বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ব্যবহারকারীকে স্থানীয় অফিসের মাধ্যমে গ্রাহকসেবা দিচ্ছে মেটা (ফেসবুক), ইউটিউব ও টিকটকের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। এমনকি সার্কভুক্ত দেশগুলোতেও রয়েছে তাদের আনুষ্ঠানিক উপস্থিতি। তবে বিপুল ব্যবহারকারী, বড় বিজ্ঞাপন বাজার ও উল্লেখযোগ্য আয় থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে এখনো কোনো অফিস গড়ে তোলেনি এসব প্রতিষ্ঠান।
ফলে প্রতারণা, অ্যাকাউন্ট হ্যাক, সাইবার বুলিং কিংবা আপত্তিকর কনটেন্টের শিকার ব্যবহারকারীদের অভিযোগ জানানো এবং দ্রুত প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ সীমিতই থেকে যাচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতারণা, অ্যাকাউন্ট হ্যাক, ভুয়া পরিচয়, হয়রানি কিংবা সাইবার বুলিংয়ের শিকার হলে ই-মেইল বা অনলাইনে অভিযোগ জানানো ছাড়া কার্যকর কোনো বিকল্প নেই। অভিযোগ জানানো হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দ্রুত প্রতিকার পাওয়া যায় না। ফলে দীর্ঘদিন ধরে অসংখ্য অভিযোগ অমীমাংসিত থেকে যায়।
টেলিকম সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহারকারী বাড়ছে। নানা কনটেন্ট তৈরির প্রবণতা বাড়ছে। এগুলোর মধ্যে কিছু কনটেন্ট সমাজে বহুমুখী অপরাধপ্রবণতা তৈরি করছে। এমনকি বাবা-মাকে ধোঁকা দিয়ে কীভাবে স্কুল ফাঁকি দিতে হবে—এমন কনটেন্ট তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপলোড করা হচ্ছে। এ ধরনের নেতিবাচক কনটেন্টে ভিউ বাড়ছে এবং সমাজে পড়ছে বিরূপ প্রভাব। এতে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলাতেও মারাত্মক প্রভাব পড়ছে।
সূত্র জানায়, এসব কনটেন্টের বিষয়ে ব্যবহারকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর কর্তৃপক্ষকে চিঠি, মেসেজ ও হটলাইনে মৌখিকভাবে অভিযোগ জানায়। কিন্তু তারা অনেক সময়ই বিষয়গুলো আমলে নেয় না। কখনো আমলে নিলেও সমাধানে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। কারণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো কনটেন্ট নিয়ে ব্যবসা করে। ভিউয়ের ওপর নির্ভর করে তাদের লাভ-ক্ষতি। ফলে তাদের মূল ফোকাস থাকে সেদিকেই।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা জানান, ফেসবুককে অভিযোগ দিলে তারা তাদের খেয়ালখুশি মতো জবাব দেয়। বিষয়টি তারা দেখছেন বলে জানায়। এরপর ওই অভিযোগের আর সুরাহা হয় না। বাংলাদেশে অফিস হলে অভিযোগকারীরা দ্রুতই সেখানে অভিযোগ দিতে পারবেন।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী প্রায় ১৩ কোটি। এর মধ্যে ফেসবুক ব্যবহারকারী চার কোটি পাঁচ লাখ, টিকটক ব্যবহারকারী প্রায় পৌনে দুই কোটি এবং ইউটিউব ব্যবহার করেন তিন কোটি পাঁচ লাখ মানুষ।
টেলিকম সংশ্লিষ্ট একাধিক পক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফেসবুক মনে করে, বাংলাদেশে স্থানীয় অফিস চালু করলে গ্রাহকদের প্রচুর ভিড় সামাল দিতে হবে। তাদের অভিযোগ সমাধানে তারা হিমশিম খাবেন।
জানা গেছে, ফেসবুক কর্তৃপক্ষ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে ঢাকার পাশে পূর্বাচল এলাকায় একটি অফিস করার বিষয়ে জানিয়েছিল। ওই সময় সরকারকে তিনটি শর্ত দিয়েছিল তারা। সেগুলো হলো— ফেসবুকের অফিস ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা দেওয়া, সরকারের কাছে কর্তৃপক্ষ আবেদন করলে দ্রুত সাড়া দেওয়া এবং ফেসবুকে কেউ স্বাধীন মতামত দিলে সেখানে হস্তক্ষেপ করা যাবে না।
ফেসবুকের তিনটি শর্ত বিবেচনা করা হবে বলে জানিয়েছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। কিন্তু পরে সরকারের পক্ষ থেকে ফেসবুককে শর্ত পূরণের বিষয়ে আর কিছু জানানো হয়নি। এতে তারা আর অফিস বসায়নি।
টেলিকম খাতসংশ্লিষ্টদের দাবি, বাংলাদেশে অফিস স্থাপনের বিষয়ে অতীতে মেটা ও গুগলের সঙ্গে সরকারের আলোচনা হয়েছিল। তবে নীতিগত ও প্রশাসনিক কিছু শর্ত এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বিষয়টি আর এগোয়নি। তবে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গুগল ও ফেসবুকের অফিস স্থাপন করা নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা চলছে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে টেলিকম বিশেষজ্ঞ নুরুল কবীর আমার দেশকে বলেন, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের অফিস স্থাপনে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কোম্পানি—উভয়পক্ষের আন্তরিকতা প্রয়োজন। শুধু একপক্ষ আগ্রহী হলে বিষয়টি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
এ বিষয়ে ফেসবুকের পরিচালক (নেটওয়ার্ক অপারেশন) ড. হাইয়াত শাহীদ শিপন আমার দেশকে বলেন, ‘এ মুহূর্তে বাংলাদেশে ফেসবুকের অফিস খোলার সম্ভাবনা নেই।’
যোগাযোগ করা হলে প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ আমার দেশকে বলেন, ‘আমরা গাইডলাইন অনুযায়ী কাজ শুরু করেছি। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করেছি।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



