আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

উইকিপিডিয়ার চ্যালেঞ্জার গ্রকিপিডিয়া?

মোশাররফ হোসেন

উইকিপিডিয়ার চ্যালেঞ্জার গ্রকিপিডিয়া?

প্রযুক্তি জগতের সবচেয়ে আলোচিত মুখ ইলন মাস্ক। বৈদ্যুতিক গাড়ি, মহাকাশ গবেষণা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা মানুষের মস্তিষ্কে চিপ বসানোর প্রকল্প—একটির পর আরেকটি বিস্ময় দিয়ে তিনি বিশ্বকে নাড়িয়ে দেন। এবার তার নতুন পরীক্ষা একটি অনলাইন বিশ্বকোষ। যার নাম গ্রকিপিডিয়া। নাম শুনলেই বোঝা যায়, এটি এসেছে তার তৈরি এআই চ্যাটবট ‘Grok’ থেকে। কিন্তু প্ল্যাটফর্মটি চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জন্ম নিয়েছে প্রশ্ন, বিতর্ক এবং সংশয়।

গ্রকিপিডিয়া দেখতে অনেকটাই উইকিপিডিয়ার মতো—বড় বড় নিবন্ধ, রেফারেন্স, তথ্যভান্ডার। কিন্তু কাছ থেকে দেখলে বোঝা যায়, এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ধারণা। এখানে কোনো মানব লেখক নেই। নেই স্বেচ্ছাসেবী সম্পাদকদের দল। পুরো বিশ্বকোষটি তৈরি, সম্পাদনা এবং যাচাই করছে শুধু একটি এআই—xAI কোম্পানির তৈরি Grok। মাস্ক দাবি করছেন, মানুষের পক্ষপাতমূলক দৃষ্টিভঙ্গি এড়িয়ে আরো নিরপেক্ষ তথ্য সরবরাহ করবে তার এআই বিশ্বকোষ।

বিজ্ঞাপন

তবে সমালোচকদের মতে বাস্তবটা তেমন সহজ নয়। গ্রকিপিডিয়া চালুর পরপরই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে এসেছে নানা মন্তব্য। ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, নতুন এই প্ল্যাটফর্মের বহু নিবন্ধেই দেখা গেছে স্পষ্ট রাজনৈতিক ঝোঁক—বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল বা ডানপন্থি মতাদর্শের দিকে। ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারির ক্যাপিটল হিল হামলা নিয়ে গ্রকিপিডিয়ার একটি নিবন্ধে ভোটে অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে এমনভাবে, যা ট্রাম্পপন্থিদের প্রচারণার সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। বরং ট্রাম্পের উসকানিমূলক ভূমিকার আলোচনা সেখানে তুলনামূলকভাবে হালকা।

আরেকটি অভিযোগ এসেছে তথ্যের উৎস ও যথার্থতা নিয়ে। কিছু নিবন্ধে পর্নোগ্রাফি নাকি এইডস মহামারিকে আরো খারাপ করেছিল—এমন দাবি করেছে গ্রকিপিডিয়া, যা বাস্তবে বৈজ্ঞানিক তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অনেক গবেষক বলছেন, পুরো প্ল্যাটফর্ম যেহেতু এআইনির্ভর, সেখানে তথ্য যাচাই প্রক্রিয়াটি মানুষের মতো সূক্ষ্ম নয়। ফলে ভুল, অর্ধসত্য কিংবা পক্ষপাত সহজেই ঢুকে যেতে পারে।

এমনকি কিছু বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, গ্রকিপিডিয়ার অনেক নিবন্ধই মূলত উইকিপিডিয়ার তথ্য পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ। শব্দ বদলে, বাক্য পাল্টে, কাঠামো রেখে—এআই অনেক জায়গায় ঠিক উইকিপিডিয়ারই ধারাবাহিকতা অনুসরণ করেছে। যদিও মাস্ক বলছেন, গভীর বিশ্লেষণ করে, নতুনভাবে তথ্য তৈরি করাই গ্রকের কাজ। তবু মাস্ক গ্রকিপিডিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশ আত্মবিশ্বাসী। তার ভাষায়, সভ্যতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জ্ঞানভিত্তিক কাঠামো হবে গ্রকিপিডিয়া। তিনি এটিকে ধীরে ধীরে ওপেন সোর্স করার পরিকল্পনাও জানিয়েছেন, যাতে ইচ্ছুকরা ভবিষ্যতে এর উন্নয়নে অংশ নিতে পারে।

কিন্তু এই এআইচালিত বিশ্বকোষ কতটা নিরপেক্ষ থাকবে? মানুষের অভিজ্ঞতা, গবেষণা ও যুক্তির জায়গায় শুধু অ্যালগরিদম কি সত্যিই নির্ভরযোগ্য সত্য তৈরি করতে পারে? প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই বিপ্লবের এই সময়েও জ্ঞানভিত্তিক প্ল্যাটফর্মে মানব সম্পাদনা সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ তথ্য শুধু লেখা নয়, ব্যাখ্যা, প্রসঙ্গ ও দায়িত্ববোধেরও ব্যাপার।

গ্রকিপিডিয়া নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী এক উদ্যোগ। কিন্তু এটি উইকিপিডিয়ার মতো বিশ্বস্ত, বহুমাত্রিক ও জনগণের অংশগ্রহণভিত্তিক তথ্যভান্ডারকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারবে কি না—সে উত্তর এখনই বলা কঠিন। বরং বলা যায়, এআইকে কেন্দ্র করে তথ্যবিশ্বে একটি নতুন প্রতিযোগিতা শুরু হলো; যার পরিণতি প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ও লিখে দিতে পারে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন