কোটি বছর আগের সংকেত শনাক্ত

কোটি বছর আগের সংকেত শনাক্ত

মহাবিশ্বের গভীর মহাশূন্যে তাকানো মানেই বস্তুত অতীতের কোনো ইতিহাস খুঁজে বের করা। কোনো দূরবর্তী নক্ষত্র, ছায়াপথ বা গ্যাসমেঘ থেকে নির্গত আলো বা বেতার তরঙ্গ শত শত কোটি বছর ধরে মহাশূন্য পাড়ি দিয়ে তবেই এসে পৌঁছায় আমাদের পৃথিবীতে। সম্প্রতি জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দক্ষিণ আফ্রিকার বিখ্যাত ‘MeerKAT’ রেডিও টেলিস্কোপ ব্যবহার করে এমনই এক অত্যন্ত ক্ষীণ ও প্রাচীন বেতার সংকেত শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি বছর আগে নিরপেক্ষ হাইড্রোজেন থেকে নিঃসৃত এই সংকেত জ্যোতির্বিজ্ঞান জগতে মহাবিশ্বের বৃহৎ কাঠামোর ত্রিমাত্রিক (3D) মানচিত্র তৈরির এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক একদল গবেষকের এই গবেষণায় MeerKAT রেডিও টেলিস্কোপের প্রায় ৯৬ ঘণ্টার পর্যবেক্ষণ-তথ্য অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষকরা মহাজাগতিক ইতিহাসের দুটি ভিন্ন সময়পর্বে ছড়িয়ে থাকা নিরপেক্ষ হাইড্রোজেনের উপস্থিতি প্রমাণ করেছেন।

The Astrophysical Journal Letters-এ প্রকাশিত এই গবেষণার প্রধান লেখক সৌরভ পল। তার সঙ্গে সহলেখক হিসেবে যুক্ত ছিলেন গবেষক ঝাওটিং চেন, মারিও জি. সান্তোস এবং লরা ভলজ। মহাবিশ্বের সবচেয়ে মৌলিক ও অঢেল উপাদানগুলোর একটি হলো নিরপেক্ষ হাইড্রোজেন। একটি নির্দিষ্ট ভৌত প্রক্রিয়ায় এই হাইড্রোজেন প্রায় ২১ সেন্টিমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের অত্যন্ত সূক্ষ্ম বেতার বিকিরণ নির্গত করে। শত শত কোটি আলোকবর্ষ দূরের অঞ্চল থেকে এই সংকেত যখন পৃথিবীর দিকে ছুটে আসে, তখন মহাবিশ্বের ধারাবাহিক সম্প্রসারণের ফলে এর তরঙ্গদৈর্ঘ্য টান খেয়ে আরো দীর্ঘ হতে থাকে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘রেডশিফট’ (Redshift)। এই রেডশিফট পরিমাপ করে বিজ্ঞানীরা নিখুঁতভাবে হিসাব বের করেন—সংকেতটি মহাবিশ্বের ঠিক কোন সময়ের বা কত শত কোটি বছর আগের।

বিজ্ঞাপন

তবে এই সংকেতকে আলাদা করা ছিল খড়কুটোর গাদায় সুঁই খোঁজার মতো কঠিন। মহাকাশের অন্যান্য অত্যন্ত উজ্জ্বল বেতার উৎস, মানুষের তৈরি রেডিও তরঙ্গের সিগন্যাল (RFI) এবং স্বয়ং টেলিস্কোপের যন্ত্রগত কৃত্রিম প্রভাব কাটিয়ে ২১ সেন্টিমিটারের এই ক্ষীণ সংকেত বের করা ছিল গবেষকদের মূল সাফল্য। অন্যতম একটি সাফল্য হলো—দৃশ্যমান আলোর কোনো অতিরিক্ত ছায়াপথ জরিপের ওপর নির্ভর না করেই সরাসরি রেডিও টেলিস্কোপের উপাত্ত থেকেই সংকেতটি সফলভাবে আলাদা করা সম্ভব হয়েছে। প্রতিটি ছায়াপথ গোনার প্রয়োজন হয়নি।

এই গবেষণার সবচেয়ে যুগান্তকারী দিকটি হলো ‘হাইড্রোজেন ইনটেনসিটি ম্যাপিং’ (Hydrogen Intensity Mapping) পদ্ধতির সফল প্রয়োগ। প্রচলিত জ্যোতির্বিজ্ঞান পদ্ধতিতে দূরের প্রতিটি ছায়াপথকে একটি একটি করে আলাদাভাবে শনাক্ত করে তাদের অবস্থান নির্ণয় করা হতো, যা সময়সাপেক্ষ। কিন্তু ‘ইনটেনসিটি ম্যাপিং’ কৌশলে কোনো নির্দিষ্ট ছায়াপথ আলাদা করে দেখার প্রয়োজন পড়ে না। বরং মহাকাশের কোনো নির্দিষ্ট বিশাল অঞ্চলে কোটি কোটি ছায়াপথে থাকা হাইড্রোজেনের সম্মিলিত বা পুঞ্জীভূত বেতার সংকেত মেপে নেওয়া হয়। এর ফলে অত্যন্ত দ্রুত সময়ের মধ্যে মহাবিশ্বের বিশাল এলাকায় হাইড্রোজেনের বণ্টন বোঝা যায়, যা পুরো মহাবিশ্বের একটি সামগ্রিক ত্রিমাত্রিক ক্যানভাস গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

গবেষণায় ০.৩২ এবং ০.৪৪ রেডশিফটের দুটি বিশাল এলাকায় হাইড্রোজেনের সংকেতের পাওয়ার স্পেকট্রাম পরিমাপ করা হয়েছে। এটি মেগাপার্সেক-স্কেল বা কয়েক মিলিয়ন আলোকবর্ষ বিস্তৃত মহাজাগতিক কাঠামোর সম্যক ধারণা দিচ্ছে—যার পরিধি আমাদের মিল্কিওয়ে ও প্রতিবেশী অ্যান্ড্রোমিডা ছায়াপথের মধ্যবর্তী বিস্তীর্ণ দূরত্বের সমান।

চমকপ্রদ বিষয় হলো, এই গবেষণায় ব্যবহৃত উপাত্তগুলো একদম নতুন ছিল না। ২০১৮ সালে MeerKAT টেলিস্কোপের প্রাথমিক বৈজ্ঞানিক চালনার সময় সংগৃহীত পুরোনো উপাত্ত বিশ্লেষণ করেই এই সাফল্য এসেছে। তখনকার পর্যবেক্ষণের মূল লক্ষ্য ইনটেনসিটি ম্যাপিং না থাকলেও আধুনিক উন্নত অ্যালগরিদম ও ডেটা-প্রসেসিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেই পুরোনো উপাত্ত থেকেই এই গভীর রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব হয়েছে।

নিরপেক্ষ হাইড্রোজেন হলো ছায়াপথ গঠন ও বিবর্তনের সবচেয়ে প্রাথমিক কাঁচামাল। মহাবিশ্বের সূচনালগ্নে এবং পরবর্তী সময়ে হাইড্রোজেন কোথায়, কীভাবে ছড়িয়ে ছিল তা জানা গেলে কীভাবে প্রথম ছায়াপথগুলোর জন্ম হয়েছিল এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মহাবিশ্ব কীভাবে আজকের রূপ নিল—সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...