালনায় বাধ্য করা হচ্ছে। ব্র্যাকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিদেশে চাকরির প্রলোভনে যাওয়া ব্যক্তিদের ৯৮ শতাংশ প্রতিশ্রুত চাকরি পাননি। ৯০ শতাংশকে জোরপূর্বক প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা হয়েছে। অনেকেই শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন পাচারকারীদের হাতিয়ার

ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম, মেসেঞ্জারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন পাচারকারীদের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। ভুয়া পরিচয়ে অ্যাকাউন্ট খুলে চাকরি, ব্যবসা কিংবা বিদেশে স্থায়ী হওয়ার লোভনীয় প্রস্তাব দিয়ে তারা মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশে বিলাসবহুল জীবনযাপনের ছবি ও ভিডিও দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা হয়। পরে নানা কৌশলে অর্থ আদায় করে অথবা বিদেশে নিয়ে গিয়ে পাচার করা হয়।

প্রেম ও বিয়ের ফাঁদেও বাড়ছে পাচার

শুধু চাকরি নয়, প্রযুক্তির অপব্যবহার করে প্রেম ও বিয়ের প্রলোভন দেখিয়েও মানব পাচারের ঘটনা বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের পর দীর্ঘদিন যোগাযোগ রেখে বিশ্বাস অর্জন করা হয়। এরপর বিয়ে কিংবা বিদেশে একসঙ্গে বসবাসের স্বপ্ন দেখিয়ে, বিশেষ করে নারীদের বিদেশে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে অনেকেই যৌন শোষণ, জোরপূর্বক শ্রম, নির্যাতন কিংবা মানব পাচারের শিকার হন। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এ ধরনের ঘটনার খবর নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তেও দেশি-বিদেশি সংঘবদ্ধ চক্রের সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে এসেছে। ফলে অনলাইনে গড়ে ওঠা সম্পর্কের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা এবং বিদেশে যাওয়ার আগে প্রতিটি তথ্য যাচাই করা এখন অত্যন্ত জরুরি।

কম্বোডিয়ার স্ক্যাম সেন্টারে বাংলাদেশিরা

বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে ১৫ হাজার ৯২১ জন কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে কম্বোডিয়ায় গেছেন। তবে তাদের একটি অংশ প্রতিশ্রুত চাকরি না পেয়ে সাইবার স্ক্যাম সেন্টারে আটকা পড়েছেন। চলতি বছরের জুনে কম্বোডিয়া থেকে ৫৮৩ জন বাংলাদেশি দেশে ফেরেন। তাদের অনেকেই জানিয়েছেন, বিদেশে পৌঁছানোর পর পাসপোর্ট জব্দ করা হয় এবং জোরপূর্বক অনলাইন প্রতারণা, ভুয়া বিনিয়োগ, প্রেমের ফাঁদ ও আর্থিক জালিয়াতির মতো অপরাধে যুক্ত করা হয়। ব্র্যাকের গবেষণায়ও দেখা গেছে, বিদেশে যাওয়া ব্যক্তিদের ৯৮ শতাংশ প্রতিশ্রুত চাকরি পাননি এবং ৯০ শতাংশকে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে বাধ্য করা হয়েছে।

মিয়ানমারেও একই চিত্র

কম্বোডিয়ার পাশাপাশি মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোও আন্তর্জাতিক স্ক্যাম সেন্টারের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। আইটি বা কলসেন্টারের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন দেশ থেকে তরুণদের সেখানে নেওয়া হচ্ছে। পরে তাদের মোবাইল ফোন ও পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে সাইবার প্রতারণার কাজে বাধ্য করা হচ্ছে। কাজে অস্বীকৃতি জানালে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে।

রোহিঙ্গারাও ঝুঁকির বাইরে নন

মানব পাচারের শিকার হচ্ছেন কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারাও। চাকরি, বিয়ে কিংবা উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে তাদের মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পাচারের চেষ্টা করছে সংঘবদ্ধ চক্র। একই কৌশলে বাংলাদেশি নাগরিকদেরও বিদেশে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, যা মানব পাচারের আন্তর্জাতিক বিস্তৃতি আরো স্পষ্ট করে।

যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকবেন

মানব পাচারকারীরা এখন আর শুধু দালাল বা সীমান্তপথের ওপর নির্ভর করছে না। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন চাকরির ওয়েবসাইট, ভিডিও কল, মেসেজিং অ্যাপ, এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে মানুষের বিশ্বাস অর্জনের চেষ্টা করছে। তাই প্রযুক্তি ব্যবহারে কিছু সাধারণ সতর্কতা বড় ধরনের বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে।

বিদেশে চাকরির প্রলোভন

অস্বাভাবিক উচ্চ বেতন, খুব সহজে ভিসা বা বিদেশে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলে সেটি যাচাই ছাড়া বিশ্বাস করবেন না। নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ও রিক্রুটিং এজেন্সির বৈধতা সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর থেকে নিশ্চিত করুন।

অনলাইনে ব্যক্তিগত তথ্য

অপরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক হিসাব, ওটিপি, পাসওয়ার্ড বা অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য কখনোই শেয়ার করবেন না। সন্দেহজনক লিংক বা ওয়েবসাইটে প্রবেশ থেকেও বিরত থাকুন।

প্রেম ও বিয়ের ফাঁদ

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের পর অল্প সময়ের মধ্যে প্রেম, বিয়ে বা বিদেশে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব এলে সতর্ক হোন। প্রয়োজন হলে পরিবারের সদস্য, স্বজন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিষয়টি আলোচনা করুন।

ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টে শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন, দুই স্তরের নিরাপত্তা (টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন) চালু রাখুন এবং অপরিচিত অ্যাপ বা সফটওয়্যার ইনস্টল করা থেকে বিরত থাকুন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন